প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংস্কারক খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ
খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ ছিলেন তৎকালীন বাংলার একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সমাজসেবক, সাহিত্যিক ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তি। সরকারি চাকরিজীবনে তিনি শিক্ষা বিভাগের বিভিন্ন পদে থেকে মুসলিম শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে, মাদ্রাসা, কলেজ ও হোস্টেল প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। শিক্ষার পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। ইসলাম ও মুসলিম ইতিহাসের ওপর বহু প্রভাবশালী গ্রন্থ রচনা করেন এবং মুসলিম সমাজে জ্ঞান ও চেতনার সঞ্চার করেন। অবসর জীবনে প্রতিষ্ঠা করেন আহ্ছানিয়া মিশন, যা আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কল্যাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। সততা, নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞার জন্য তিনি বহু সম্মান লাভ করেন, যার মধ্যে ‘খানবাহাদুর’ উপাধি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্যপদ এবং বাংলা একাডেমির গুণিতক ফেলোশিপ উল্লেখযোগ্য। তার জীবন শিক্ষার প্রসার, সমাজসেবা ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য সমন্বয়। তাকে নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন খোলা কাগজের প্রধান প্রতিবেদক আলতাফ হোসেন।
খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ
খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ ছিলেন বাংলা মুসলিম সমাজের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষার অগ্রদূত। তিনি সেই সময়ে বাংলার মুসলিম সমাজে শিক্ষার ঘাটতি পূরণ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংস্কৃতিগত জাগরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার জীবন ও কর্ম ছিল শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক উন্নয়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
আহ্ছানউল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন একটি প্রভাবশালী মুসলিম পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ স্পষ্ট ছিল। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি কলকাতায় উচ্চশিক্ষার জন্য যান। কলকাতায় অধ্যয়নকালে তিনি প্রাচীন ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয় এবং মুসলিম সমাজের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন হন। এ অভিজ্ঞতা তার শিক্ষানীতি ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মূল ভিত্তি গড়ে তোলে।
আহ্ছানউল্লাহর সবচেয়ে বড় অবদান হলো শিক্ষাক্ষেত্রে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, মুসলিম সমাজের উন্নতির জন্য শিক্ষার প্রসার অপরিহার্য। তার নেতৃত্বে কলকাতা ও ঢাকায় মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও সম্প্রসারণ করা হয়। ‘আহ্ছানউল্লাহ কলেজ’ তার অন্যতম সৃষ্টির মধ্যে অন্যতম, যা আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধ সংযুক্ত করার একটি প্রয়াস ছিল। তিনি শুধু শিক্ষার অবকাঠামো গড়ে তোলেন না, শিক্ষার মান ও পাঠ্যক্রমেও গুরুত্ব দেন। তার মতে, সমাজকে সমৃদ্ধ করতে হলে শিক্ষাকে শুধু জ্ঞানার্জনের মাধ্যম নয়, বরং নৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার ক্ষেত্র হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে।
নারী শিক্ষার প্রসারেও আহ্ছানউল্লাহ বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই সময়ে মুসলিম নারীদের শিক্ষার সীমিত সুযোগ ছিল, যা সমাজের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করত। আহ্ছানউল্লাহ নারী শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে বোঝাতেন যে, শিক্ষিত নারীই একটি সমাজের সঠিক বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে। তার প্রচেষ্টায় অনেক নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নারী শিক্ষার প্রসার হয়।
