জ্যৈষ্ঠের তীব্র দাবদাহে মৌলভীবাজার জেলাজুড়ে বেড়েছে তালশাঁসের চাহিদা। শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ও সড়কের মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছে তালশাঁসের অস্থায়ী দোকান। গরমে স্বস্তি পেতে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ভিড় করছেন এসব দোকানে। একইসঙ্গে মৌসুমি এই ফল বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ ভ্যানগাড়ি ও রাস্তার পাশে অস্থায়ী স্টলে তালশাঁস বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর চাহিদাও বেড়েছে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে বিক্রি। গরমে ক্লান্ত পথচারীদের কাছে কচি তালের শাঁস হয়ে উঠেছে স্বস্তির অন্যতম উৎস।
শ্রীমঙ্গল শহরের কালিঘাট রোডের তালশাঁস বিক্রেতা মুহম্মদ কালু গাজী জানান, গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিক্রিও বেড়েছে। একটি তালে সাধারণত তিন থেকে চারটি শাঁস পাওয়া যায়। আকারভেদে প্রতিটি শাঁস ২০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
শহরতলীর মুসলিমবাগ এলাকার বিক্রেতা উবায়দুল্লা বলেন, বৈশাখের মাঝামাঝি থেকে আষাঢ়ের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় দুই মাস এ ব্যবসা করেন তিনি। প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০টি তাল বিক্রি হয়। গ্রামাঞ্চল থেকে পাইকারি দরে তাল সংগ্রহ করে এনে বিক্রি করেন।
কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসংলগ্ন এলাকায় তালশাঁস বিক্রেতা লতিব মিয়া জানান, এ বছর গরম বেশি হওয়ায় চাহিদাও বেড়েছে। আকার অনুযায়ী একটি বড় তাল ৫০ টাকা এবং ছোট তাল ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মৌলভীবাজার শহরের সিলেট রোডে তালশাঁস বিক্রেতা করছেন রুহুল ইসলাম জানান, গ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে কচি তালের ফল সংগ্রহ করেন। তালের সংখ্যা ও আকারভেদে একটি গাছের ফল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায় কেনা হয়। প্রতি পিস তাল পাইকারিতে ১০ থেকে ২০ টাকা এবং খুচরায় ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করা হয়। প্রতিদিন পাইকারি ও খুচরা মিলিয়ে তিনি ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার তালের শাঁস বিক্রি করেন তিনি।
ক্রেতাদেরও পছন্দের তালিকায় রয়েছে মৌসুমি এ ফল। ক্রেতা জহিরুল মিয়া বলেন, গরমের সময় প্রায় প্রতিদিনই তালশাঁস খান এবং পরিবারের জন্যও কিনে নিয়ে যান। রিকশাচালক মনির হোসেনের ভাষ্য, দুপুরের প্রচণ্ড গরমে তালশাঁস শরীরে স্বস্তি এনে দেয় এবং তৃষ্ণা মেটাতে সাহায্য করে।
গৃহিণী সায়মা নাসরিন বলেন, গরমে শিশুদের জন্য তালশাঁস ভালো বিকল্প। এর ভেতরের মিষ্টি পানি ও নরম শাঁস শরীরকে ঠান্ডা রাখে। স্কুলশিক্ষিকা তাসলিমা জান্নাত বলেন, প্রাকৃতিক ও সতেজ এই ফল তৃষ্ণা নিবারণের পাশাপাশি শরীরের জন্যও উপকারী।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালশাঁসে প্রচুর জলীয় অংশ ও প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান রয়েছে, যা গ্রীষ্মকালে পানিশূন্যতা দূর করতে সহায়ক। কৃত্রিম পানীয়ের তুলনায় এটি শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে সতেজ রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
শ্রীমঙ্গলের মেডিসিন, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. নাজেম আল কোরেশী রাফাত বলেন, তালের শাঁসে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন সি, এ ও বি-কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, রক্তশূন্যতা কমাতে এবং চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে।
স্থানীয় বিক্রেতাদের আশা, গরমের তীব্রতা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতে তালশাঁসের চাহিদা ও বিক্রি আরও বাড়বে। মৌসুমি এই ফল একদিকে যেমন মানুষের তৃষ্ণা ও ক্লান্তি দূর করছে, অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয়-রোজগারেও যোগ করছে নতুন গতি।
কেকে/এজে