মহাকাশ যাত্রার জন্য নির্মিত ও ব্যবহৃত যানবাহন মহাকাশযান। বিভিন্ন কারণে মহাকাশযান তৈরি করা হয় ও মহাকাশে পাঠানো হয়। যেমন— টেলিযোগাযোগ, ভূপর্যবেক্ষণ, আবহাওয়া নির্ধারণ, দিক নির্ণয়, মহাকাশে উপনিবেশ স্থাপন, মহাকাশ অনুসন্ধান এবং মানুষ ও মাল পরিবহন। মহাকাশযান সাধারণত নিজে থেকে মহাকাশে যেতে পারে না, রকেটের মাধ্যমে তাদের মহাকাশে পাঠানো হয়। কিছু মহাকাশযান ভূপৃষ্ঠ থেকে উৎক্ষিপ্ত হয়ে মহাকাশে প্রবেশ করে ও পৃথিবীর চারিদিকে একটি পূর্ণ আবর্তন না করতে পেরে ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে।
মনুষ্যবিহীন মহাকাশযানের সূচনা
প্রতিযোগিতাটি সুরু হয় ১৯৫৭ সালে, যখন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউএসএসআর উভয়ই ১৮ মার্চ দীর্ঘ আন্তর্জাতিক গ্রফিজাইক্যাল বছর (জুলাই ১৯৫৭-ডিসেম্বর ১৯৫৮) উপলক্ষে মহাকাশ কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর ঘোষণা দেন। ১৯৫৭ সালের ২৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৮ সালের বসন্তের আগেই ভ্যানগার্ডের পরিকল্পিত উৎক্ষেপণের ঘোষণা দেয় এবং ৩১ জুলাই ইউএসএসআর ঘোষণা দেয় যে তারা ১৯৫৭ সালের বসন্তে একটি মাহাকাশযান উৎক্ষেপণ করবে। ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়ন মানবজাতির সর্বপ্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করে।
একই সালে নভেম্বরের ৩ তারিখে সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুৎনিক ২ উৎক্ষেপণ করেন। এটির সাহায্যে লাইকা নামক কুকুরকে মহাকাশে সর্বপ্রথম জীবন্ত প্রাণী হিসেবে পাঠানো হয়েছিল। ১৯৫৮ সালের ১৫ মে স্পুৎনিক ৩ উৎক্ষেপিত হয়। এটি ভুগা ঠনিক গবেষণার জন্য উপকরণের বিশাল সমাহার বহন করে এবং বায়ুমণ্ডলের উপরিস্তরের চাপ ও গঠন, আধনযুক্ত কণার পরিমাণ, মহাজাগতিক তরঙ্গের ফোটন ও ভারী কেন্দ্রীকা, চৌম্বক ও স্থির তড়িৎ ক্ষেত্র এবং ধূমকেতুর কণা সম্পর্কিত তথ্য প্রদান করেছিল।
কিছু ব্যর্থতার পরে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৮ সালের ১ ফব্রুয়ারি তাদের প্রথম কৃত্রিম গ্রহ এক্সপ্লোরার ১ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করে। এটি বৈজ্ঞানিক উপকরণ বহন করেছিল এবং পরিকল্পিত ভ্যান অ্যালেন রেডিয়েশন বেল্ট শনাক্ত করেছিল। স্পুৎনিক ১ সম্পর্কিত সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের আতঙ্ক স্পুৎনিক ক্রাইসিস নামে পরিচিত। ১৯৫৯ সালে, নাসা এক ব্যক্তি বিশেষের জন্য ক্যাপসুল পাঠাতে প্রজেক্ট মার্কারি এর সূচনা করে এবং সাতটি মহাকাশচারীর একটি সৈন্যদল নির্বাচন করে। এটি মার্কারি সেভেন নামে পরিচিত।
মহাকাশে প্রথম মানব
১৯৬১ সালে প্রথম কসমনট ইউরি গাগারিনকে মহাকাশে পাঠানোর মধ্য দিয়ে মনুষ্যবাহী মহাকাশ যাত্রার সূচনা হয়। এটি সোভিয়েত ভস্টক কর্মসূচির অংশ ছিল। গাগারিনের মহাকাশ যাত্রাটি ১০৮ মিনিট দীর্ঘ ছিল এবং পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করেছিল। ১৯৬১ সালে ৫ মে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রথম উপ-অক্ষীয় মার্কারি মহাকাশচারী আলান শেফার্ডকে ফ্রিডম ৬ ক্যাপসুলের মাধ্যমে মহাকাশে পাঠানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ মহাকাশে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিস্তার ও প্রধান ভূমিকায় ক্রমবর্ধমান রূপে আতঙ্কিত ও সচেতন হয়েছিল। এজন্য ২৫ মে রাষ্ট্রপতি জন এফ. কেনেডি ১৯৭০ সালের আগে মানুষকে ছাদে পাঠানোর ঘোষণা দেন। এতে তিনজন ব্যক্তি সম্পন্ন অ্যাপোলো কর্মসূচির সূচনা হয়। ১৯৬২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র সফলভাবে ইতিহাসের তৃতীয় মনুষ্যবাহী অক্ষীয় মহাকাশ যাত্রা ফ্রেডশিপ-৭ অভিযানে পৃথিবীকে তিনবার প্রদক্ষিণ করে। ১৯৬৩ সালের ১৬ মে পর্যন্ত, যুক্তরাষ্ট্র মোট ছয়টি প্রজেক্ট মার্কারি মহাকাশচারী উক্ষেপণ করে; একত্রিত অবস্থায় ৩৪ বার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে এবং মহাকাশে ৫১ ঘণ্টা অতিক্রম করে।
মহাকাশে প্রথম নারী
মহাকাশের প্রথম নারী ভ্যালেন্টিনা তেরেস্কোভা ছিলেন। তিনি সোভিয়েত অভিযান ভস্টক ৬ এর মাধ্যমে ১৯৬৩ সালের ১৬ জুন অক্ষে পৌঁছান। সোভিয়েত মহাকাশযানের প্রধান নকশা প্রণয়নকারি সার্জেয় করয়লভ একটি নারী মহাকাশচারী নিযুক্ত করার এবং ভস্টক ৫/৬ এ একই সময়ে নারীকে উৎক্ষেপণের ধারণা দেন। যদিও, তার পরিকল্পনার পরিবর্তন করে ভস্টক ৫ এ একজন পুরুষ এবং পরবর্তীতে তেরেস্কভাকে পাঠানো হয়। তেরিকোভার মহাকাশ যাত্রার সময় রাষ্ট্রপতি ক্রুশ্চেভ ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে কথা বলেন।
১৯৬৩ সালের ৩ নভেম্বর তেরেস্কিভা একজন মহাকাশচারী আন্ড্রিয়ান নিকোলায়েভকে বিবাহ করেন; যিনি ভস্টক ৩ এর মাধ্যমে যাত্রা করছেন। ১৯৬৪ সালের ৮ জুন তিনি দুই মহাকাশচারী দ্বারা ধারণকৃত সর্বপ্রথম সন্তানের জন্মদান করেন। ১৯৮২ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে এবং পরবর্তীতে তেরেস্কোভা সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী সদস্য হন। বিমানচালক সয়েভতলানা স্যাভিটিস্কেয়া দ্বিতীয় নারী মহাকাশচারী ছিলেন। তিনি ১৯৮২ সালের ১৮ আগস্ট সয়োজ টি-৭ যানে যাত্রা করেছিলেন। ১৯৮৩ সালের ১৮ জুনে স্পেস শাটল এসটিএস-৭ যাত্রা করে স্যালি রাইড যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মহাকাশচারী হন। ১৯৮০-এর দশকে নারী মহাকাশচারী একটি সাধারণ বিষয় হয়ে ওঠে।
মালবাহী মহাকাশযান
মালবাহী বা পুনর্যোগানদাতা মহাকাশযান বলতে সেইসব স্বয়ংক্রিয় মহাকাশযান বোঝায়, যেগুলিকে মালামাল পরিবহনের জন্য বিশেষভাবে নকশা করা হয়, যার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য মহাকাশ স্টেশনগুলির পরিচালনায় সহায়তা দানের জন্য খাদ্য, প্রচালক জ্বালানি (প্রপেল্যান্ট) ও অন্যান্য রসদ পরিবহন করে পৌঁছে দেওয়া। ১৯৭৮ সাল থেকেই স্বয়ংক্রিয় মালবাহী মহাকাশযান ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলি সালিউত ৬, সালিউত ৭, মির, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন ও থিয়েনকুং মহাকাশ স্টেশনগুলিকে সেবা প্রদান করেছে। ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে মালামাল সরবরাহের কাজে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন মালবাহী মহাকাশযান ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলি হল রুশ প্রোগ্রেস, মার্কিন স্পেসএক্স ড্রাগন ২ ও সিগনাস এবং চীনের থিয়েনকুং মহাকাশ স্টেশনকে মাল সরবরাহকারী থিয়েনচৌ।
মহাকাশ সন্ধানী