শিক্ষা ছাড়াও আহ্ছানউল্লাহর সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। তিনি মুসলিম সমাজে কুসংস্কার, দারিদ্র্য ও অব্যবস্থাপনা দূরীকরণের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য শিক্ষামূলক ও সামাজিক প্রকল্প চালু করেছিলেন। পাশাপাশি তিনি রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধিতেও আগ্রহী ছিলেন। মুসলিম সমাজকে শিক্ষা ও রাজনৈতিক সচেতনতার মাধ্যমে শক্তিশালী করার জন্য তিনি বিভিন্ন সভা, আলোচনা ও সামাজিক উদ্যোগে অংশগ্রহণ করতেন।
আহ্ছানউল্লাহর কর্মজীবন প্রমাণ করে যে, ব্যক্তির প্রচেষ্টা কতটা বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তন আনতে পারে। তার জীবন ও অবদান শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয়, সমাজ সংস্কার ও মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রেও প্রেরণার উৎস। বাংলার মুসলিম সমাজের শিক্ষার অগ্রযাত্রা এবং সামাজিক সচেতনতার প্রসার তার নেতৃত্বের ফল।
সংক্ষেপে, খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় যে, শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা ছাড়া কোনো জাতি সত্যিকারের উন্নতি করতে পারে না। তিনি ছিলেন একজন অদম্য পথপ্রদর্শক, যিনি সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশকে শিক্ষার মাধ্যমে শক্তিশালী ও সচেতন করার জন্য অক্লান্তভাবে কাজ করেছেন। তার শিক্ষা, নারী শিক্ষার প্রসার, সামাজিক সংস্কার এবং সমাজ সচেতনতার ক্ষেত্রের অবদান আজও শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজ সংস্কারের জন্য প্রেরণার উৎস।
জন্ম ও পরিবারিক জীবন :
১৮৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে তদানীন্তন খুলনা জেলার অন্তর্গত সাতক্ষীরার নলতা শরীফে খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহর জন্ম হয়। তার পিতা মুন্সী মোহাম্মদ মুফিজ উদ্দীন ছিলেন একজন ধার্মিক, সম্পদশালী ও দানশীল ব্যক্তি। তার মাতার নাম মোছা. আমিনা বেগম।
খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রপিতামহীর ইচ্ছানুসারে ফয়জুননেছা মহারানির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সংসার জীবন শুরু করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক কন্যা সন্তানের পিতা ছিলেন, যিনি শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়া তিনি আট পুত্র সন্তানের জনক। তার পুত্রগণ হলেন ব্যারিস্টার মো. সামছুর জোহা, মো. বদরুদ্দুজা, মো. নুরুল হুদা, মো. নাজমুল উলা, মো. জয়েনুল ওয়ারা, মো. কামরুল হুদা, মো. মাজহারুস ছাফা এবং মো. গাওছার রেজা।
ছবি: খোলা কাগজ
শিক্ষা :
খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ ছিলেন তার পিতামহের একমাত্র পুত্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান। ফলে তার শিক্ষা দীক্ষার বিষয়ে পিতা ও পিতামহ উভয়েরই ছিল বিশেষ আগ্রহ ও আন্তরিক প্রচেষ্টা। পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তার প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয়। ১৮৮১ সালে তিনি ‘গ-মিতিয়’ (বর্তমান দ্বিতীয় শ্রেণির সমমান) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রূপার মুদ্রা পুরস্কার লাভ করেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি নলতার মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীসময়ে টাকী গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে (সপ্তম শ্রেণি) ভর্তি হন। ১৮৮৮ সালের শেষদিকে তিনি কলকাতার লন্ডন মিশন সোসাইটি ইন্সটিটিউশনে সেকেন্ড ক্লাসে (নবম শ্রেণি) ভর্তি হন। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই ১৮৯০ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এন্ট্রান্স (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি অর্জন করেন।
এরপর তিনি ১৮৯২ সালে হুগলী কলেজ থেকে এফ.এ (এইচএসসি) এবং ১৮৯৪ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সাফল্যের সঙ্গে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। সর্বশেষে ১৮৯৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দর্শন শাস্ত্রে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছবি: খোলা কাগজ
কর্মজীবন :
১৮৯৬ সালে খানবাহাদুর আহসানুল্লাহ সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে স্বল্প সময়ের জন্য সুপারনিউমেরারি শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। এরপর বেতন বৃদ্ধিসহ তাকে ফরিদপুরে অতিরিক্ত ডেপুটি ইন্সপেক্টর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিছুদিন পর তিনি ছয় মাসের জন্য বিদ্যালয় উপ-পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৮৯৮ সালের ১ এপ্রিল তিনি স্থায়ীভাবে ডেপুটি ইন্সপেক্টর পদে যোগ দেন এবং বাকেরগঞ্জ জেলায় পদায়িত হন। প্রায় সাত বছর এ দায়িত্ব পালনের পর ১৯০৪ সালে তিনি রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিযুক্ত হন। সেখানে তিনি মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলেন এবং মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেন।
