সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী      দীর্ঘ হচ্ছে হামে মৃত্যুর মিছিল      ডুবল ঢাকা ভুগল মানুষ      ব্যাংককের বারে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ২৭ জন      একদিনের সফরে বরিশালের পথে প্রধানমন্ত্রী      রাজধানীতে জলাবদ্ধতা      
জাতীয়
ভয়েসের মূল্যায়ন প্রতিবেদন
ই-বর্জ্যে বিপর্যয়ের মুখে দেশ
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬, ১০:৩৩ পিএম আপডেট: ২৩.০৫.২০২৬ ১০:৪৩ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৩০ লক্ষ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য উৎপাদিত হলেও এর মধ্যে ১০ শতাংশেরও কম আনুষ্ঠানিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বিপুল পরিমাণ বিপজ্জনক বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বছরে প্রায় ২০০ থেকে ২২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুযোগও হাতছাড়া হচ্ছে।

শনিবার (২৩ মে) ঢাকায় ‘ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১’-এর ওপর একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। অ্যাসোসিয়েসন ফর প্রগ্রেসিভ কমিউনিকেশন (এপিসি)’র সহায়তায় বেসরকারি অধিকার-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ভয়েস’ কর্তৃক ঢাকার ‘এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ’ মিলনায়তনে প্রতিবেদন প্রকাশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। 

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ভয়েস-এর প্রোগ্রাম সাপোর্ট অ্যাসিসটেন্ট বন্ধন দাস। তিনি বলেন, ‘‘কাগজে আইনি সদিচ্ছা থাকলেও মাঠপর্যায়ে কোনো প্রয়োগ নেই। উৎপাদকের জবাবদিহিতা ব্যবস্থা প্রায় অকার্যকর এবং যে শ্রমিকরা স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা ছাড়াই তা করছেন। এই প্রতিবেদনটি কেবল একটি নথি নয়, এটি নাগরিক সমাজের জন্য একটি জরুরি সতর্কবার্তা।’’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জরিপে অংশগ্রহণকারী ১৫টি প্রতিষ্ঠানের শতভাগ পরিবেশ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত হলেও, গত অর্থবছরে তাদের কেউই একটিও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য সংগ্রহ করেনি। ৭৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের কোনো টেক-ব্যাক ব্যবস্থা নেই, মাত্র ২২ শতাংশ রেস্ট্রিকশন অব হ্যাজার্ডাস সাবস্ট্যান্সেস (আরওএইচএস) মান যাচাই করে এবং কোনো প্রতিষ্ঠানই বিপজ্জনক বর্জ্যের সঠিক সংরক্ষণ বা রেকর্ড-কিপিং করছে না। প্রতিষ্ঠানটির বলছে, বিপজ্জনক বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এই নিষ্ক্রিয়তার ফলে বছরে ২০০ থেকে ২২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সুযোগ অব্যবহৃতই থেকে যাচ্ছে। 

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী ৬২ মিলিয়ন মেট্রিক টন ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ২২.৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে রিসাইকেল করা হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ ৮২ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্রুত নগরায়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় ৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। বুয়েটের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল নাগাদ এই পরিমাণ ৪.৬২ মিলিয়ন মেট্রিক টনে গিয়ে ঠেকবে। এই বিশাল বর্জ্য ভাণ্ডারের মাত্র ১০ শতাংশের কম বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে রিসাইকেল করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিংয়ের সিংহভাগই নিয়ন্ত্রিত হয় অনানুষ্ঠানিক খাতের মাধ্যমে, যা মূলত ঢাকা, গাজীপুর এবং চট্টগ্রামে কেন্দ্রিক। এই খাতে কর্মীরা কোনো ধরনের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই খোলা অবস্থায় বর্জ্য পোড়ানো এবং অ্যাসিড লিচিংয়ের মতো বিপজ্জনক পদ্ধতিতে কাজ করে। ফলে তারা ক্যানসার, স্নায়বিক ব্যাধি, শ্বাসকষ্ট এবং ডিএনএ ক্ষতির মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন, যেখানে শিশু ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি বিপদে আছেন।

পরিবেশের ওপর এর প্রভাব আরও বিধ্বংসী। গবেষণায় দেখা গেছে, ই-বর্জ্য থেকে নির্গত সীসা মাটির গভীরে ৩০০-৫০০০ মিলিগ্রাম/কেজি পর্যন্ত পৌঁছেছে, যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা থাকা উচিত ১০-৫০ মিলিগ্রাম/কেজি। এছাড়া জলাশয়ে সীসার উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি পাওয়া গেছে। ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতি নিরাপদ সীমার চেয়ে ১০ থেকে ১০০০ গুণ বেশি, যা জলজ প্রাণীর প্রজনন ক্ষমতা ৩০-৬০ শতাংশ কমিয়ে দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু যেমন সোনা, তামা এবং প্যালাডিয়াম পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে প্রতি বছর ২০০ থেকে ২২১ মিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে অগোছালো ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার কারণে এই বিশাল সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বর্জ্য সংগ্রহ করলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে তারা মাত্র ২০-৩০ শতাংশ মূল্যবান উপাদান পুনরুদ্ধার করতে পারে, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তিতে ৭০-৯৫ শতাংশ পুনরুদ্ধার সম্ভব।

এই সংকট উত্তরণে প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে: নিবন্ধন নবায়নের সাথে ডাব্লিউইইই প্ল্যান জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা, ই-বর্জ্য সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ এবং যৌথ নেটওয়ার্ক তৈরি করা, পণ্যের গায়ে লেবেলিং এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো, অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, সুরক্ষা সরঞ্জাম প্রদান এবং তাদের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা এবং ই-বর্জ্যের প্রবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য ডিজিটাল ডাটাবেস এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং সিস্টেম চালু করার সুপারিশ করা হয়। 

ভয়েস-এর নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ এই উদ্যোগের কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, “ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ প্রণয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি ইতিহাস তৈরি করেছিল। কিন্তু শুধুমাত্র আইনগুলো কাগজ-কলমে থাকলেই তা সমাজ কিংবা পরিবেশকে রক্ষা করতে পারে না, এর জন্য প্রয়োজন সঠিক বাস্তবায়ন।” 

ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরেন ভয়েস-এর ডেপুটি ডিরেক্টর (প্রোগ্রামস) মুশাররাত মাহেরা। তিনি বলেন, “ই-বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। যার কারণে শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু, অকালমৃত্যু বাড়ছে। এর ভয়াবহতা কমাতে দ্রুতই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।” 
 
উন্নয়নধারা ট্রাস্টের মো. আমিনুল রাসেল বলেন, “ই-বর্জ্য বিষয়টি প্রথমে ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হলেও, পরবর্তীতে বিভিন্ন দূর্ঘটনার পর নেতিবাচক বিষয়গুলো উঠে আসে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখে গেছে, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন নিয়ম থাকলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে সেগুলো মানা হয় না। তাই, নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করতে ব্যাপক মিডিয়া কভারেজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের মিহির বিশ্বাস দুইটি প্রস্তাবনা উল্লেখ করে বলেন, “প্রথমেই সুনির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলোকে চিহ্নিত করা এবং যে সুপারিশগুলো উঠে এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে সমন্বিত আলোচনা চালিয়ে যাওয়া।”

কেকে/এজে


আরও সংবাদ   বিষয়:  ই-বর্জ্য   ভয়েস  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close