কিশোরগঞ্জে দিন দিন বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে আরও ৪৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৩৪ জন। নতুন করে কোনো মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও এক দিনে বিপুলসংখ্যক রোগী শনাক্ত হওয়ায় জেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় মোট ৯৯১ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৮৭৭ জন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১১৪ জন। এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৪৬ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন। সেই হিসাবে মাত্র দুই দিনে নতুন করে ৯৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ফলে জেলার ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকেও প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। ফলে ডেঙ্গু এখন শুধু শহরকেন্দ্রিক না থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ৩০ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।
এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ৮ জন, বাজিতপুরে ৮ জন, তাড়াইলে ২৯ জন, করিমগঞ্জে ৪ জন, কুলিয়ারচরে ৫ জন, ভৈরবে ৬ জন, পাকুন্দিয়ায় ২ জন, মিঠামইনে ২ জন, নিকলীতে ২ জন, কটিয়াদীতে ১ জন, হোসেনপুরে ৬ জন এবং ইটনায় ৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ জন এবং প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।
হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসাসেবার ওপরও চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে জ্বর ও ডেঙ্গুর উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকায় এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাড়িঘর, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জায়গা, ড্রেন ও বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার না করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ধ্বংস করার পাশাপাশি নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বাড়ি ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন করা প্রয়োজন।
এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ায়। সাধারণত পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে এ মশা বংশবিস্তার করে। তাই ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র, বালতি ও নির্মাণসামগ্রীর পাত্রসহ যেসব স্থানে বৃষ্টির পানি জমতে পারে, সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। পাশাপাশি বাসাবাড়ির ছাদ, বারান্দা, ড্রেন ও আশপাশের জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু প্রশাসন বা পৌরসভার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ব্যক্তি, পরিবার ও সামাজিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, অফিস-আদালতসহ আশপাশের এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।
চিকিৎসকরা জানান, ডেঙ্গুর অন্যতম প্রধান উপসর্গ হঠাৎ জ্বর। এর সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও জয়েন্টে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং অতিরিক্ত দুর্বলতাসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। জ্বর হলে নিজের ইচ্ছায় ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
চলতি বছর কিশোরগঞ্জে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর তথ্য না থাকায় কিছুটা স্বস্তি থাকলেও প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্তের হার বাড়তে থাকায় পরিস্থিতিকে হালকাভাবে না দেখার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও জনসচেতনতা বাড়ানো না গেলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
কেকে/এআই