দেশে আগামী ১ বা ২ মাচ সম্ভাব্য শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান মাস। রমজান মাসে নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা রাখা একটি চিরাচরিত চ্যালেঞ্জ। রমজানে বাড়তি চাহিদা থাকে এমন প্রায় সব পণ্যের দামই এখন বেশ চড়া। এরই মধ্যে অস্থির হয়ে উঠছে ভোগ্য পণ্যের বাজার। বাজার থেকে বোতলজাত সয়াবিন তেল কার্যত উধাও হয়ে গেছে। চিনি ও খেজুরের দামও বাড়তির দিকে। এছাড়া দাম বাড়ার তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে চাল, ছোলা, ডাল, গরুর মাংস, ব্রয়লার মুরগি, মাছ, লেবু ও শসা। যদিও রমজানে অতি প্রয়োজনীয় কিছু নিত্যপণ্যের দাম কমানোর জন্য সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত সেই পণ্যগুলোর দামে অস্বস্তি নিয়েই শুরু হচ্ছে পবিত্র রমজান।
প্রতি বছরই রমজান মাস ঘিরে প্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এ বাড়তি চাহিদার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা সরবরাহ সংকটের অজুহাত দেখিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেন। ফলে সাধারণ ভোক্তা, বিশেষত নিম্ন আয়ের মানুষ অর্থনৈতিক চাপে পড়ে যান। বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও বাজার বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মনের শঙ্কা কাটছে না।
রমজানের আগেই সক্রিয় অদৃশ্য সিন্ডিকেট :
রমজান মাস সামনে রেখে প্রতি বছরের মতো এবারো সেই পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠছে। চক্রের সদস্যরা ভোক্তার পকেট কাটতে পুরোনো মোড়কে নতুন ফাঁদ পেতেছে। পরিস্থিতি এমন-রোজায় দাম বাড়ানো হয়েছে, এ ধরনের অভিযোগ থেকে রক্ষা পেতে অনেক আগেই নীরবে বাড়ানো হয়েছে কিছু কিছু পণ্যের দাম। ফলে ভোক্তার এখন থেকেই বাজারে পণ্য কিনতে বাড়তি চিন্তা শুরু হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর খুচরা বাজার ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিন্ডিকেট সদস্যরা এবার রমজাননির্ভর পণ্যের পাশাপাশি অন্যকিছু পণ্যের দামও বাড়িয়েছে। ছোলা থেকে শুরু করে ডাল, ভোজ্যতেল, খেজুর, চিনির পাশাপাশি চালসহ একাধিক পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। আর এ বাড়তি দরে এসব পণ্য কিনতে ভোক্তার নাভিশ্বাস উঠেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, দুর্বল মনিটরিংয়ের সুযোগ নিয়ে পুরো রমজান মাসজুড়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এই সিন্ডিকেট চক্র। তাই বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন থেকেই সংশ্লিষ্টদের বাজারে নজরদারি বাড়াতে হবে। কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
এদিকে চলতি বছর সরকার নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিরতা বজায় রাখতে শুল্কছাড়, বাজার মনিটরিং ও টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রিসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ও রমজান সামনে রেখে বিশেষ তদারকি দল গঠন করেছে, যা জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের নিয়মিত তদারকি দলের সঙ্গে কাজ করছে। এছাড়া টিসিবির মাধ্যমে সুলভ মূল্যে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ অব্যাহত থাকছে।
বাজার থেকে ‘উধাও’ সয়াবিন তেল :
রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ও মহল্লার দোকানগুলোতে হঠাৎ করে উধাও হয়ে গেছে সয়াবিন তেল। কোনো কোনো দোকানে পাওয়া গেলেও সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে না। সেগুলোতে বোতলজাত তেলের গায়ের মূল্য মুছে লিটারপ্রতি সয়াবিন তেল বিক্রি করা হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত। আবার বোতলজাত সয়াবিন তেল কিনতে পারছেন না ক্রেতারা। আর কবে নাগাদ বাজারে সরবরাহ ঠিক হবে, সেটিও জানাতে পারছেন না বিক্রেতারা।