১৯০৭ সালে তার দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় শিক্ষা পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করে শিক্ষা অবকাঠামো ও মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। এ সময়ে তিনি ফেনী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীতে বহু বিদ্যালয় ও ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন।
চট্টগ্রামে কর্মরত অবস্থায় তিনি ভারতীয় শিক্ষা সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত হন এবং পরে বেঙ্গলে মুসলিম শিক্ষা বিষয়ক সহকারী পরিচালক নিযুক্ত হন। এক পর্যায়ে তিনি অবিভক্ত বাংলার শিক্ষা বিভাগের পরিচালকের চলতি দায়িত্বও পালন করেন। ১৯২৯ সালে ৫৫ বছর বয়সে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯২০ সালে তিনি পবিত্র হজ পালন করেন।
ছবি: খোলা কাগজ
সাহিত্যকীর্তি :
কর্মজীবন ও অবসর জীবন, উভয় পর্যায়েই খান বাহাদুর আহসানুল্লাহ সাহিত্যচর্চা ও সৃজনশীল লেখালেখিতে নিরলসভাবে যুক্ত ছিলেন। সে সময়ের অবক্ষয়গ্রস্ত মুসলিম সমাজের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে তিনি ইসলামি ঐতিহ্য, চিন্তাধারা ও আদর্শ বিষয়ে বহু গ্রন্থ রচনা করেন। তার লেখায় ইসলামের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে নতুন তথ্য, ব্যাখ্যা ও চিন্তাধারা পাঠকের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে।
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- শিক্ষকের ম্যানুয়াল, বঙ্গভাষা ও মুসলিম সাহিত্য, মুসলিম জগতের ইতিহাস, ইসলাম ও আদর্শ মহাপুরুষ, তারিকত শিক্ষা, শিক্ষাক্ষেত্রে বঙ্গীয় মুসলমান, কুরআন ও হাদিসের আদেশাবলি, সুফি, সৃষ্টিতত্ত্ব, ইসলামের মহৎ শিক্ষা, মহাপুরুষদের অমিয়বাণী, ইসলের বাণী ও পরমহংসের উক্তি, বিভিন্ন ধর্মের উপদেশাবলি প্রভৃতি। তার সাহিত্যচিন্তার মূল প্রেরণা ছিল দেশপ্রেম, মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ এবং মানবকল্যাণের আকাক্সক্ষা।
তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন- ‘সাহিত্যের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাজকল্যাণ।’
তার মতে, ‘যে জাতির নিজস্ব সাহিত্য নেই, তার আত্মসম্মানও নেই। এমন জাতির উন্নয়ন অনিশ্চিত। বিশ্বদরবারে সমান মর্যাদায় দাঁড়াতে হলে একজন মুসলমানকে অবশ্যই মাতৃভাষাকে জাতীয় চেতনায় ধারণ করতে হবে। জাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বাংলা ভাষার উন্নয়ন অপরিহার্য।’
সমাজকল্যাণ, জাতীয় উন্নয়ন এবং মানুষের চরিত্রগঠনের লক্ষ্যে তিনি বহু মনীষীর জীবনী ও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করেন। এর মধ্যে রয়েছে মহানবী হজরত মুহাম্মদ-এর জীবনচরিত, বিভিন্ন সুফি সাধকের জীবনকথা, রাষ্ট্রনায়ক ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের জীবনভিত্তিক রচনা।
ইসলামের নির্দেশনার পাশাপাশি তার লেখায় ধর্মের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য, গভীরতা ও মানবিক দর্শন স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সুফি, সৃষ্টিতত্ত্ব, ইসলামের মহৎ শিক্ষা ও তারিকত শিক্ষা গ্রন্থগুলোতে এই প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষিত সমাজ ইসলামের গভীর রহস্য জানার আগ্রহ রাখে, কিন্তু শরিয়তের কঠোরতা অনেক সময় সেই পথ রুদ্ধ করে দেয়। প্রকৃত জ্ঞান ও আত্মিক আনন্দের পথে পৌঁছাতে হলে এই বাহ্যিক কঠোরতার অন্তরালের সত্য অনুধাবন জরুরি।
মুসলিম সমাজকে দুরবস্থা থেকে উত্তরণের পথ দেখাতেই তিনি লেখালেখিকে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তবে তার লেখনীর গুণ, বিষয় উপস্থাপনার নতুনত্ব ও স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি এসব রচনাকে কেবল সময়সীমার মধ্যে আবদ্ধ না রেখে চিরস্থায়ী সাহিত্যকীর্তিতে রূপ দিয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি অন্যদের সাহিত্যচর্চার পথও সুগম করে তুলেছিলেন।
আধ্যাত্মিক জীবন :
খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহ ছিলেন এক অতি ধার্মিক ও অনুপ্রাণিত ব্যক্তি। আধ্যাত্মিক সাধনার পথে তিনি ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছিলেন। ১৯০৯ সালে তিনি বিখ্যাত পটনা অঞ্চলের হজরত শাহ গফুর (র.)-এর হাতে আধ্যাত্মিক বায়াত গ্রহণ করেন এবং কাদিরিয়া-ওয়ারেসিয়া সরসেলায় অন্তর্ভুক্ত হন। তবে তার চিন্তা, দর্শন ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির অনন্যতার কারণে তিনি তৎকালীন অন্য পীরদের সঙ্গে তুলনীয় নন। পীর হিসেবে উঁচু অবস্থান থেকে ভক্তদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিবর্তে তিনি সবসময় তাদের সামনে বন্ধু হিসাবে উপস্থিত থাকতেন। তার সহজ-সরলতা ও আধ্যাত্মিক দীপ্তি অনেক মানুষের জীবনে নতুন দিক ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।
আহসানিয়া মিশন প্রতিষ্ঠা :
সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর খান বাহাদুর আহসানুল্লাহ ১৯৩৫ সালের ১৫ মার্চ একটি ধর্মনির্ভর ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আহসানিয়া মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের আত্মিক জাগরণ ঘটানো এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে সামাজিক সেবা পরিচালনা করা।
আহসানিয়া মিশন ছিল মূলত খান বাহাদুর আহসানুল্লাহ-এর বিশ্বাস, আদর্শ ও জীবনদর্শনের বাস্তব রূপ। এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তিনিই নির্ধারণ করেন। তার মতে, সৃষ্টিকর্তার করুণা প্রার্থনার পাশাপাশি তার সৃষ্ট মানুষের সেবাই হলো প্রকৃত ইবাদত। নিঃস্বার্থ সেবা ছিল তার জীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
নিজ আত্মজীবনীতে তিনি এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে লিখেছেন যে, শহরের বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের সেবাকেই তিনি জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তার মতে, মানুষের সেবায় যে অন্তর্গত আনন্দ ও তৃপ্তি পাওয়া যায়, তা ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আত্মপ্রচার থেকে কখনোই অর্জিত হতে পারে না। আত্মকেন্দ্রিকতা পরিহার না করলে প্রকৃত ভালোবাসা জন্ম নেয় না। সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা না থাকলে স্রষ্টার প্রতিও প্রকৃত ভালোবাসা গড়ে ওঠে না।
তিনি বিশ্বাস করতেন, মানবসেবার মধ্য দিয়েই মানুষ নিজের আত্মাকে শুদ্ধ করতে পারে এবং সমাজে সৌহার্দ ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে পারে। ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা গড়ে তোলাই ছিল তার জীবনের একমাত্র সাধনা। আহসানিয়া মিশনের মাধ্যমে তিনি মানুষের মধ্যে এই মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন এবং আজও এই প্রতিষ্ঠান তার সেই মানবতাবাদী দর্শনের জীবন্ত সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে।
মখদুমী লাইব্রেরি :
মুসলিম শিক্ষা ও সাহিত্য প্রসারে খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো মখদুমী লাইব্রেরি ও আহ্ছানউল্লাহ বুক হাউজ লিমিটেড প্রতিষ্ঠা। এই লাইব্রেরি মুসলমান লেখকদের সৃজনশীল লেখার প্রতি উৎসাহিত করে এবং সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে নতুন উদ্দীপনা যোগ করে। বহু সাহিত্যিক, কবি ও লেখক পরে এই লাইব্রেরির সঙ্গে যুক্ত হন।
তৎকালীন আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ‘আনোয়ারা’ এবং ‘বিষাদ সিন্ধু’ মখদুমী লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত হয়। এছাড়াও এখানে প্রকাশিত হয় কাজী নজরুল ইসলামের ‘জুলফিকার’, ‘বনগীতি’, ‘কাব্য আমপারা’, খ্যাতনামা কথাশিল্পী আবু জাফর শামসুদ্দিনের ‘পরিত্যক্ত স্বামী’, সৈয়দ আলী আহছানের ‘নজরুল ইসলাম’, শেখ হাবিবুর রহমানের ‘বাঁশরী’ ও ‘নিয়ামত’ প্রভৃতি গ্রন্থ।
মখদুমী লাইব্রেরি শুধু প্রধান সাহিত্যকর্মই প্রকাশ করেনি, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণির পাঠ্যক্রমের জন্য বহু শিক্ষামূলক গ্রন্থও প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি নতুন লেখকদের সাহিত্য প্রকাশের সুযোগ করে দেয়া এই লাইব্রেরির অন্যতম অবদান।
মখদুমী লাইব্রেরির কার্যক্রম তৎকালীন মুসলিম সমাজে সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্যিক পরিবেশে দ্রুত ও মৌলিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়। এর মাধ্যমে মুসলিম শিক্ষার্থী ও সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে লেখালেখি ও সৃজনশীল চিন্তার উদ্দীপনা জন্মায়।
