ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এ্যাব) আহ্বায়ক শাহরিন ইসলাম চৌধুরী তুহিন বলেছেন, ‘দেশের প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধাবীদের আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে ১৯৭৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় চালু হওয়া সুপিরিয়র সার্ভিস সিলেকশন (এসএসপি) পদ্ধতিতে ফিরে আসা উচিত। শুধু ১৮০টি পদে প্রকৌশলীদের সুযোগ দেওয়ার দাবি নয়, বরং সব ক্যাডারের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিদের উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক পদে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।’
শনিবার (৮ আগস্ট) ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) ঢাকা কেন্দ্রের মিলনায়তনে গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে ‘ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী, স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আইইবি ঢাকা কেন্দ্র এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে শাহরিন ইসলাম তুহিন আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের জুলাইয়ের আন্দোলনকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে যে গণআন্দোলন হয়েছে, বাংলাদেশের ঘটনাকেও সেই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।’
চলতি শতাব্দীতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় ধরনের আন্দোলন ও সরকার পতনের ঘটনা ঘটেছে। ২০০৩-২০০৫ সালের মধ্যে পূর্ব ইউরোপে জর্জিয়ার রোজ রেভল্যুশন এবং ইউক্রেনের অরেঞ্জ রেভল্যুশনের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এসব আন্দোলনের অন্যতম কারণ ছিল নির্বাচনি ব্যবস্থায় অনিয়ম ও ‘রিগড ইলেকশন’-এর বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ।’
‘বাংলাদেশের পরিবর্তন এক দিনে আসেনি। এর পেছনে দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন, সংগ্রাম ও মানুষের ত্যাগ রয়েছে। আমাদের দেশে যেটা হয়েছে তা অর্জনে ১৭ বছর লেগেছে।’
আরব বিশ্বের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, ‘২০১০-২০১২ সালের মধ্যে তিউনিসিয়া, মিসর ও লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আরব স্প্রিংয়ের মাধ্যমে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছিল। জনগণের আন্দোলনের মুখে এসব দেশে দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটে।’
‘২০২২ সালে শ্রীলঙ্কাতেও সরকারবিরোধী ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। মিস ম্যানেজমেন্ট, নেপোটিজম ও সরকারের অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ রাজপথে বিস্ফোরিত হয়। এর ফলে দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটে এবং দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়।’
তার মতে, বিশ্বের এক দেশের গণআন্দোলনের প্রভাব অন্য দেশেও পড়ছে এবং এই ‘ফেনোমেনন’ ধীরে ধীরে সংক্রামক হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গে এ্যাবের আহ্বায়ক বলেন, ‘বিএনপির ১৭ বছরের বিরোধী দলের আন্দোলনের ধারাবাহিকতার ফসল হিসেবে জুলাইয়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে দেশের তরুণ ও যুবসমাজ। এর ফল আজ দেশের মানুষ ভোগ করছে।’
সম্প্রতি নেপালের সরকার পতনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মাত্র ছয় দিনের আন্দোলনে দেশটির একটি নির্বাচিত সরকারের পতন হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর সেখানে মানুষের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।’
শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, ‘নেপালের আন্দোলন থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। বাংলাদেশের পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বহু মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে, অসংখ্য মানুষকে ব্যথা ও ক্ষতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এই অর্জনকে কোনোভাবেই হেলাফেলা করা যাবে না।’
‘আমরা গত দুই দিন আগে দেখলাম ভারতে একটা প্রেস কনফারেন্স হয়েছে। যেই দিনে এই ফ্যাসিস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, সেই দিনকে তারা বেছে নিয়েছে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে, বাংলাদেশের মানুষকে দোষারোপ করার জন্য। এটা কিসের প্রতিধ্বনি? আমরা কি দেশের ভিতর থেকে কারও মেসেজ দিচ্ছি?’
দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী দুই বছরে যেন সবকিছুকে গুলিয়ে ফেলা না হয়, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আমাদেরকে ইউনাইটেড থাকতে হবে।’
দেশ পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানিয়ে শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, ‘ফ্যাসিবাদকে প্রতিহত করে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে তারেক রহমান যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং গণতন্ত্রে যে বিশ্বাস করেন, মানুষের অংশগ্রহণে দেশ পরিচালনায় যে বিশ্বাস করেন, সেই আস্থা জনগণের মধ্যে তৈরি করতে হবে। তা না হলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বর্তমান প্রজন্মকে দায়ী থাকতে হবে।’
সরকারের দায়িত্বশীলদের সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এ্যাবের আহ্বায়ক বলেন, ‘এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগ। এ সময়ে সরকারের ভেতরে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের প্রভাব দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। নেপালের আন্দোলন থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।’
‘সরকারের মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টদের সজাগ থাকতে হবে। সরকারের ভেতরের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড যাতে সরকারের ভাবমূর্তি ও দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।’
শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, ‘প্রকৌশলীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিটি এ দেশের প্রকৌশলী সমাজের একটি বড় দাবি।’
তিনি এ দাবির সঙ্গে সম্পূর্ণ একাত্মতা ঘোষণা করেন।
‘প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রকৌশলীদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে সেখানে এ দাবিটি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে। বিষয়টি শুধু ১৮০টি পদে প্রকৌশলীদের সুযোগ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধাবীদের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে আসার জন্য প্রশাসনিক কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।’
এ প্রসঙ্গে ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়কার সুপিরিয়র সার্ভিস সিলেকশন বা এসএসপি পদ্ধতির কথা তুলে ধরেন তিনি।
তার বক্তব্য, ওই ১৮০টা পদই না, আমি মনে করি যে ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সাহেবের যে এসএসপি (সুপিরিয়র সার্ভিস সিলেকশন) পদ্ধতি যেটা ছিল, আমাদেরকে সেটাতে ফেরত আসতে হবে।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী মেধার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার কথা বলছেন। সে ক্ষেত্রে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও মেধা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’
‘আমাদের এসএসপিতে মেধাভিত্তিক দেশ পরিচালনা মানে আমলাতন্ত্রে ডেপুটি সেক্রেটারি থেকে উপরে যে কেউ যেতে হলে সকল ক্যাডার মিলে একটা পরীক্ষার মাধ্যমে বেস্ট কোয়ালিফাইড ব্যক্তিরা পরবর্তী র্যাংকে যাবে।’
এ ধরনের ব্যবস্থায় কারও আপত্তি থাকার কথা নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তুহিন বলেন, ‘একজন ব্যক্তি যে পেশারই হোন না কেন, তার যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।’
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ও শীর্ষ পদগুলোতে সবচেয়ে যোগ্য ও মেধাবী ব্যক্তিদের কাজে লাগানোর ওপর জোর দেন তিনি।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উন্নয়নের উদাহরণ তুলে ধরে শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, ‘চীনের নেতৃত্বে প্রকৌশলীদের বড় অংশগ্রহণ রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আইনজীবীদের উপস্থিতি বেশি। চীন প্রকৌশলভিত্তিক মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, বাংলাদেশকেও দেশ পরিচালনায় মেধাবীদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে।’
‘দেশের উন্নয়নে শুধু প্রকৌশলীদেরই নয়, চিকিৎসক, কৃষিবিদ, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশার মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিদের রাষ্ট্র পরিচালনায় কাজে লাগানো প্রয়োজন।’
প্রকৌশলীদের এ দাবিকে সামনে এগিয়ে নিতে এ্যাব এবং আইইবি যৌথভাবে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করবে বলেও জানান তিনি।
শাহরিন ইসলাম তুহিন বলেন, ‘আমাদের ইঞ্জিনিয়ার ভাইদের সঙ্গে ইনশাআল্লাহ আমরা এটা নিয়ে, আইইবি এবং এ্যাব মিলে যৌথভাবে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করব ইনশাআল্লাহ, যাতে করে আমরা সমাধান করতে পারি।’
কেকে/এমএ