গতকাল বুধবার রাজধানীর কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও আগারগাঁও তালতলা এবং মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ঘুরে ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিক্রেতারা জানান, গত নভেম্বর মাস থেকেই বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট চলছে। মাঝের সময়ে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে আট টাকা বাড়ানোর পরে সরবরাহের সংকট কিছুটা কমেছিল। তবে চলতি মাসের শুরু থেকে আবার তীব্র হয়েছে এ সংকট।
যদিও দেশে বোতলজাত তেলের এই সংকট অনেক দিন ধরে চলছে। গত নভেম্বরে সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছিল। শুল্ক-কর কমানোর পরও সংকট কাটেনি। বাজারে সংকট থাকলেও বিপুল পরিমাণ সয়াবিন তেল আমদানির তথ্য রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাবে, জানুয়ারি মাসে ১ লাখ ১৭ হাজার টন সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে।
এর আগে এক সপ্তাহের ব্যবধানে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঁচ ট্যাংকারে আমদানি হচ্ছে ৭৮ হাজার টন বা সাড়ে ৮ কোটি লিটার সয়াবিন তেল। আর রোজা শুরুর প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ৪ ট্যাংকারে আরো ৫১ হাজার টন সয়াবিন তেল আসার কথা রয়েছে। অর্থাৎ রোজার এক সপ্তাহের মধ্যেই ১ লাখ ২৯ হাজার টন বা প্রায় ১৪ কোটি লিটার সয়াবিন তেল আমদানি হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও আমদানিকারকদের সূত্রে আমদানির এ তথ্য পাওয়া গেছে।
রোজাকে সামনে রেখে এমন সময়ে আমদানি বাড়ছে যখন বাজার থেকে বোতলজাত সয়াবিন তেল কার্যত উধাও হয়ে গেছে। এ অবস্থায় শেষ মুহূর্তে একের পর এক ট্যাংকার বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করায় ধীরে ধীরে সয়াবিন তেলের সংকট কেটে যাবে বলে মনে করেন আমদানিকারকরা। তবে তেলের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানির পর এসব তেল দ্রুত বাজারজাত করা না হলে রোজার শুরুতে বাজারের সংকট কাটবে না।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিন তেল সরবরাহ করছে না। তবে ভিন্ন তথ্য বলছে সরকারি সংস্থাগুলো। বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালিয়ে বোতলজাত সয়াবিন মজুতের প্রমাণ পেয়েছে তারা। তাদের ভাষ্য, কোম্পানিগুলো এখন সরবরাহ বাড়িয়েছে। তবে কিছু ব্যবসায়ী নিজেরা সয়াবিন মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। দোকানিরা ১৭৫ টাকার সয়াবিন ২০০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ ক্রেতাদের।
লেবুর পিস ২০ টাকা :
রমজান মাসকে সামনে রেখে আগে থেকে বাজারে যেসব পণ্যের দাম বাড়ান অসাধু ব্যবসায়ীরা তার মধ্যে একটি হচ্ছে লেবু। এবার বাজার অনেকটাই স্থিতিশীল থাকলেও হঠাৎ লেবুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন সরবরাহকারীরা। খুচরায় এক লাফে দাম বেড়ে প্রতি পিস বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা পর্যন্ত। এক হালির দাম পড়ছে ৮০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া বেড়েছে শসা ও বেগুনের দামও।
ভোক্তাদের অভিযোগ, কয়েক দিন আগেও যে লেবুর হালি ২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে, এখন সে লেবুর একটির দামই ২০ টাকা। এক লাফে কীভাবে এতটা দাম বাড়ে- তা তারা বুঝে উঠতে পারছেন না। দোকানিদের কাছে কারণ জানতে চাইলে তাদের একটাই জবাব, আড়তে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরাতেও বাড়াতে হয়েছে।
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বড় সাইজের এলাচি লেবু ৮০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা যায়। সেই সঙ্গে মাঝারি সাইজের বিক্রেতারা যেটাকে সিলেটি লেবু বলছেন সেটিও একই দামে বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতারা জানান, কয়েকদিন আগেও এলাচি লেবুর হালি সর্বোচ্চ ৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এখন বেড়ে ৭০ থেকে সর্বোচ্চ ৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাইকারিতে দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে।
