রাজধানীর নিউমার্কেট কিংবা গুলিস্তান হকার্স মার্কেটের সামনে সড়কের পাশ দিয়ে হেটে গেলে যেমন শোনা যায় ‘দেইখ্যা লন ১০০, বাইচ্চা লন ১০০’, ‘যেইডা লন ১০০’ তেমনি দেখা গেছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার ৩০ তম আসরের মেলা অভ্যন্তরের চিত্র। হতাশ দর্শনার্থীরা হাঁকডাকে বিব্রত জানিয়েছেন ক্ষোভও।
ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ঘুরে ১৩ জানুয়ারি বিকালের সার্বিক পরিবেশে দেখা যায়, আবহাওয়া ভালো থাকায় লোকসমাগম যেন কিছুটা বেশি। বিক্রিও বেড়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মেলার অভ্যন্তরীণ ‘ফুটপাত পণ্যে’ র হাঁকডাকে বিব্রত প্রকাশ করেছেন রুচিশীল ক্রেতা ও দর্শনার্থীরা। তাদের দাবি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার পরিবেশ অনেকটা রাজধানীর ফুটপাতের হকারদের মতো। যা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষূন্ন করে।
এবারের ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার পূর্ব, উত্তর, দক্ষিণে বেশ কয়েকটি স্টলের ডাক হাঁক আর দর্শনার্থীদের হাত ধরে টেনে নেয়ার ঘটনায় অতীষ্ঠ মেলায় আগত লোকজন। এমন হাঁকডাক ও অশালীন ব্যবহারের শিকার হচ্ছেন বেশিরভাগ নারীরা। হঠাৎ মনে হবে মেলায় নিউ মার্কেট, গুলিস্থান, মতিঝিল অথবা ফার্মগেটের কোনো ফুটপাতে পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা।
কথা হয় মেলায় ঘুরতে আসা সাব-এডিটর কাউন্সিল সদস্য কবি আলম হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘ মেয়াদি বাণিজ্য মেলা এভাবে ‘ফুটপাত পণ্যের’ মেলায় রূপ নেয়া দুঃখজনক। আর এভাবে গায়ে হাত দিয়ে ক্রেতা কাছে টানতে বিক্রয়কর্মীদের অশালীন আচরণ মেলার কাঙ্ক্ষিত বিক্রি ও প্রদর্শনীতে ভাটার কারণ হবে।
মেলার পরিচালক ও ইপিবি সচীব তরফদার সোহেল রহমান বলেন, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য মেলায় পণ্য আসছে এমনটি ধরে নিয়ে তা ইচিবাচকভাবে দেখা হচ্ছে। তবে মেলায় আন্তর্জাতিক মানের পণ্য রাখাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
ইপিবি’র উপসচিব আরও বলেন, মেলায় ফুটপাতে বিক্রি হওয়া পণ্য আসছে, ঠিক আছে। কিন্তু মান ভালো থাকলে মানুষ কেনে। ক্রেতারও চাহিদা থাকে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কেনার মতো জিনিস এখানে আসে। তবে আমরা উৎসাহিত করবো আমাদের ভালো পণ্য, যেগুলো বিদেশে প্রতিযোগীতা করতে পারবে, সেগুলো যাতে বেশি আসে।
বাণিজ্য মেলার ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক মানের পণ্যসামগ্রী প্রদর্শন করবেন- এমন লক্ষ্য নিয়েই রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ১৯৯৫ সালে বসে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। মাসব্যাপী এ মেলায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান, ইরান, জাপান, চিন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানিসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও দেশের প্রতিষ্ঠানের নামে মেলায় পণ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। কিন্তু স্থায়ী প্যাভিলিয়নের দাবীর মুখে পূর্বাচলে বাংলাদেশ চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিভিশন সেন্টার গড়ে তোলা হয়। সেখানেই গত ৫ বছর ধরে খোলামেলা পরিবেশে মেলার আসর জমে আসছে।
যেখানে দেশি-বিদেশি পণ্যসামগ্রী প্রদর্শন, রফতানি বাজার অনুসন্ধান এবং দেশি-বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এ মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শিল্পপণ্য ও ভোগ্যপণ্য উত্পাদনকারীরা একদিকে তাদের উত্পাদিত পণ্যের গুণগত মান, ডিজাইন, প্যাকেজিং ইত্যাদি প্রদর্শন ও বিপণন করতে পারবেন, অন্যদিকে পারস্পরিক সংযোগ স্থাপনসহ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারের সুযোগ লাভ করবেন, এটা ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। তবে মানহীন পন্য বিষয়গুলো ঢালাও বলা যাবে না। স্টল যারা বরাদ্দ নেন তাদের অনেকে সাব ভাড়ায় ভিন্ন কোন প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেয়ার ফলে এমন সংকট তৈরী হয়।
রিয়াজ উদ্দিন নামের নিউ মার্কেটের হকার ব্যবসায়ী বলেন, মেলা শুরুর ৯ দিন পর স্টল দিয়েছি। ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ এবার বিক্রি নেই। মানুষ দেখে বেশি কিনে কম।
অভিযোগ রয়েছে, বিদেশিদের নামে যে স্টল রয়েছে সেখানেও বিক্রি হচ্ছে নিম্ন মানের দেশি পণ্য।
মুশুরীর বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান নয়ন বলেন, এ মেলা দেশি-বিদেশি পণ্যসামগ্রী প্রদর্শন, রফতানি বাজার অনুসন্ধান এবং দেশি-বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে আমার ধারণা ছিল- মেলায় আন্তর্জাতিক মানের পণ্য থাকবে। কিন্তু মেলায় এসে হতবাক হয়েছি। এখানকার বেশিরভাগ পণ্য মনে হচ্ছে গুলিস্তান-চকবাজারের পণ্য। একটি আন্তর্জাতিক মেলায় এভাবে নিম্ন মানের পণ্য আসলে মেলার মান ও আকর্ষণ নষ্ট হয়ে যায়। কর্তৃপক্ষের উচিত এদিকে নজর দেয়া।
কেকে/ এমএস