মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬,
২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
শিরোনাম: বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চায় ইসলামী ব্যাংক      নাহিদ রানার গতির ঝড়, তৃতীয় উইকেট হারিয়ে চাপে অস্ট্রেলিয়া      ৩ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে একনেকে ১০ প্রকল্পের অনুমোদন      স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন আ.লীগের নেতাকর্মীরা      আজ ‘ছায়া বাজেট’ পেশ করবে জামায়াত      এবারের হজ ব্যবস্থাপনায় সফল হয়েছে সরকার      চট্টগ্রামে সাড়ে চার বছরে ডেঙ্গুতে ২২১ জনের মৃত্যু      
বাতিঘর
সাংবাদিকতার দিকপাল মওলানা আকরম খাঁ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ৪:১১ পিএম
মওলানা আকরম খাঁ। ছবি : খোলা কাগজ

মওলানা আকরম খাঁ। ছবি : খোলা কাগজ

মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন উপমহাদেশের একজন প্রভাবশালী ধর্মীয় চিন্তাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক এবং রাজনীতিবিদ। তিনি একাধারে সমাজ সংস্কারক ও ভাষা-সচেতন বুদ্ধিজীবী হিসেবে বাংলার মুসলিম সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার দীর্ঘ জীবন ও কর্মপরিধি বাংলা সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য এবং সাংবাদিকতায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।

মওলানা আকরম খাঁর পিতা আলহাজ গাজী আব্দুল বারী খাঁ ছিলেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং ধর্মীয়ভাবে সম্মানিত মানুষ। তিনি ১৮৩১ সালের বালাকোট যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন গাজী হিসেবেও পরিচিত। তার মাতা বেগম রাবেয়া খাতুন ছিলেন শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত নারী। পরিবারটি দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী ও প্রভাবশালী বংশধারার অংশ ছিল, যার ইতিহাস প্রায় ছয়শ বছরের পুরোনো বলে উল্লেখ করা হয়। শৈশব থেকেই মওলানা আকরম খাঁ দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী স্বভাবের পরিচয় দেন।

তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের মক্তবে। সেখানে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পিতার কাছে পবিত্র কুরআন শিক্ষা লাভ করেন। মক্তবপর্যায়ে তিনি শেখ সাদীর গুলিস্তা ও বুঁস্তা গ্রন্থের পাঠ গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পিতার সঙ্গে কলকাতা ও পাটনা সফর করেন, যেখানে তিনি বিভিন্ন পরিবেশ ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসেন। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তিনি নানার কাছে চলে যান এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর তিনি বর্ধমানের খুলসোনা মাদ্রাসায় এক বছর অধ্যয়ন করেন এবং পরে কলকাতার জুবিলী স্কুলে পড়াশোনা করেন। তিনি নিজ প্রচেষ্টায় বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন।

রাজনৈতিক জীবনে মওলানা আকরম খাঁর সক্রিয়তা শুরু হয় ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের মাধ্যমে। ১৯০৬ সালে তিনি মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হিসেবে ভূমিকা রাখেন। ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার রাজনৈতিক চিন্তাধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে তার অবস্থান। তিনি বিশ্বাস করতেন যে বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা বাংলা এবং শিক্ষার মাধ্যমও বাংলা হওয়া উচিত। তিনি ধর্ম ও ভাষাকে আলাদা বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার পক্ষে ছিলেন এবং উর্দুকে একমাত্র মুসলিমদের ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ধারণার বিরোধিতা করেন।

১৯১২ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনে তিনি বাংলাকে প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি জানান। ১৯১৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন এবং বাংলা ভাষাকে ‘হিন্দুয়ানী ভাষা’ হিসেবে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতার বিরোধিতা করেন। তার ভাষাগত অবস্থান তৎকালীন মুসলিম সমাজে নতুন চেতনার জন্ম দেয়। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে ইসলাম ও বাংলা ভাষার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই এবং মাতৃভাষা পরিবর্তনের কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। ভাষা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি গঠনে তার চিন্তাধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়ও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ শহীদদের হত্যার প্রতিবাদে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। ভাষা আন্দোলনের প্রতি তার এ অবস্থান তাকে জনমানসে আরও সম্মানিত করে তোলে।