ভোগাতে পারে কনটেইনার জট :
রমজানকে ঘিরে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ ভোগ্যপণ্যের জট এখন চট্টগ্রাম বন্দরে। খালাস না হওয়ায় প্রায় ৪০ হাজার কনটেইনারের স্তূপ জমেছে বন্দরে। এসব মজুত করে মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারার অভিযোগ উঠেছে। আগামী ৯ মার্চের মধ্যে ডেলিভারি না নিলে ৪ গুণ মাশুল আদায়ের ঘোষণা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে এ মুহূর্তে মজুত ৪০ হাজার ৮৯টি কন্টেইনারের মধ্যে ৩১ হাজার ৩৮৪টি এফসিএল (ফুল লোড) কন্টেইনার। আমদানি করা এসব কন্টেইনারের পণ্য ছাড় না করে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বন্দরের ইয়ার্ডে ফেলে রেখেছে।
অভিযোগ উঠেছে, রমজানে ভোগ্য পণ্যের দাম বাড়ানোর কৌশল হিসেবেই এসব কন্টেইনার ছাড় করানো হচ্ছে না। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ জাহেদী জানান, অতিরিক্ত পণ্য আসার কারণে খালাসের ক্ষেত্রে একটু সময় ক্ষেপণ হচ্ছে। যার কারণে মালগুলো সেখানে পড়ে আছে।
শুধু বন্দর নয়, ১৯টি অফডকেও জমেছে আমদানি করা পণ্যবোঝাই এফসিএল কন্টেইনার। বর্তমানে অফডকগুলোতে আট হাজার ৭০০ আমদানি এবং আট হাজার ৩০০ রফতানির এফসিএল কন্টেইনার মজুত হয়ে আছে। অফডকেও রহস্যজনকভাবে এফসিএল কন্টেইনারের পণ্য ডেলিভারিতে ধীরে চলো নীতিতে নিয়েছেন আমদানিকারকরা বলে জানান বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার।
তিনি বলেন, ‘অনেক আমদানিকারক চট্টগ্রাম বন্দরকে স্টরেজ হিসেবে ব্যবহার করছে। আমরা যখন আমাদের পণ্যবাহী কন্টেইনার বের করতে যাই, তখনও কিন্তু এ কন্টেইনার জট নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে আমাদের অপারেশনের ওপর।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা যে কোনো পণ্যবোঝাই কন্টেইনার চার দিন পর্যন্ত বিনা শুল্কে বন্দরের ইয়ার্ডে রাখার সুযোগ পান আমদানিকারক। পরবর্তীতে ২০ ফুট সাইজের কন্টেইনার ৬ ডলার, ৪০ ফুটের কন্টেইনারের জন্য ১২ ডলার জরিমানা দিতে হয়। এভাবে প্রতিটি কন্টেইনারে ২৪ এবং ৪৮ ডলার পর্যন্ত জরিমানা আদায় করে বন্দর।
সংকট অনেকটা ‘কৃত্রিম’ :
বাজারে সয়াবিন তেলের সংকটের খবরে বাজারগুলো ঘুরে দেখেছে বাজার তদারকি সংস্থাগুলো। এর মধ্যে অভিযানে গিয়ে বাজারে বোতলজাত সয়াবিনের পর্যাপ্ত মজুত দেখেছেন তারা। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বাজারের এ সংকট অনেকটা কৃত্রিম। তারা বাজারে বিভিন্ন সময় গিয়ে অধিকাংশ দোকানেই সয়াবিন পেয়েছেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার আসন্ন রমজানের বাজার নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এক মতবিনিময় সভায় একই কথা জানানো হয়। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, গোয়েন্দা দফতর থেকেও বলা হয়, বোতলজাত সয়াবিনের সংকট থাকার কথা নয়। যথেষ্ট পরিমাণে সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে।
বাজারে তেল সরবরাহকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মীরা বলছেন, তেল সরবরাহ কিছুটা কম। তবে যেটুকু সরবরাহ করা হচ্ছে, সেটিও কিছু দোকানি মজুত করে দাম বেশি নিচ্ছেন। ৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিন বিক্রয়কর্মীরা দিচ্ছেন ৮৩৭ টাকা দরে। যেটি বিক্রি করার কথা ৮৫০ টাকায়, দোকানিরা দাম নিচ্ছেন এক হাজার টাকা।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপপরিচালক (চট্টগ্রাম বিভাগ) মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ বলেন, ‘সংকট অনেকটা কৃত্রিম। আমরা বাজারে গিয়ে সয়াবিনের মজুত পেয়েছি বেশ কয়েকটি দোকানে। জরিমানা করা হয়েছে, কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাতে সয়াবিনের বাজার অস্থিতিশীল না হয়।’
কেকে/এআর