অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অপুষ্টি এবং শিশু পরিচর্যায় অবহেলার কারণে দেশে বিভিন্ন রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ফাস্টফুড ও পোড়া তেলে তৈরি খাবারের অতিরিক্ত গ্রহণ যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তেমনি শিশুদের সঠিক পুষ্টি ও মাতৃদুগ্ধ নিশ্চিত করাও এখন জরুরি হয়ে উঠেছে।
শনিবার (১ আগস্ট) সকালে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিশুর জন্য মাতৃদুগ্ধকে সর্বোত্তম পুষ্টির উৎস উল্লেখ করে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে অনেক শিশু জন্মের পরও মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সিজারিয়ান প্রসবের হার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই নবজাতককে সময়মতো মায়ের দুধ দেয়া হচ্ছে না, যা শিশুর সুস্থ বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’
বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘হামে আক্রান্ত শিশুদের ওয়ার্ডে গিয়ে এমন অনেক শিশুকে দেখেছি যাদের শরীরে অপুষ্টির স্পষ্ট লক্ষণ রয়েছে। তিনি জানান, মায়েদের সঙ্গে কথা বলার সময় অনেকেই জানিয়েছেন, নিজেরাই পর্যাপ্ত খাবার পান না, ফলে সন্তানের পুষ্টির চাহিদাও ঠিকভাবে পূরণ করতে পারেন না।’
দেশকে সুস্থ রাখতে চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষের খাদ্যাভ্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, চিজসমৃদ্ধ পিৎজা, বার্গার এবং পোড়া তেলে তৈরি বিভিন্ন খাবার নিয়মিত খাওয়ার প্রবণতা নানা অসংক্রামক রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। তাই পরিবারে সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবারের চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন।’
নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগে পরিবারে মা ও শিশুর যত্নের যে পরিবেশ ছিল, এখন তা অনেকাংশেই হারিয়ে গেছে। তিনি বলেন, অল্প বয়সে বিয়ে, অল্প বয়সে সন্তান গ্রহণ, মাতৃদুগ্ধ না খাওয়ানো এবং অপুষ্টির কারণে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।’ বিশেষ করে হামের মতো রোগের বিস্তারের পেছনেও এসব কারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কর্মজীবী মায়েদের প্রসঙ্গ টেনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে সন্তানকে সময় না দিয়ে গৃহকর্মীর কাছে রেখে কর্মস্থলে যেতে হয়। আবার কেউ কেউ মেশিনের সাহায্যে বুকের দুধ বের করে ফেলে দেন। এ ধরনের প্রবণতা শিশুর স্বাভাবিক পরিচর্যায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পুরো জাতিকেই বহন করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একসময় সন্তান জন্মের পরপরই নবজাতককে মায়ের বুকের কাছে রাখা হতো, যা মা ও শিশুর মধ্যে মানসিক বন্ধন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত।’ বর্তমানে অনেক হাসপাতালে সেই চর্চা কমে এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে এই পরিবর্তনের সঙ্গে বিভিন্ন জটিল রোগ, যেমন স্তন ক্যানসার, ডিম্বাশয়ের ক্যানসার, জরায়ুর ক্যানসার, ফুসফুসের ক্যানসার, লিভারের রোগ, কিডনি জটিলতা এবং থ্যালাসেমিয়ার মতো সমস্যার বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
অনুষ্ঠানে দাম্পত্য কলহের প্রভাব নিয়েও কথা বলতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘পারিবারিক অশান্তি শিশুদের মানসিক বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। অনেক শিশু মায়ের ডাক শুনে ভয় পেয়ে লুকিয়ে যায়, কেউ কথা বললে চোখ বন্ধ করে রাখে, কেউ অতিরিক্ত মাথা নাড়ে বা বই হাতে দিলে ছিঁড়ে ফেলে। এসব আচরণ শিশুর প্রতি পর্যাপ্ত স্নেহ ও মানসিক যত্নের অভাবের বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।’
কেকে/এলএ