বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যখন সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও ধর্মীয় বিভেদের খবর সামনে আসে, তখন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও জুড়ী উপজেলার দুটি জনপদ তুলে ধরছে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের ভিন্ন এক চিত্র। শ্রীমঙ্গলের ভৈরবগঞ্জ বাজারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ভৈরব মন্দির ও মাজদিহি জামে মসজিদ।
অন্যদিকে, জুড়ী উপজেলার ভূঁয়াই বাজারে পাশাপাশি অবস্থান করছে ভূঁয়াই বাজার জামে মসজিদ ও ভূঁয়াই বাজার সর্বজনীন দুর্গা মন্দির। দীর্ঘদিন ধরে এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিজ নিজ ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করে আসছেন মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সহনশীলতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভৈরবগঞ্জ বাজারে প্রায় ২০ গজ দূরত্বে অবস্থিত ভৈরব মন্দির ও মাজদিহি জামে মসজিদ। মসজিদের মিনার ও মন্দিরের চূড়া পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যেন ধর্মীয় সহাবস্থান ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা দিচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২০০ বছর আগে পুণ্যদত্তের পরিবার এখানে ভৈরব মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৪৭ সালের দিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও মাজদিহি চা-বাগান কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে নির্মিত হয় মাজদিহি জামে মসজিদ। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে পাশাপাশি অবস্থান করছে দুই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের এই সহাবস্থানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মসজিদে আজান ও নামাজের সময় মন্দিরের বাদ্যযন্ত্রের শব্দ নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়।
অন্যদিকে, পূজা ও কীর্তনের সময়ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বজায় থাকে। নামাজ শেষে মসজিদের ইমাম ও মন্দিরের পুরোহিতের মধ্যে কুশল বিনিময়ও এখানকার পরিচিত দৃশ্য।
ভৈরবগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী রেজাউল করিম বলেন, মন্দিরে পূজা-অর্চনা ও কীর্তন এবং মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায়—সবই চলছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ একে অপরের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। নামাজের সময় মন্দিরের বাদ্যযন্ত্রের শব্দ নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো পারস্পরিক সমঝোতাও রয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে একে অপরকে আমন্ত্রণ জানানোর মধ্য দিয়ে সুসম্পর্ক আরও দৃঢ় হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গলের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থান প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ভৈরবগঞ্জে পাশাপাশি অবস্থিত মসজিদ ও মন্দির কেবল দুটি উপাসনালয় নয়; এগুলো সম্প্রীতি, সহাবস্থান ও মানবিকতার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
তিনি বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও সহযোগিতার মানসিকতা প্রয়োজন। প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো সবার সামাজিক দায়িত্ব। সাম্প্রদায়িক বিভেদ দূর করে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মাধ্যমেই শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন সম্ভব। শ্রীমঙ্গলের এই চিত্র সেই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।
শুধু শ্রীমঙ্গল নয়, জুড়ী উপজেলার ভূঁয়াই বাজারেও দেখা যায় ধর্মীয় সহাবস্থানের এমন দৃশ্য। সেখানে পাশাপাশি রয়েছে ভূঁয়াই বাজার জামে মসজিদ ও ভূঁয়াই বাজার সর্বজনীন দুর্গা মন্দির।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এলাকার মানুষের উদ্যোগে ১৯৭৩ সালে একই আঙিনায় এই দুই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন।
স্থানীয়রা জানান, পূজা-পার্বণসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা রয়েছে। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও সামাজিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গায় তাঁরা একে অপরের পাশে থাকেন। কেউ কারও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অযাচিত হস্তক্ষেপ করেন না; বরং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সবাই সচেষ্ট থাকেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যে, ভৈরবগঞ্জ ও ভূঁয়াই বাজারের পাশাপাশি মসজিদ-মন্দির শুধু দুটি জনপদের সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মানবিকতার বার্তাও ছড়িয়ে দিচ্ছে। আজানের ধ্বনি, পূজার ঘণ্টা ও কীর্তনের সুরের মধ্য দিয়ে এখানে ধর্মীয় ভিন্নতা সত্ত্বেও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের চর্চা অব্যাহত রয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই অসাম্প্রদায়িক বন্ধন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাত ধরে আরও দৃঢ় হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার এই দৃষ্টান্ত দেশের অন্যান্য এলাকাতেও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রেরণা জোগাবে।
জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাজী মাসুম রেজা বলেন, ‘মৌলভীবাজার জেলার ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের অন্যতম দৃষ্টান্ত ভূঁয়াই বাজার। এখানে দুর্গামণ্ডপের পাশেই মসজিদ রয়েছে। একদিকে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করছেন, অন্যদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজার্চনা করছেন। একই স্থানে পাশাপাশি দুই ধর্মের মানুষের ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হওয়া পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্বের সুন্দর উদাহরণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই সম্প্রীতি ধরে রাখতে হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে হবে। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও মানুষ হিসেবে সবার মধ্যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার বন্ধন অটুট রাখা জরুরি। কোনো ধরনের বিভেদ বা বিদ্বেষ নয়, বরং ঐক্য ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।’
কেকে/এমএ