মহাকাশ সন্ধানী স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রচালিত (রোবটচালিত) মহাকাশযান। যেগুলিকে গভীর মহাকাশ কিংবা পৃথিবী অপেক্ষা ভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু অনুসন্ধান করতে প্রেরণ করা হয়। এগুলি অবতরণ যান নামক মহাকাশযানগুলি অপেক্ষা স্বতন্ত্র, কারণ এগুলি কোনও গ্রহের পৃষ্ঠতলে বা বায়ুমণ্ডলে কাজ করে না বরং উন্মুক্ত মহাকাশে কাজ করে। স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রচালিত হবার সুবাদে ব্যয়বহুল ও ভারী জীবনরক্ষক ব্যবস্থাগুলির প্রয়োজন পড়ে না। যেমন অ্যাপোলো কর্মসূচির মানববাহী চন্দ্র অবতরণগুলির জন্য স্যাটার্ন ৫ রকেটের ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়েছিল, যেগুলির একেকটি উৎক্ষেপণের জন্য একশত কোটি মার্কিন ডলারের বেশি খরচ পড়েছিল। এর বিপরীতে মহাকাশ সন্ধানী উৎক্ষেপণে অপেক্ষাকৃত হালকা ও দামে সস্তা রকেট ব্যবহার করার সুযোগ থাকে। মহাকাশ সন্ধানীগুলি অদ্যাবধি সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহ ও প্লুটো নামক বামন গ্রহটিকে সাক্ষাৎ করতে সক্ষম হয়েছে।
এছাড়া পার্কার সৌর সন্ধানীটির কক্ষপথটি এমন যে এটি নিকটতম বিন্দুতে সূর্যের বর্ণমণ্ডলের অভ্যন্তরে অবস্থান করে। পাঁচটি মহাকাশ সন্ধানী রয়েছে যেগুলি অধিবৃত্তীয় গতিপথ অনুসরণ করে সৌরজগৎ পরিত্যাগ করেছে বা করছে। এগুলি হল ভয়েজার ১, ভয়েজার ২, পায়োনিয়ার ১০, পায়োনিয়ার ১১ এবং নিউ হরাইজনস।
ভয়েজার কর্মসূচি
১৯৭৭ সালে মার্কিন ভয়েজার কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুইটি অভিন্ন ভয়েজার সন্ধানী (যাদের প্রতিটির ওজন ৭২১.৯ কিলোগ্রাম (১,৫৯২ পা) উৎক্ষেপণ করা হয়, যেগুলিকে ভয়েজার ১ ও ভয়েজার ২ নাম দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুনের অবস্থানের একটি বিরল বিন্যাসের সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে এক অভিযানেই গ্রহ চারটি পরিদর্শনের সুযোগ সদ্ব্যবহার করতে এই মহাকাশযানগুলি ঐ সময়ে উৎক্ষেপণ করা হয়, যেখানে অভিকর্ষীয় সহায়তা ব্যবহার করে প্রতিটি গন্তব্যস্থল অধিকতর দ্রুত সময়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়।
বাস্তবে টাইটান ৩ নামের রকেটটি সন্ধানীগুলিকে শনিগ্রহের কক্ষপথে প্রেরণ করতে ব্যর্থ হলেও ২০২৩ সালে এসে ভয়েজার ১ মোটামুটি ১৭ কিলোমিটার/সেকেন্ড গতিবেগে ও ভয়েজার ২ মোটামুটি ১৫ কিলোমিটার/সেকেন্ড গতিবেগে ভ্রমণ করে চলছে। ২০১২ সালে ভয়েজার ১ সৌরজগতের বলয় (হেলিওস্ফিয়ার) থেকে বের হয়ে যায় এবং ২০১৮ সালে ভয়েজার ২-ও একই কাজ সম্পাদন করে। ভয়েজার ১ সন্ধানীটিকে প্রকৃতপক্ষে ভয়েজার ২-এর ১৬ দিন পরে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, কিন্তু এটি শেষোক্তটির আগেই বৃহস্পতি গ্রহে পৌঁছাতে সক্ষম হয়, কারণ ভয়েজার ২ অপেক্ষাকৃত দীর্ঘ একটি গতিপথ অনুসরণ করে বৃহস্পতির পরে ইউরেনাস ও নেপচুন পরিদর্শন করতেও সক্ষম হয়।
