কিশোরগঞ্জে দিন দিন বাড়ছে ডেঙ্গুর সংক্রমণ। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বাড়ছে রোগীর চাপ। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে চিকিৎসা শেষে ৫২ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। তবে এ সময়ে ডেঙ্গুতে নতুন করে কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় মোট ১ হাজার ১৮৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৭২ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে জেলার সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ১১৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ওই দুই প্রতিষ্ঠানে যথাক্রমে ২৯ ও ২৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন।
এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ১৮ জন, বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৮, করিমগঞ্জে ৫, কুলিয়ারচরে ১, তাড়াইলে ৩, পাকুন্দিয়ায় ১, কটিয়াদীতে ৪ এবং হোসেনপুরে ৪ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১১ জন এবং প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।
এদিকে প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় ডেঙ্গু নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে। বর্ষা মৌসুমে বাড়িঘরের আশপাশে জমে থাকা পানি, ড্রেন, পরিত্যক্ত পাত্র ও নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার বংশবিস্তার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।
জেলা শহরসহ বিভিন্ন উপজেলা ও ইউনিয়নের অনেক এলাকায় পানি জমে থাকায় মশার উপদ্রব বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা ও দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে অনেকেই ডেঙ্গুর আশঙ্কায় দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে পরীক্ষা করাচ্ছেন।
জেলা শহরের বাসিন্দা আদিব হাসান বলেন, ‘প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর শুনে আমরা চিন্তিত। বাড়ির আশপাশে যাতে পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে নিজেদের পক্ষ থেকে চেষ্টা করছি। তবে মশা নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর উদ্যোগ দরকার।’
বেসরকারি চাকরিজীবী রাজীব সরকার বলেন, ‘পরিবারের কেউ জ্বরে আক্রান্ত হলেই এখন ডেঙ্গুর কথা মনে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তা হচ্ছে। নিয়মিত মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।’
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সবুজ মিয়ার এক স্বজন বলেন, ‘জ্বর হওয়ার পর পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। এরপর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এখানে আরও অনেক ডেঙ্গু রোগী দেখছি। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভয় তৈরি হচ্ছে।’
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকারি নির্দেশনা ও চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীদের মশারির মধ্যে রাখা, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং স্বজনদের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে হাসপাতাল ও রোগীদের বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং কোথাও পানি জমতে না দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, জ্বর বা শরীর ব্যথা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করানো জরুরি। প্রাথমিক অবস্থায় রোগী হাসপাতালে এলে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। তবে জটিল অবস্থায় হাসপাতালে এলে চিকিৎসা কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ব্যথানাশক বা ওষুধ সেবন না করার পরামর্শ দেন তিনি।
ডা. সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য সবাইকে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পাশাপাশি বিশ্রাম ও ঘুমের সময় মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেন তিনি।
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, “ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে সচেতন হতে হবে।” বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
কেকে/সাশ