আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই মাথায় আলকাতরা মাখা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। ভিডিওটিতে দেখা যায়, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরীর উপস্থিতিতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপি নেতাকর্মীরা এক মধ্যবয়সী লোককে মাথায় আলকাতরা মেখে রাস্তায় ঘোরাচ্ছেন, পেছনে শতশত মানুষ নানা স্লোগান দিচ্ছেন আবার কেউ কেউ তাকে মারছেনও। পরবর্তীতে তাকে নাশকতা মামলায় পুলিশেও দেওয়া হয়।
সে সময় ভিডিওটি নেট দুনিয়ায় ব্যাপক আলোচনা সমালোচনার জন্ম দেয়। যানা যায় আলোচিত সমালোচিত সেই ভিডিওতে যাকে দেখা যায় তিনি হচ্ছেন ঢাকা জেলা দক্ষিণ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি ও আওয়ামী লীগ মনোনীত শুভাঢ্যা ইউনিয়ন ৬নং ওয়ার্ডের দুইবারের মেম্বার মো. শাহীন।
তবে সে শাহীন মেম্বার ফের আলোচনায় এলেন আগানগর ইউনিয়ন গ্রাম আদালতের প্যানেল চেয়ারম্যান হয়ে।
অপরদিকে জিনজিরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সাবেক বিদ্যুৎ জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর একান্ত আস্থাভাজন মো. রায়হান উদ্দিন। তিনি প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর হয়ে নির্বাচন করেছেন এবং নৌকা মার্কার ভোট চাওয়া বেশ কিছু ভিডিও যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়। জিনজিরা, শুভাঢ্যা, আগানগরসহ বেশ কিছু ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ পন্থী মেম্বারদের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে চরম হতাশা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
স্থানীয়রা বলছেন, স্থানীয় প্রশাসনক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে ম্যানেজ করে হত্যা মামলাসহ তিন মামলার আসামি হয়েও চেয়ারম্যানের মতো সম্মানজনক পদ ভাগিয়ে নিয়েছেন শাহিন মেম্বার। আর রায়হান আওয়ামী লীগের সুযোগ সুবিধা নিয়ে এখন চরিত্র পালটে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে যোগদান করছেন।
ছাত্র আন্দোলন প্রতিহত করতে কেরানীগঞ্জের আগানগর ও কদমতলী মোড়ে সার্বক্ষণিক টহলে ছিলেন এ শাহীন মেম্বার।
তা ছাড়া ৫ আগস্ট নতুন বাংলাদেশে বিএনিপি নেতারা যাকে জুতার মালা আর মাথায় আলকাতরা মেখে বেইজ্জতি করেছেন সেই মেম্বারকে চেয়ারম্যান বানিয়ে ইজ্জত ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা জনমনে হাসিতে রূপ নিয়েছে।
সচেতন মহল মনে করছেন, বিশেষ সুবিধায় ছাত্র হত্যা, বিস্ফোরণ মামলার আসামি হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যা জুলাই বিপ্লবে শহিদ এবং নিপিড়ীত ছাত্রজনতার সাথে বেইমানি।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নেতারা বলছেন, উপজেলা প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বিষয়টি তাদের আরো যাচাই বাছাই করা দরকার ছিল। আওয়ামী লীগের দোসরদের পুঃনবাসন করে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বিষয়টি খুবই লজ্জাজনক।
এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী কেন্দ্রীয় ছাত্র আন্দোলনের প্রচার সেলের সদস্য ইমরান হোসেন বলেন, আমরা জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে এজন্য রক্ত এবং জীবন দিয়েছি? যাদের হাতে ছাত্রজনতা নির্যাতিত হয়েছে তারাই আবার বিচারক? এ গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান নিয়োগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করি। আশা করি প্রশাসন তাদের এ ভুল সিদ্ধান্ত পুনঃবিবেচনা করবেন।
নবনির্বাচিত গ্রাম আদালতেরর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুটি মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম।
এর আগে গত ১১ ফেব্রুয়ারি কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিনাত ফৌজিয়া স্বাক্ষরিত একটি পরিপত্র জারি করে সাথী আলীকে শুভাঢ্যা, মো. শাহীনকে আগানগর এবং মো. রায়হানকে জিনজিরা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন।
প্রশাসন বলছে, যে সকল ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত চেয়ারম্যানেরা ধারাবাহিকভাবে অনুপস্থিত সেসব স্থানে সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ মোতাবেক প্রশাসক নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে সে সকল ইউনিয়ন পরিষদে জনস্বার্থে গ্রাম আদালত পরিচালনার জন্য গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬-এর ৫(২) ধারা মোতাবেক গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিনাত ফৌজিয়া বলেন, আমার কাছে ডিসি অফিস থেকে নির্দেশনা ছিল তিন দিনের মধ্যে গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করার জন্য এবং বর্তমান নিযুক্ত গ্রাম আদালত প্যানেল চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা থাকার বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য ছিল না। তার বিরুদ্ধে মামলা থাকার বিষয়ে তথ্য পেলে তদন্ত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কেকে/এএম