লাখ টাকা বেতনের চাকুরি, বিলাস বহুল শহুরে জীবন ছেড়ে মাটি ও প্রকৃতির টানে কেঁচো সার উৎপাদনে ব্যস্ত সময় পার করছেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার বাড়েরা ইউনিয়নের লোনাকান্দা গ্রামের আবু আমীন।
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৪ সালে বিবিএ ও ২০০৬ সালে এমবিএ সম্পন্ন করে চাকুরী করেছেন দেশের নামকরা একাধিক টেলিকম কোম্পানীতে। বেতনও পেতেন লক্ষাধিক টাকা। কিন্তু এই পেশায় তার মন বসেনি। গ্রাম, গ্রামের মাটি ও মানুষের টানে তিনি চাকুরী ছেড়ে চলে আসেন এলাকায়।
বিভিন্ন রাসায়নিক সারের ব্যবহার কৃত উৎপাদিত ফসল মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য যেমন ক্ষতিকারক তেমনি প্রকৃতির জন্যেও ক্ষতিকারক। এই ক্ষতি থেকে মানুষ এবং প্রকৃতি রক্ষায় তিনি শুরু করেন কেঁচো সার উৎপাদনের। ২০২৩ সালের শেষের দিকে মাত্র ৫ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে তিনি প্রথম কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন। প্রথমে স্বল্প পরিসরে শুরু হলেও বর্তমানে তিনি প্রতি মাসে প্রায় ৩ মেট্রিক টন সার উৎপাদন করছেন। যা থেকে প্রতিমাসে তার আয় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা।
তার উৎপাদিত কেঁচো সার বর্তমানে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনীসহ দেশের প্রায় ১০ থেকে ১২টি জেলায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি সরাসরি বিক্রির পাশাপাশি অনলাইনেও এই সার বিক্রি করছেন। তবে এই পথচলার শুরুটা খুব একটা সহজ ছিল না।
আবু আমীন জানান, “শুরুতে এ কাজটাকে প্রতিবেশীরা ভাল চোখে দেখতো না। অনেকে টিটকারি করতো। একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে চাকরী-বাকরী না করে সারাদিন কেঁচো ও গোবর নিয়ে কাজ করাকে অনেকেই পাগলামি বলতো। কিন্তু এখন এটাতে লাভবান ও সফল হওয়ার সম্ভাবনা দেখে মানুষের ধারণা পরিবর্তন হচ্ছে। দেশের বেকার যুবকরা চাকুরির পেছনে ছোটাছুটি না করে যদি নিজেরা কিছু করার চেষ্টা করে তাহলে তারা একসময় নিজেরাই ভালো কিছু করতে পারবে। আমার কাছ থেকে অনেকেই জৈব সার উৎপাদন করার জন্য পরামর্শ নিচ্ছে। এ কেঁচো সার প্রকৃতির জন্য যেমন ক্ষতিকর নয় তেমনি ফসল উৎপাদনেও রাসায়নিক সারের চাইতে কয়কগুন বেশি উপকারী।”
সার কিনতে আসা কাউসার মিয়া বলেন, “অন্যান্য রাসায়নিক সারের চাইতে এটি অনেক বেশি কাজ করে। ফলন অনেক ভালো হয়। আমি প্রতিনিয়ত এখান থেকে সার নিয়ে থাকি।”
আরেক ক্রেতা রিয়াজুল ইসলাম জানান, “প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদন হয় বিধায় এটি প্রকৃতি ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। তাই এটির ব্যবহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি আগে কয়েকবার নিয়েছি। আজকে আবার ২০ কেজি নেওয়ার জন্য এসেছি।”
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, “আবু আমিন আমাদের এলাকার ছেলে, শুরুতে তার সার উৎপাদনের বিষয়টিকে আমরা ভিন্নভাবে দেখলেও এখন আমরা বুঝতে পারছি প্রকৃতির জন্য কতটা প্রয়োজন এই সারের। বিভিন্ন রাসায়নিক সারের বদলে প্রাকৃতিকভাবে আমাদের এলাকার ছেলের দ্বারা উৎপাদিত সারের জন্য এখন আমরাসহ দেশের মানুষ উপকৃত হচ্ছি।”
বাড়েরা গ্রামের মিজানুর রহমান বলেন, “আবু আমিন ভাই আমার কাছের আত্মীয়। লাখ টাকার চাকুরি ছেড়ে উনি এই ব্যবসা করার শুরুতে আমরা এটাকে ভালোভাবে নেইনি। এক সময় আমরা এটাকে সময়ের অপচয় হিসেবে জানলেও বর্তমানে ভাইয়ের সফলতায় আমাদের ভুল ভেঙেছে। উনি যেভাবে কর্পোরেট চাকুরি ছেড়ে স্বাধীন একটি পেশা শুরু করেছেন তা এলাকার বেকার যুবকদের জন্য অনুকরণীয়।”
বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে যুবকদের কেঁচো সার উৎপাদনের মতো উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন আবু আমীন। তিনি বলেন, শিক্ষা জীবন শেষ করে চাকরির জন্য পেরেশানি না হয়ে উদ্যোক্তা হয়ে স্বাধীনভাবে কিছু করাই তার পছন্দ।
এদিকে, কেঁচো সার উৎপাদনের পাশাপাশি আবু আমীন বস্তায় আঁদা চাষ, দেশি মুরগি ও কোয়েল পাখি পালন করছেন। এসব থেকেও তিনি প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য আয় করছেন।
কেকে/ আরআই