প্রতিবন্ধকতা কোনোদিন অদম্য ইচ্ছাশক্তির সামনে দেয়াল তুলে দাঁড়াতে পারে না—এ কথাটিকেই যেন নতুন করে প্রমাণ করে দেখালেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার বাসিন্দা আরাফাতুল ইসলাম। দৃষ্টির সীমানা যেখানে সীমিত, সেখানে মনের অসীম জোর আর ক্রিকেট বলের শব্দের তালে ভর করে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে চলেছেন এই তরুণ অলরাউন্ডার।
দেশের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন ব্লাইন্ড ক্রিকেট এশিয়া কাপে বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন তিনি। আগামী ১৪-২০ নভেম্বর ঢাকার বসুন্ধরা স্পোর্টস গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এশিয়ার মর্যাদাপূর্ণ এই টুর্নামেন্টে অলরাউন্ডার হিসেবে মাঠে নামবেন ফটিকছড়ির জাফতনগর ইউনিয়নের এই কৃতী সন্তান।
মাঠের ক্রিকেটে অলরাউন্ড নৈপুণ্যের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায়ও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আরাফাত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করে সম্প্রতি স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পরীক্ষাও শেষ করেছেন তিনি। খেলার কঠোর অনুশীলন আর উচ্চশিক্ষার পাঠ—দুটোই সমান তালে সামলেছেন এই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ক্রিকেটার।
আরাফাতের এই অদম্য যাত্রায় গর্বিত তার শিক্ষকরাও। চবির ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ফারহানা আজিজ বলেন, “আরাফাত কেবল মাঠের পারফর্মার নন, ক্লাসের পড়াশোনাতেও অত্যন্ত মনোযোগী ছিলেন। কোনো প্রতিবন্ধকতাই তার স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলো ছড়ানো আমাদের পুরো বিভাগ তথা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।”
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আরাফাতুল ইসলামের এটি প্রথম অভিজ্ঞতা নয়। এর আগেও নিজের অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের মাধ্যমে দেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছেন তিনি। ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত ব্লাইন্ড ক্রিকেট টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়া বাংলাদেশ জাতীয় দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন আরাফাত। এরপর ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে অনুষ্ঠিত ‘আইবিএসএ ওয়ার্ল্ড গেমস’-এ ব্রোঞ্জ পদকজয়ী বাংলাদেশ দলের হয়েও মাঠে অলরাউন্ড নৈপুণ্য দেখান তিনি।
আসন্ন এশিয়া কাপ নিয়ে নিজের প্রস্তুতি ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে আরাফাতুল ইসলাম বলেন, “দেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলা যেকোনো খেলোয়াড়ের জন্যই স্পেশাল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও আইবিএসএ ওয়ার্ল্ড গেমসের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবার দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে অলরাউন্ডার হিসেবে নিজের সর্বস্ব দেব। দেশবাসীর ভালোবাসা ও দোয়া চাই, যেন দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারি।”
ছেলের এই অর্জনে উচ্ছ্বসিত ও আপ্লুত আরাফাতের পরিবার। তার বাবা মাওলানা নজরুল ইসলাম আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “ছেলের এই অর্জনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে সে আজ দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার সুযোগ পেয়েছে, এটি আমাদের পরিবারের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। আমি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমার ছেলেকে সুস্থ রাখেন, নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দেশের জন্য খেলার তৌফিক দান করেন এবং আসন্ন এশিয়া কাপে বাংলাদেশ দলের সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে দেশের মুখ উজ্জ্বল করার সুযোগ দেন। আমি চাই, তার এই অর্জন অন্যান্য অদম্য খেলোয়াড়দেরও স্বপ্ন দেখতে এবং নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে অনুপ্রাণিত করুক।”
চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া অফিসার আবদুল বারী বলেন, “আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরাফাতের ধারাবাহিক এই পারফরম্যান্স এ অঞ্চলের খেলাধুলায় নতুন গতি আনবে। আরাফাত প্রমাণ করেছেন শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনো সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ করতে পারে না। তাঁর এই সাফল্য চট্টগ্রামের তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলায় আরও বেশি আগ্রহী করে তুলবে এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ক্রীড়াবিদদের নতুন স্বপ্ন দেখাবে।”
ঘরের মাঠে এশিয়া কাপে অলরাউন্ড নৈপুণ্য দেখিয়ে বাংলাদেশ দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেবেন আরাফাতুল ইসলাম—এমনটাই প্রত্যাশা তার পরিবার, সহপাঠী, শিক্ষক ও কোটি দেশবাসীর।
কেকে/এমএ