ইট-পাথরের যান্ত্রিক শহর যখন মানুষকে একা করে দিচ্ছে, ঠিক তখনই লাকসামের গ্রামগুলোতে মেঠোপথ ঘেঁষে গড়ে ওঠা চায়ের দোকানগুলো দিচ্ছে এক পশলা প্রশান্তি। গোধূলির আলো ম্লান হতেই লাকসামের গ্রাম্য বাজারগুলোতে শুরু হয় অন্যরকম এক স্পন্দন। শহরের ব্যস্ততা ফেলে গ্রামে আসা মানুষের কাছে এই দৃশ্য যেন কোনো হারানো দিনের রঙিন স্মৃতি।
বিকালের আভা মুছে যাওয়ার আগেই লাকসাম উপজেলার অলিগলিতে থাকা টিনের চালের ছোট দোকানগুলোতে ভিড় জমতে শুরু করে প্রবীণদের। মাটির চুলায় কাঠের জালে তৈরি ধোঁয়া ওঠা কড়া লিকারের চায়ের সাথে চলে দেশ-বিদেশের রাজনীতি থেকে শুরু করে সমাজের খুঁটিনাটি চুলচেরা বিশ্লেষণ। এখানে কোনো সোফা নেই, নেই এসি—তবুও কাঠের লম্বা বেঞ্চেই জমে ওঠে প্রাণের মেলা।
এই আড্ডাগুলো এখন আর কেবল আড্ডা নয়, বরং পরিণত হয়েছে একেকটি ‘সামাজিক পার্লামেন্টে’।
এখানে প্রধানত তিনটি দিক ফুটে ওঠে : প্রবীণরা কিশোর বয়সের সেই হারানো দিন, যৌথ পরিবার আর সোনালী অতীতের গল্প শুনিয়ে মুগ্ধ করেন তরুণ প্রজন্মকে।
এলাকার যেকোনো বিরোধ বা ছোট-বড় সমস্যা নিয়ে মুরুব্বিদের দেওয়া পরামর্শ এখনো আধুনিক আইনের চেয়েও কার্যকর ভূমিকা রাখে।
টাউন থেকে আসা মানুষগুলো যখন এই আড্ডায় বসেন, তখন গ্রামের মানুষের অকপট ভালোবাসা আর সহজ-সরল আতিথেয়তার কাছে শহরের কৃত্রিম আভিজাত্য নিমেষেই হার মানায়।
আড্ডায় থাকা সত্তরোর্ধ্ব এক মুরুব্বি বলেন, ‘শহরে আমরা পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের নামও জানি না, আর এই গ্রামের চায়ের দোকানে পুরো এলাকার আনন্দ-বেদনার খবর এক নিমিষেই জানা যায়। এটাই আমাদের গ্রাম, এটাই আমাদের সার্থকতা।’
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে যখন সবাই স্মার্টফোনে বুঁদ হয়ে আছে, তখনো লাকসামের এই ঐতিহ্যবাহী আড্ডাখানাগুলো প্রমাণ করে—সামাজিক যোগাযোগ আসলে চোখের আড়াল নয়, মনের কাছাকাছি থাকা। এখানে ব্যক্তিগত দাপট বা ক্ষমতার চেয়ে পারস্পরিক সম্মান আর অধিকারই বড় কথা। প্রতিটি কাপের টুংটাং শব্দে যেন প্রতিধ্বনিত হয় এক গভীর ঐক্য।
কেকে/বি