অন্যদিকে ভয়েজার ১ ইউরেনাস বা নেপচুন নয় বরং শনিগ্রহের উপগ্রহ টাইটানের পাশ কাটিয়ে উড়ে যায়। ২০২৩ সালের আগস্ট মাসের হিসাব অনুযায়ী ভয়েজার ১ ১৬০ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক সমপরিমাণ দূরত্ব অতিক্রম করেছে, অর্থাৎ এটি পৃথিবী থেকে সূর্যের যে দূরত্ব, তার ১৬০ গুণ বেশি দূরে অবস্থান করছে। ফলে এটি সূর্য থেকে অদ্যাবধি সর্বাধিক দূরে অবস্থিত মহাকাশযান। অন্যদিকে ভয়েজার ২ ২০২৩-এর আগস্ট মাসের হিসাবে সূর্য থেকে ১৩৪ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক একক সমপরিমাণ দূরত্বে অবস্থিত।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা বাস্তব সময়ে সন্ধানীগুলির দূরত্বের উপাত্ত ও একই সঙ্গে সন্ধানীগুলির মহাজাগতিক রশ্মি শনাক্তকারকগুলির উপাত্তগুলিও প্রদান করে থাকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সন্ধানীর শক্তি নির্গমনের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে এবং তেজস্ক্রিয়-সমস্থানিক তাপ-বৈদ্যুতিক উৎপাদকগুলির মানের অবনতি ঘটছে, তাই নাসা শক্তি সংরক্ষণের স্বার্থে সন্ধানীগুলির কিছু যন্ত্রপাতি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। ২০২০-এর দশকের মাঝামাঝি এমনকি ২০৩০-এর দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সন্ধানীগুলিতে কিছু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি চালু থাকার সম্ভাবনা আছে। ২০৩৬ সালের পরে দুইটি সন্ধানীই গভীর মহাকাশ জালকব্যবস্থার পরিসীমার বাইরে চলে যাবে।
মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র
মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা মহাকাশ মানমন্দির হলো জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তুসমূহ পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত একটি দূরবীক্ষণ যন্ত্র, যাকে মহাকাশে স্থাপন করে হয়। মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রগুলির দুইটি সুবিধা আছে। প্রথমত এগুলিতে পর্যবেক্ষণকৃত তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণের পরিশ্রুতি (ফিল্টারিং) ও স্ফূরণজনিত বিকৃতি এড়ানো সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত ভূ-ভিত্তিক মানমন্দিরগুলি যে আলোক দূষণের শিকার হয়, সেটিও এড়ানো যায়।
মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রগুলিকে দুইটি প্রকারে ভাগ করা যায়। প্রথম প্রকারেরগুলি সমগ্র আকাশের মানচিত্রণ সম্পাদন করে (জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক জরিপ)। দ্বিতীয় ধরনেরগুলি নির্বাচিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক বস্তু বা আকাশের অংশবিশেষ ও এগুলি ছাড়িয়ে দূরবর্তী কোনো অবস্থানের উপর দৃষ্টিনিবদ্ধ করে থাকে। মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রগুলি ভূচিত্রণ কৃত্রিম উপগ্রহগুলি অপেক্ষা স্বতন্ত্র, যেগুলিকে কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক আলোকচিত্রণ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্যে পৃথিবীর দিকে মুখ করানো থাকে এবং যেগুলি থেকে প্রাপ্ত চিত্র ও উপাত্ত আবহাওয়া বিশ্লেষণ, গুপ্তচরবৃত্তি ও অন্য ধরনের তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহার করা হয়।
অবতরণ যান