সাংবাদিকতা ক্ষেত্রে মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন একজন অগ্রদূত। তিনি ১৯১০ সালে সাপ্তাহিক মোহাম্মদী এবং দৈনিক খাদেম প্রতিষ্ঠা করেন। পরে ১৯২১ সালে তিনি উর্দু জামানা এবং বাংলা দৈনিক সেবক প্রকাশ করেন। ১৯২৭ সালে তিনি পুনরায় মোহাম্মদী মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন, যা দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশিত হয়। ১৯৩৬ সালের অক্টোবর মাসে তিনি দৈনিক আজাদ প্রকাশ করেন, যা বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ পত্রিকা মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যম ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে।

তার সাহিত্যকর্মেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে সমস্যা ও সমাধান, যেখানে ইসলামী সমাজে নারীর মর্যাদা, সুদ, ছবি তোলা এবং সংগীত বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। তিনি আমপারার বাংলা অনুবাদ সম্পাদনা করেন এবং মোস্তফা-চরিত, বাইবেলের নির্দেশ ও প্রচলিত খ্রিষ্টান ধর্ম, মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস, তাফসিরুল কুরআন (১-৫ খণ্ড) এবং মুক্তি ও ইসলামসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন। এসব রচনা ইসলামি চিন্তাধারা, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব এবং সমাজ ইতিহাসের ক্ষেত্রে মূল্যবান সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৬৮ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকেশ্বরী রোড, লালবাগে তার নিজ বাসভবনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বার্ধক্যজনিত ও নানাবিধ অসুস্থতাই ছিল তার মৃত্যুর কারণ। তার মৃত্যুতে বাংলার সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক অঙ্গনে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

মওলানা আকরম খাঁ তার জীবদ্দশায় বহু সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি পাকিস্তান সরকারের প্রেসিডেন্টস অ্যাওয়ার্ড ফর প্রাইড অফ পারফরম্যান্স ইন লিটারচার অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮১ সালে তাকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রদান করা হয়। এ ছাড়া তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো হিসেবেও স্বীকৃতি পান। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলেও তিনি বহু উপাধি ও সম্মানে ভূষিত হন।

সব মিলিয়ে মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি ধর্ম, রাজনীতি, ভাষা ও সাংবাদিকতাকে এক সুতোয় বেঁধে উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে এক নতুন চেতনার সূচনা করেছিলেন। তার জীবন ও কর্ম আজও ইতিহাস, সাহিত্য এবং ভাষা আন্দোলনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

প্রাথমিক জীবন

মওলানা আকরম খাঁ ১৮৬৮ সালের ৭ জুন পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার হাকিমপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আলহাজ গাজী আব্দুল বারী খাঁ এবং মাতা বেগম রাবেয়া খাতুন। পিতা আব্দুল বারী খা ২৪ পরগনার বশিরহাট অঞ্চলের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং তিনি ১৮৩১ সালের বালাকোট যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন গাজী হিসেবেও পরিচিত। তার মাতা বেগম রাবেয়া খাতুন ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত ও বিদুষী নারী।

মওলানা আকরম খাঁ তার ভাইবোনদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন। শৈশব থেকেই তিনি দায়িত্বশীল ও পরিশ্রমী স্বভাবের পরিচয় দেন। অল্প বয়সেই তিনি তার এক নিকট আত্মীয়াকে বিবাহ করেন। তার পারিবারিক বংশধারা বঙ্গ অঞ্চলের একটি প্রাচীন ও প্রভাবশালী পরিবার হিসেবে পরিচিত, যার ইতিহাস প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো বলে উল্লেখ করা হয়।

শিক্ষা জীবন

মওলানা আকরম খাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় গ্রামের মক্তবে। সেখানে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পিতার কাছে পবিত্র কুরআন শেখেন। মক্তব পর্যায়ে তিনি শেখ সাদীর বিখ্যাত গ্রন্থ গুলিস্তা ও বুঁস্তা এর কিছু অংশ অধ্যয়ন করেন।

গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি পিতার সঙ্গে কলকাতা ও পাটনা সফর করেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তার পিতার মাধ্যমে বহু জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির সান্নিধ্য লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে পিতামাতার মৃত্যুর পর তিনি নানার কাছে চলে যান এবং তার তত্ত্বাবধানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি বর্ধমানের খুলসোনা মাদ্রাসায় এক বছর অধ্যয়ন করেন। এরপর মাদ্রাসা শিক্ষা শেষে তিনি কলকাতায় মামার কাছে যান এবং কিছুদিন জুবিলী স্কুলে লেখাপড়া করেন। এ সময় তিনি নিজ প্রচেষ্টায় বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, উর্দু ও সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন।

