শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। ভোরের বাতাসে শিউলির মিষ্টি ঘ্রাণ। প্রকৃতির এমন রূপেই যেন ভেসে আসে দেবীর আগমনী বার্তা। সেই বার্তাকে স্বাগত জানাতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন মাগুরার শালিখা উপজেলার কুমারপাড়ার কারিগররা। কারও হাতে তুলি, কারও হাতে মাটির সরঞ্জাম। কেউ ব্যস্ত দেবীর মুখাবয়ব ফুটিয়ে তুলতে, কেউবা শেষ করছেন প্রতিমার সাজসজ্জা।
শারদীয় দুর্গোৎসব যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে তাদের ব্যস্ততা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কুমারদের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর হয়ে উঠেছে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ। বাঁশ, খড় ও মাটির নির্জীব কাঠামোতে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে দেবীর রূপ। শেষ মুহূর্তের তুলির আঁচড়ে সেই রূপ যেন পেতে শুরু করেছে প্রাণের স্পন্দন।
শালিখা উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা যায়, কোথাও চলছে প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ, কোথাও মাটির প্রলেপ দেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও প্রতিমার শরীরের সূক্ষ্ম কারুকাজ শেষ করে চলছে রঙের কাজ। শিল্পীর নিপুণ হাতে একেকটি প্রতিমার মুখাবয়ব হয়ে উঠছে স্বতন্ত্র ও জীবন্ত।
প্রতিমা তৈরির কাজটি বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটাই শ্রমসাধ্য। প্রথমে বাঁশ ও খড় দিয়ে তৈরি করতে হয় কাঠামো। এরপর বিভিন্ন ধাপে দেওয়া হয় মাটির প্রলেপ। মাটি শুকিয়ে গেলে শুরু হয় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের আকৃতি ঠিক করার কাজ। এরপর চোখ, নাক, ঠোঁটসহ মুখাবয়বের সূক্ষ্ম কাজ। সবশেষে রং, চুল, শাড়ি, অলংকার ও অন্যান্য সাজসজ্জায় পূর্ণতা পায় দেবীর প্রতিমা।
উপজেলার চুকিনগর বারাঙ্গা খাল পূজামণ্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিলেন কুমার নিরঞ্জন সরকার। কথা বলার ফাঁকেও থামছিল না তার হাত। কখনো মাটির আস্তরণ ঠিক করছেন, কখনো প্রতিমার কোনো অংশে দিচ্ছেন সূক্ষ্ম ছোঁয়া।
নিরঞ্জন সরকার বলেন, ‘পূজার সময় যত ঘনিয়ে আসে, কাজের চাপও তত বেড়ে যায়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিমা তৈরি করে দিতে হয়। তাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরাও কাজে সহযোগিতা করেন।’
তার কথায়, এ কাজ শুধু জীবিকা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আবেগ ও ভালোবাসা। মাটির একটি কাঠামো যখন ধীরে ধীরে দেবীর প্রতিমায় রূপ নেয় এবং পূজামণ্ডপে স্থান পায়, তখন দীর্ঘদিনের শ্রমের মধ্যে এক ধরনের তৃপ্তি আসে।
শালিখার বিভিন্ন মণ্ডপে এখন একই চিত্র। কোথাও শিল্পীরা প্রতিমার চোখ আঁকছেন, কোথাও চলছে চুল ও অলংকার পরানোর কাজ। কোনো মণ্ডপে আবার চলছে প্যান্ডেল ও আলোকসজ্জার শেষ প্রস্তুতি। সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে।
তবে দুর্গাপূজার এ বর্ণিল আয়োজনের নেপথ্যে থাকা মানুষগুলোর কথা অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়। ঢাকের বাদ্য, আলোর ঝলকানি কিংবা মণ্ডপের সৌন্দর্য দেখে দর্শনার্থীরা মুগ্ধ হলেও এর পেছনে থাকা কুমারদের রাতজাগা শ্রমের গল্প খুব কমই সামনে আসে। অথচ তাদের হাতেই মাটি প্রাণ পায়, তাদের শিল্পেই দেবীর রূপ পূর্ণতা পায়।
শালিখা উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের আহ্বায়ক গোবিন্দ বিশ্বাস বলেন, ‘উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে শালিখায় শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। এ বছর উপজেলায় ১৬১টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অধিকাংশ মণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ, সাজসজ্জাসহ অন্যান্য প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা সমন্বিতভাবে কাজ করবেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’
শালিখা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আশিকুর রহমান বলেন, ‘উপজেলার প্রতিটি পূজামণ্ডপের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। উৎসব চলাকালে পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর পুলিশের নজরদারি অব্যাহত থাকবে।’
শারদীয় উৎসবের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, কুমারদের ব্যস্ততাও ততই বাড়ছে। রাতের নীরবতা ভেঙে কোনো কোনো মণ্ডপে এখনো শোনা যায় কারিগরদের কাজের শব্দ। মাটির গন্ধ, রঙের ঘ্রাণ আর শিল্পীদের ব্যস্ততায় কেটে যাচ্ছে শেষ সময়।
কয়েক দিনের মধ্যেই এ মাটির প্রতিমাগুলো স্থান নেবে পূজামণ্ডপে। জ্বলে উঠবে আলো, বাজবে ঢাক। ভক্তদের পদচারণায় মুখর হবে মণ্ডপ। আর তখন হয়তো উৎসবের সেই বর্ণিল দৃশ্যের আড়ালে নিঃশব্দে থেকে যাবে কুমারদের শ্রমে ভেজা অসংখ্য দিনের গল্প। মাটি ছুঁয়ে তাদের হাতেই যে দেবীর রূপ পেয়েছে পূর্ণতা, সেই শিল্পই হয়ে উঠবে শারদীয় উৎসবের অন্যতম সৌন্দর্য।
কেকে/এআই