বোয়ালমারীর দুষ্প্রাপ্য ও স্বর্গীয় পারিজাত ফুল গাছ ইতিহাসের সাক্ষী
সনৎ চক্র বর্ত্তী, ফরিদপুর
প্রকাশ: শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৪:২৯ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার খরসুতি চন্দ্র কিশোর স্কুলের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী পারিজাত গাছটি যেন ইতিহাসের সাক্ষী। সবুজ পাতার আড়ালে লাল রঙের ফুল গাছের ডালপালার সঙ্গে মিশে এক অদ্ভুত রহস্যময় দৃশ্য তৈরি করছে। ছায়া, মৌমাছি আর গুচ্ছবদ্ধ রক্তরঙা ফুল—মিলিয়ে এই গাছ যেন স্বর্গের এক নীরব কাব্য, যা শুধু চোখের নয়, মনকেও বিমোহিত করে।
গাছটির ইংরেজি নাম ব্রাউনিয়া ককসিনিয়া এবং এটি সিজালপিনিয়াসি জাতের অন্তর্গত। পারিজাত এ ফুল দেখতে খুবই আকর্ষণীয়। কিন্তু, সবুজ পাতার ভেতর টকটকে লাল ফুল সবসময় বাইরে থেকে দেখা যায় না। ডালগুলো মাটির দিকে ঝুলে থাকে। এই কারণে ফুলটি খুঁজে পাওয়ার জন্য গাছের কাছে যেতে হয়।
ভারতীয় পুরাণে নানারকম কাহিনি প্রচলিত আছে পারিজাত নিয়ে। দেবরাজ ইন্দ্রের নন্দনকাননে ছিল পারিজাত ফুলের গাছ। সে ফুল আপন রূপে-গন্ধেমাতিয়ে রাখত স্বর্গের দেবদেবীদের। ইন্দ্রপত্নী শচীদেবী প্রতিদিন খোঁপায় পরতেন সুগন্ধী পারিজাত। দেবর্ষি নারদ একদিন পারিজাত ফুল উপহার দেন শ্রীকৃষ্ণকে। কৃষ্ণ সেটি পরিয়ে দেন তাঁর পাশে বসে থাকা প্রথমা পত্নী রুক্মিণীর খোঁপায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দ্বিতীয়া পত্নী সত্যভামা বায়না করেন তাকেও এনে দিতে হবে ওই একই ফুল। অভিমানীর মান ভাঙাতে কৃষ্ণ তখন লুকিয়ে নন্দন কানন থেকে পারিজাত বৃক্ষের ডাল ভেঙে এনে রোপণ করেন সত্যভামার বাগানে।
ছবি প্রতিনিধি
জানা যায়, পারিজাত ফুলের গাছ প্রায় ৭-১০ মিটার করে উচ্চতায় অনেকখানি এলাকা জুড়ে ছাতার মত ছড়িয়ে আছে চির সবুজ এ গাছ। ঘন পাতার আচ্ছাদনে গাছের নীচে সূর্যের আলো আর তাপ পৌঁছনোর উপায় নেই। কান্ড আর ডালপালা অশোকের মত। সবুজ পাতা তৈরি হওয়াটা অনেক মনোরম আর বৈচিত্রের। কলার মোচার মত হরিণ রঙের কচি পল্লব অনেক আকর্ষণীয়। পথ পরিক্রমায় পল্লবের এক একটি মোচা রকমারী রঙ ছড়িয়ে শত শত পাতায় পরিণত হয়। আর ফুল? রক্ত রাঙা এক একটা ফুলের মধ্যে প্রায় শতটি ছোট ছোট ফুলের সমাহার। ফুলে গন্ধ নেই। তবে আছে পরাগ রেণু আর অনেক মধু।
পারিজাতের এক একটি ফুলে অসংখ্য মৌমাছির সমাবেশ। পারিজাত গাছ জুড়ে হাজারো ফুলে মৌমাছির দল সারাদিন ব্যস্ত মধু আহরণে। ছায়া, ফুল আর মৌমাছি- এ এলাকাকে স্বর্গীয় করে তুলেছে। তাই হয়তো পারিজাতকে বলা হয় স্বর্গীয় ফুল!
পারিজাত ফুলটির সঠিক পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ বলছেন পারিজাত, কেউ বলছেন মধুফুল, কেউ পাখিফুল। ফলত, পুষ্পপ্রেমীরা কিছুটা বিপাকেই পড়েছেন। তবে, স্থানভেদে একটি গাছের একাধিক স্থানীয় নাম থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
পারিজাত ফুল নিয়ে বহু কবি সাহিত্যিকের লেখা আছে, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম পারিজাত বৃক্ষ নিয়ে গান বেঁধেছেন-
‘পরো কুন্তলে, ধরো অঞ্চলে/ অমলিন প্রেম-পারিজাত।’
তার লিখিত চিঠিপত্র থেকেও উদ্ধৃত করা যায়। নজরুল ও নার্গিসের বিবাহবিচ্ছেদের ১৫ বছর পর নার্গিস নজরুলকে একটি চিঠি দেন। এর উত্তরে নজরুল তাকে একটি চিঠি লেখেন। সেখানেও পারিজাতের প্রসঙ্গ আছে-
বোয়ালমারী উপজেলার কৃষি অফিসার আলভীর রহমান বলেন, ‘পারিজাত ফুল একটি দুষ্প্রাপ্য। ফুলগুলো গুচ্ছবদ্ধভাবে ফুটে। বছরের বিভিন্ন সময়ে কমবেশি পারিজাত ফুল ফুটতে দেখা যায়। তবে একসঙ্গে ৩০-৪০টি ফুলের ঠাসবুনটে ভারি সুন্দর দেখায়।