দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের জনজীবন ও আয়ের ওপর মারাত্মক চাপ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে অবিরত সংগ্রাম করতে হচ্ছে। একদিকে মাছ, মাংস, মুরগি ও ফলের চড়া দাম। অপরদিকে সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো কোনো সবজির দাম কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ৪০ টাকা। এতে ক্রেতাদের মধ্যে হাঁসফাঁস অবস্থা বিরাজ করছে।
ক্রেতারা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেন। তবে বিক্রেতারা বলছেন, সাধারণত বর্ষা মৌসুমে সবজির দামে ঊর্ধ্বগতি থাকে। উৎপাদন ও সরবরাহে প্রভাব পড়ে। এখনো সেই অবস্থা বিরাজ করছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ আরো কয়েকটি বাজার ঘুরে দ্রব্যমূল্যের এমন ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। কারওয়ান বাজারে সরেজমিন দেখা যায়, আগাম সবজি শিম বিক্রি হচ্ছে ২৮০ টাকার ওপরে, যা আগের সপ্তাহে ছিল ২২০ থেকে ২৩০ টাকা। কাঁচামরিচের কেজি ১৫০ টাকা, অথচ গত সপ্তাহে ছিল ১২০ টাকা। গাজর ১৩০ টাকা, গত সপ্তাহে ছিল ১২০ টাকা। লেবুর হালি ৪০ টাকা। আগের সপ্তাহে ছিল ২০ থেকে ৩০ টাকা। এছাড়া অন্যান্য সবজিও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। যেমন—টমেটো ১০০ টাকা, বেগুন ১০০ থেকে ১৩০ টাকা, লাউ ৮০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, ধুন্দল ৭০, করলা ৭০ থেকে ৮০ টাকা। একমাত্র আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং পেঁপে ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পেঁয়াজ ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, দেশি ছোট রসুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ইন্ডিয়ান বড় রসুন ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা হাশেম মাতবর বলেন, “বন্যা ও বৃষ্টির কারণে সবজির বাজারে এমন ঊর্ধ্বগতি দেখা যাচ্ছে। টানা বৃষ্টিপাতের কারণে উৎপাদন ও সরবরাহে প্রভাব পড়েছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে এ অবস্থা চলছে।”
ক্রেতা সালমান বলেন, “আমরা মধ্যবিত্ত মানুষ। সবজির দাম বাড়ায় এখন শুধু আলু ও পেঁপে কিনছি। শরীরে এলার্জি থাকায় বেশি দাম হলেও করলা কিনতে হয়েছে। সবজির দাম বাড়তি থাকায় এদিকে বেশি টাকা খরচ হয়ে গেছে। ফলে অন্য অনেক পণ্য কিনতে পারছি না।”
মাছ, মাংস, মুরগি ও ডিমের বাজার নিয়েও হাঁসফাঁস করছে সাধারণ মানুষ। রুই মাছের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, পাবদা ২৯০ থেকে ৩৫০ টাকা, ইলিশ ৮০০ থেকে ১৮০০ টাকা কেজি, টেংরা মাছ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকায়, খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে ১৩০০-১৪০০ টাকায়। এছাড়া পাকিস্তানি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকায়, দেশি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকায় এবং ব্রয়লার বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়। এ সপ্তাহে বেশি বেড়েছে মুরগির ডিমের দাম। প্রতি ডজন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা।
কয়েকজন বিক্রেতার সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, সরবরাহ না থাকায় মুরগির মাংস ও ডিমের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে লোডশেডিং থাকায় ফার্মের মুরগি পালন কষ্টকর হয়ে গেছে। ফলে উতপাদন কম থাকায় দাম বেড়ে গেছে।
মাছ, মাংস, মুরগি ও ডিমের দাম নিয়ে ক্রেতা ফয়সাল বলেন, আমি মধ্যবিত্ত মানুষ। ছোট চাকরি করি। এ কারণে বেশিরভাগ সময়ে ব্রয়লার মুরগী ও ডিম কিনি। কিন্তু, এক মাস ধরে এ দুই পণ্যের দাম বেড়েছে। অপরদিকে গরু-খাশি বিশেষ পারিবারিক অনুষ্ঠান ছাড়া খাওয়া হয় না। তিনি আরও জানান, বেশিরভাগ মাছের দামই বাড়তি। তারপরও পাবদা ও পুঁটি মাছ কেনা হয়। কারণ, এ মাছগুলো বেশি দিন যায়।
অপরদিকে চাল, ডাল, আটা ও ভোজ্য তেলের দাম কিছুটা সহনীয় রয়েছে। তবে সুগন্ধি আতপ চালের দাম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। মিনিকেট ও পায়জাম চাল ৫৫ থেকে ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৮৮ টাকা। সুগন্ধি আতপ চাল বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকার ওপরে। মশুর ডাল (মোটা) ৯০ টাকা এবং দেশি ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৫৫ টাকায়।
প্যাকেটজাত লাল আটা দুই কেজি ১৭০ টাকা, খোলা আটা ৪৭ টাকা, প্যাকেটজাত আটা ৬০ টাকা, খোলা ময়দা ৬০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভোজ্য তেল (সয়াবিন) ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়, শরিষার তেল ২৬০ থেকে ৩০০ টাকায় এবং রাইস ব্র্যান অয়েল ২১০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সুগন্ধি আতপ চালের বাড়তি দামের বিষয়ে বিক্রেতা মামুন বলেন, মূলত সুগন্ধি আতপ চাল বিদেশে বিক্রি হয়। সরবরাহ কমার কারণে এ পণ্যের দাম বেশি। আগে পাইকারি ২১০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। এখন বিদেশে রপ্তানি কমায় দাম ১৮০ টাকায় নেমেছে। যদিও খুচরা বাজারে বাড়তি দামেই এই চাল বিক্রি হচ্ছে।
ফলের দোকানে দেখা গেছে, আম কেজি প্রতি ২০০ টাকা, তরমুজ (প্রতি কেজি ৫০ টাকা), আপেল ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি, ডালিম কেজি প্রতি ৩৫০ টাকা, মাল্টা প্রতি কেজি ৩৬০ টাকা এবং পাকা পেঁপে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতা রীতু জানান, আমার মা অসুস্থ থাকায় ফল কিনতে এসেছি। কিন্তু দাম বাড়তি থাকায় বেশি কিনতে পারিনি। সরকার পরিবর্তন হলেও পণ্যের দামে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি, উল্টো অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে।
এ বিষয়ে বিক্রেতারা জানান, বিশেরভাগ ফল বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু নানা কারণে বৈদেশিক অবস্থা খারাপ থাকায় এগুলোর দাম বেড়ে যায়। এছাড়া আগের থেকে ভ্যাট ও ট্যাক্স বাড়ানোর কারণেও পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।
কেকে/সাশ