শনিবার দেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে নওগাঁর বদলগাছী, পাবনা ও রাজশাহীতে। এর আগের দিন শুক্রবার যশোরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছিল ৮ ডিগ্রিতে। অর্থাৎ টানা দুই দিন তাপমাত্রা কিছুটা বাড়লেও শীতের প্রকোপ তেমন কমেনি।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) রাজধানী ঢাকায় দুপুর পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় চারদিক আচ্ছন্ন ছিল। দুপুরের পর অল্প সময়ের জন্য সূর্যের দেখা মিললেও তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি; কিছুক্ষণ পর আবার কুয়াশায় ঢেকে যায় আকাশ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী এক থেকে দুই দিন ঢাকায় একই ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে। বৃষ্টিপাত না হলে কুয়াশা কাটার সম্ভাবনাও কম। গতকাল ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যেখানে আগের দিন শুক্রবার তা ছিল ১৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি।
এদিকে প্রচণ্ড শীতে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। দিনের বেলায়ও গাড়ি চলাচল করতে হচ্ছে হেডলাইট জ্বালিয়ে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষ।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জানুয়ারিতে দেশে চার থেকে পাঁচটি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে দু-তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি এবং এক-দুটি মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, এরই মধ্যে একটি শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। আরও অন্তত দুই দিন এর প্রভাব থাকতে পারে।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বিশেষ করে নদী অববাহিকা অঞ্চলে হালকা থেকে মাঝারি কুয়াশা দেখা দিতে পারে, যা কখনও দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। কুয়াশার কারণে দিন ও রাতের পার্থক্য কমে বাড়তে পারে শীতের তীব্রতা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের কাছে ১৯৪৭ সাল থেকে দেশের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড সংরক্ষিত। সে রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশের তাপমাত্রা ইতিহাসে একাধিকবার ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে নেমেছে। আর প্রায় সব সময় শীতের কেন্দ্র ছিল উত্তরাঞ্চল।
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৪ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি শ্রীমঙ্গলে তাপমাত্রা নেমে আসে ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ৫০ বছর পর ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সেই রেকর্ড ভেঙে যায়। ওই বছর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্ততরের ভাষ্য অনুযায়ী, এটিই এখন পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড। এর আগে ২০১৩ সালেও উত্তরাঞ্চলে তীব্র শীতের রেকর্ড হয়। সে সময় রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি, দিনাজপুরে ৩ দশমিক ২ এবং সৈয়দপুরে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আরও আগে ২০০৩ সালে রাজশাহীতে তাপমাত্রা নেমে আসে ৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, শীতকালে দেশের অন্য এলাকার তুলনায় উত্তরাঞ্চলেই তাপমাত্রা কম থাকে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এর পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক অবস্থান ও বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক নিয়ম।
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, “শীতকালে উত্তর ভারতের দিল্লি, কাশ্মীর ও আশপাশ অঞ্চলে তাপমাত্রা খুব কমে যায়। পৃথিবীর বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক গতিপথ অনুযায়ী ঠান্ডা বাতাস পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়। ফলে দিল্লি, বিহার, উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে সেই ঠান্ডা বাতাস বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হয়।”
এদিকে উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁয় এক দিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। বদলগাছী কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টায় নওগাঁয় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিন তা ছিল ১১ দশমিক ৮ ডিগ্রি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শনিবার ভোর থেকেই চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায়। সঙ্গে উত্তর দিক থেকে বয়ে আসা হিমেল হাওয়ায় শীত আরও তীব্র হয়। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন ছিন্নমূল মানুষ ও শ্রমজীবীরা।
জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আশিকুর রহমান জানান, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার ৬০০ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। আরও প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কম্বল বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
কেকে/এলএ