প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যাংকিং খাতকে আরও দক্ষ, নিরাপদ ও গ্রাহককেন্দ্রিক করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে- এমন মতামত ব্যক্ত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টে (বিআইবিএম) জাতীয় প্রশিক্ষণ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তারা এসব কথা বলেন।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং, ফিনটেক উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডাটা অ্যানালিটিক্স ও সাইবার নিরাপত্তা প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে ব্যাংকগুলো আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ করছে। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যাংক কর্মকর্তারা কোর ব্যাংকিং সিস্টেম, ডিজিটাল পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম, মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ব্লকচেইন অ্যাপ্লিকেশন ও রেগুলেটরি টেকনোলজি বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা অর্জন করছেন।
তারা আরও বলেন,
এই ধরনের প্রশিক্ষণ একদিকে যেমন কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে পরিবর্তনশীল নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি, সিমুলেশনভিত্তিক শিক্ষা, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম ও ডাটা-নির্ভর কেস স্টাডি প্রশিক্ষণকে আরও সহজলভ্য, নমনীয় ও কার্যকর করে তুলছে।
জাতীয় প্রশিক্ষণ দিবস ২০২৬ বিআইবিএম ক্যাম্পাসে যথাযথ মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়। জাতীয় উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির গুরুত্ব তুলে ধরতেই এই আয়োজন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে একটি শোভাযাত্রার মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয় এবং পরে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন সরকারের সিনিয়র সচিব ও ন্যাশনাল একাডেমি ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এনএপিডি) মহাপরিচালক সিদ্দিক জোবায়ের; এনসিসি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. শামসুল আরেফিন এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওমর ফারুক খান।
অতিথিরা ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সুশাসন, নেতৃত্ব ও পেশাদারিত্ব জোরদারে বিআইবিএমের মতো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার। তিনি প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নে দক্ষ মানবসম্পদের অপরিহার্য ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
জায়েদি সাত্তার বলেন, ‘আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও প্রণোদনা ব্যাংকিং খাতে কার্যকর প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাসেল ওওও, আইএফআরএস, অ্যান্টি-মানি লন্ডারিংসহ (এএমএল) আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য ব্যাংক কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক সক্ষমতা বৃদ্ধি অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নিশ্চিত করে নিয়ন্ত্রণের সামঞ্জস্য, ঝুঁকি মোকাবিলা সক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মান। একই সঙ্গে, প্রণোদনা যেমন ক্যারিয়ার উন্নয়ন, কর্মদক্ষতা স্বীকৃতি ও দক্ষতা-ভিত্তিক প্রণোদনা কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আজীবন শেখার প্রতি উদ্দীপনা জাগায়। নিয়মনীতি মেনে চলা ও প্রণোদনা-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ একত্রে ব্যাংকগুলিকে একটি দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী ও ভবিষ্যত-সক্ষম কর্মীশক্তি গঠনে সহায়ক হয়।
সভাপতির বক্তব্যে বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও নীতিগত সহায়তায় উৎকর্ষ সাধনে বিআইবিএমের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, ‘ব্যাংকিং একটি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত খাত হওয়ায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং বিধিমালা, সার্কুলার, কার্যক্রম এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।’
এজাজুল ইসলাম উদাহরণ হিসেবে ২০২৭ সাল থেকে কার্যকরব্যাপী প্রত্যাশিত ঋণ ক্ষতি নিরূপণ ও ঋণ ক্ষতি সংরক্ষণে আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়ন এবং গত ১ জানুয়ারি থেকে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালুর বিষয়টি উল্লেখ করেন। এসব পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যাংকারদের দক্ষতা ও অভিযোজনক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ অপরিহার্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিআইবিএমের অধ্যাপক ও প্রশিক্ষণ পরিচালক ড. মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য দেন। তিনি আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতের পরিবর্তনশীল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ধারাবাহিক শিক্ষা, পেশাগত প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় মানবসম্পদ উন্নয়নে বিআইবিএমের দীর্ঘদিনের অবদানের কথা উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে অধ্যাপক ড. প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জি উপস্থাপিত ‘বিআইবিএম: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক প্রেজেন্টেশনে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রাপথ, অর্জন এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে একটি শীর্ষস্থানীয় প্রশিক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়।
কেকে/এমএ