সম্মান ও পুরস্কার :
খানবাহাদুর আহসানুল্লাহ-এর জীবন ছিল অনুকরণীয়। তিনি সরকারি চাকরির দায়িত্ব সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বপরায়ণতার সঙ্গে পালন করেছেন। তিনি ছিলেন একজন সৎ, ধর্মপ্রাণ, আন্তরিক ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা। এই গুণাবলির কারণে তার কাজের প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সর্বদা সন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন। সততা ও নিষ্ঠার স্বীকৃতিস্বরূপ তার কর্মজীবনে বহুবার দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং তিনি মধ্যম বেতনের গ্রেড ছাড়িয়ে উচ্চ বেতনের গ্রেডে অবস্থান লাভ করেন। শিক্ষা বিভাগের উন্নয়নে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগের জন্য তাকে তৎকালীন সরকার ‘খানবাহাদুর’ উপাধি প্রদান করে।
তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিণ্ডিকেট সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হন। তার আগে কোনো মুসলিমকে এই মর্যাদাপূর্ণ পদে নির্বাচিত করা হয়নি। তিনি সাহিত্যিক মহলে ও সেই সময়ের সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। ১৯১৭-১৯১৮ সালে তিনি ‘বঙ্গের মুসলমান সাহিত্য সমিতি’-র সহসভাপতি ছিলেন।
তার সামাজিক কর্মকাণ্ড, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ তাকে আরব হিজরি ১৪০৫ সালে মৃত্যত্তরভাবে পুরস্কৃত করে। এছাড়া বাংলা একাডেমিও তাকে বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে ‘সর্বাত্মক ও বহুমুখী অবদানের’ স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করে।
শিক্ষা সংস্কার :
মহামনীষী খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লাহর শিক্ষা বিভাগের সহকারী পরিচালক পদে নিযুক্তি বাংলার মুসলিম ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এ দায়িত্বের মাধ্যমে মুসলিম শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসারের গুরু দায়িত্ব তার কাঁধে আসে। তিনি মেধা, বুদ্ধিমত্তা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বহু প্রতিবন্ধকতা দূর করেন এবং নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি স্থগিত থাকা বহু সংস্কার কার্যকর করেন। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার মুসলিম ছাত্রদের জন্য স্বতন্ত্র কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি পূরণে তিনি উদ্যোগ নেন। তার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ইসলামিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়াও চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুল, মোছলেম এ্যাংলো ওরিয়েন্টাল গার্লস কলেজ, মুসলিম হাইস্কুল, মাধবপুর শেখ হাইস্কুল, রায়পুর কে.সি হাইস্কুল, চান্দিনা পাইলট হাইস্কুল, কুটি অটল বিহারী হাইস্কুল, চন্দনা কে.বি হাইস্কুল ও চৌদ্দগ্রাম এইচ.জে পাইলট হাইস্কুল ইত্যাদির স্থাপনা ও উন্নয়নে তিনি সক্রিয় ছিলেন।
উল্লেখযোগ্য সংস্কার হিসেবে পরীক্ষার খাতায় শিক্ষার্থীর নামের পরিবর্তে রোল নম্বর লেখার ব্যবস্থা তিনি প্রবর্তন করেন, যা প্রথমে অনার্স ও এম.এ পরীক্ষায় এবং পরবর্তীতে ইন্টারমিডিয়েট ও বি.এ পরীক্ষায় বাস্তবায়িত হয়। হাইস্কুল ও ইন্টারমিডিয়েট মাদ্রাসার মানোন্নয়ন করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি করেন। সব বিদ্যালয় ও কলেজে মৌলবির পদ সৃষ্টি করে হিন্দু পণ্ডিত ও মুসলিম মৌলবির বেতনের বৈষম্য দূর করেন।
তিনি মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যক্রমে মুসলিম লেখকের লেখা বই প্রবর্তন, মক্তব ও মাদ্রাসায় স্বাধীন শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহার, বৃত্তি বরাদ্দ এবং বিদেশি শিক্ষার জন্য সরকারি সাহায্যের ব্যবস্থা করেন। মুসলিম শিক্ষার প্রসারে মখদুমী লাইব্রেরি, প্রভিন্সিয়াল লাইব্রেরি ও ইসলামিয়া লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠায় তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ।
মহিলা মুসলিম শিক্ষার উন্নয়নের জন্য বিশেষ বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও তার লক্ষ্য ছিল। তার নেতৃত্বে মুসলিম শিক্ষার মান, সুযোগ ও পরিচিতি ব্যাপকভাবে উন্নীত হয় এবং শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।