অবতরণ যান এক ধরনের মহাকাশযান; যা পৃথিবী ব্যতীত অন্য কোনো নভোবস্তুর পৃষ্ঠতলে কোমল অবতরণ সম্পাদন করে। কিছু কিছু অবতরণ যান, যেমন ফিলি ও অ্যাপোলো লুনার মডিউল নিজস্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবহার করে সম্পূর্ণ অবতরণ কর্মটি সম্পাদন করেছে। কিন্তু এর বিপরীতে বহু অবতরণ যান আছে, যেগুলি বায়ব-গতিরোধন পদ্ধতি ব্যবহার করে। বিশেষ করে দূরের গন্তব্যস্থলগুলির জন্য শেষোক্ত পদ্ধতিটি বেশি ব্যবহৃত হয়। এই পদ্ধতিতে মহাকাশযানটি কৌশলী কক্ষপথ পরিচালনার দ্বারা নিজের গতিপথ এমনভাবে বদলে ফেলে যাতে এটি গ্রহ বা উপগ্রহের বায়ুমণ্ডল ভেদ করে অবতরণ করে। মহাকাশযানের সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের সংঘর্ষের কারণে যে পিছুটান বল সৃষ্টি হয়, তা কোনো জ্বালানির ব্যবহার ছাড়াই যানটির গতিবেগ কমিয়ে দিতে সাহায্য করে। তবে এর কারণে যানের দেহে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রার সৃষ্টি হয়, তাই সেটিকে মোকাবিলা করার জন্য তাপ রক্ষাঢাল জাতীয় কিছুর ব্যবহার আবশ্যক।
মহাকাশ-কোষ
মহাকাশ-কোষ এক ধরনের মহাকাশযান; যেগুলি কমপক্ষে একবারের জন্য মহাকাশ থেকে ফেরত আসতে পারে। এগুলির আকৃতি ভোঁতা হয়। এগুলিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি জ্বালানি থাকে না। মহাকাশ বিমানের মতো এগুলিতে কোনো ডানা বা পাখা থাকে না। মহাকাশ-কোষগুলি হলো পুনরুদ্ধারযোগ্য মহাকাশযানের সবচেয়ে সাধারণ রূপ, তাই এগুলিকেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। এগুলিতে সাধারণত জীবনরক্ষক ব্যবস্থাসহ মানব মহাকাশচারী ধারণ করার সক্ষমতা থাকে। প্রথম মহাকাশ-কোষটি ছিল সোভিয়েত ভস্তক মহাকাশযানে অন্তর্ভুক্ত মহাকাশ-কোষ, যেটিতে ইতিহাসের সর্বপ্রথম মহাকাশচারী ইউরি গাগারিনকে পরিবহন করেছিল। সোভিয়েত নির্মিত সয়ুজ ও মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার নির্মিত ওরায়ন মহাকাশযানগুলিতেও মহাকাশ-কোষ রয়েছে।
ইউরি গ্যাগারিন
ইউরি আলেক্সেইভিচ্ গাগারিন একজন সোভিয়েত বৈমানিক এবং নভোচারী। তিনি সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি মহাকাশ ভ্রমণ করেন, তিনি ভস্টক নভোযানে করে ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল, পৃথিবীর কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করেন। গ্যাগারিন-এর ফলে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন এবং তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের নায়কে পরিণত হন এবং দেশে বিদেশে বহু পুরস্কার এবং পদক লাভ করেন। ভস্টক ১ তার একমাত্র মহাকাশ যাত্রা হলেও, তিনি সুয়েজ ১ মিশনের ব্যাকআপ হিসেবে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। গ্যাগারিন পরবর্তীতে মস্কোর বাইরে অবস্থিত মহাকাশচারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ডেপুটি ট্রেনিং ডিরেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, পরে যা তার নিজের নামানুসারে নামকরণ করা হয়। গ্যাগারিন ১৯৬৮ সালে একটি মিগ ১৫ প্রশিক্ষণ বিমান চালনার সময় বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন।
ভালেন্তিনা তেরেসকোভা
ভালেন্তিনা ভ্লাদিমিরোভনা তেরেশকোভা রুশ প্রকৌশলী, সংসদ সদস্য ও প্রাক্তন মহাকাশচারী। তিনি মহাকাশে বিচরণকারী সর্বপ্রথম এবং সর্বকনিষ্ঠ নারী। তিনি ১৯৬৩ সালের ১৬ জুন একক মহাকাশ-যাত্রায় ভোস্টক ৬ মহাকাশযানে আরোহণ করে পৃথিবীকে প্রায় ৪৮ বার প্রদক্ষিণ করেন এবং প্রায় তিন দিন মহাকাশে সময় অতিবাহিত করেন।
সোভিয়েত মহাকাশ কর্মসূচির জন্য নির্বাচিত হবার আগে তেরেশকোভা একটি বস্ত্রনির্মাণ কারখানার কর্মী ও শৌখিন শূন্যে ঝাঁপদাত্রী ছিলেন। এরপর তিনি মহাকাশচারী বিভাগের অংশ হিসাবে সোভিয়েত বিমান বাহিনীতে যোগদান করেন এবং প্রশিক্ষণ শেষ করে কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে মহিলা মহাবিদ্যালয়ের প্রথম দলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন হবার পরে তেরেশকোভা মহাকাশচারী প্রশিক্ষক হিসাবে মহাকাশ কর্মসূচিতে থেকে যান। পরে তিনি ঝুকভস্কি বিমান বাহিনী প্রকৌশল অ্যাকাডেমি থেকে স্নাতক হন এবং মহাকাশ যাত্রার জন্য যোগ্যতা অর্জন করেন। তবে তিনি এরপর আর কখনও মহাকাশে যাননি। ১৯৯৭ সালে তিনি মেজর জেনারেল পদমর্যাদা অর্জন করে বিমান বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
তেরেশকোভা ১৯৪৮ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত সুপ্রিম সোভিয়েতের প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দফতরে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়। তিনি ১৯৯৫ ও ২০০৩ সালে দুই বার জাতীয় রাজ্য দুমার নির্বাচনে পরাজিত হন। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে আঞ্চলিক সংসদ ইয়ারোস্লাভল ওব্লাস্ট দুমার হয়ে নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে তিনি সংযুক্ত রাশিয়া দলের সদস্য হিসাবে জাতীয় রাজ্য দুমায় নির্বাচিত হন এবং ২০১৬ সালে পূনরায় নির্বাচিত হন।
বাংলাদেশের মহাকাশ গবেষণা
বাংলাদেশের মহাকাশ গবেষণার যাত্রা শুরু হয় বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। ২০১৮ সালের ১২ মে এটি উৎক্ষেপণ করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে, স্পেসএক্সের ফ্যালকন ৯ রকেটের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মূলত বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ, ব্রডকাস্টিং এবং ইন্টারনেট সার্ভিসকে শক্তিশালী করতে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ পরিষেবা বৃদ্ধি করেছে। বিদেশি স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় করেছে। দূরবর্তী শিক্ষার প্রচারে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উন্নতিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
মহাকাশযানের গতিবেগ
মহাকাশ অভিযান করার জন্য একটি মহাকাশযানকে ঘণ্টায় প্রায় তিরিশ হাজার মাইল গতিবেগ অর্জন করতে হয় যেটি শব্দের গতিবেগ থেকে প্রায় আটগুণ বেশি। এর জন্য একাধিক রকেটকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। মহাকাশচারীসহ একটি মহাকাশযানকে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনতে হলে এই প্রচণ্ড গভিবেগ বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার সময় বাতাসের বর্ষণে সৃষ্ট তাপকে বিকিরণ করে ভার গতিবেগ আবার সহনশীল পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিজ্ঞানীদের দীর্ঘকাল গবেষণা করতে হয়েছে। মহাকাশযানের গতিপথ নির্ণয়, যন্ত্রপাতি নিখুঁতভাবে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বক্ষণ পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়।
কেকে/এএম