পরবর্তী সময়ে তিনি জুবিলী স্কুল ত্যাগ করে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ফাযিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

রাজনৈতিক জীবন

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে মওলানা আকরম খাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। তিনি ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন। ১৯১৯ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালেই তিনি সেখানে বাংলা ভাষাকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন, যা তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাথমিক পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯১২ সালে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনে তিনি বাংলাকে প্রাদেশিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। তিনি স্পষ্টভাবে মতপ্রকাশ করেন যে, বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা বাংলা এবং শিক্ষার মাধ্যমও হওয়া উচিত বাংলা ভাষাই। ধর্ম ও ভাষাকে এক করে দেখার ধারণার বিরোধিতা করে তিনি বলেন, মুসলমান হওয়ার কারণে কারও মাতৃভাষা উর্দু হতে হবে এমন ধারণা সঠিক নয়।

১৯১৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি বাংলা ভাষার পক্ষে ঐতিহাসিক যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, যারা বাংলা ভাষাকে ‘হিন্দুয়ানী ভাষা’ বলে অবজ্ঞা করেন, তারা ইতিহাসের বাস্তবতা সম্পর্কে অবগত নন।

বাংলা ভাষার পক্ষে তার একটি উল্লেখযোগ্য উক্তি হলো

‘দুনিয়াতে অনেক আজব জানোয়ার দেখা যায়, কিন্তু স্বীয় মাতৃভাষার পরিবর্তে অন্য ভাষাকে মাতৃভাষা বলিয়া পরিচয় দানকারী জানোয়ার আজ পর্যন্ত আমার নজরে পড়ে নাই।’

আরেকটি বিখ্যাত বক্তব্যে তিনি বলেন

‘আমরা বঙ্গদেশীয় মুসলমান এবং আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। ইসলাম ও বাংলা ভাষার মধ্যে কোনো বিরোধ নাই।’

বাংলা ভাষার স্বীকৃতি ও প্রসারে তিনি বাঙালি মুসলমান সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ভাষাভিত্তিক সচেতনতার ভিত্তি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ শহীদদের হত্যার প্রতিবাদে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রথম শহীদ মিনার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন।

এ ছাড়া ১৯৬২ সালে গঠিত পাকিস্তান কাউন্সিল অব ইসলামিক আইডিওলজির তিনি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

সাংবাদিকতা

মওলানা আকরম খাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা হয় ১৯১০ সালে, যখন তিনি সাপ্তাহিক মোহাম্মদী এবং দৈনিক খাদেম প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৯২১ সালে তিনি উর্দু জামানা এবং বাংলা দৈনিক সেবক প্রকাশ করেন।

১৯২৭ সালে তিনি আবারও মোহাম্মদী মাসিক পত্রিকা পুনঃপ্রকাশ করেন, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এর কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। এ পত্রিকার বহু সংখ্যা বর্তমানে সংরক্ষিত রয়েছে বাংলা একাডেমি এবং বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে-এ। 

মুসলিম সমাজে জাগরণ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৩৬ সালে তার সম্পাদনায় দৈনিক আজাদ প্রকাশ করেন, যা সে সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী পত্রিকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

দৈনিক আজাদ পত্রিকা

১৯৩৬ সালের অক্টোবর মাসে মওলানা আকরম খাঁ দৈনিক আজাদ পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। এটি সেসময়ের জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। মুসলিম লীগকে সমর্থন ও মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে এই বাংলা দৈনিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পত্রিকাটির বহু পুরোনো সংখ্যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকালেও দৈনিক আজাদ জনমত গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে জনসমর্থন সৃষ্টিতে প্রভাব বিস্তার করে। 

সাহিত্য কর্ম 

মওলানা আকরম খাঁ ছিলেন একজন প্রভাবশালী সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ। তার সাহিত্যকর্মে ইসলামী চিন্তাধারা, সমাজ সংস্কার এবং ইতিহাসচেতনার গভীর প্রভাব লক্ষ করা যায়। তার উল্লেখযোগ্য রচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে সমস্যা ও সমাধান, যেখানে ইসলামে নারীর মর্যাদা, সুদ সমস্যা, ছবি তোলা (চিত্র) সংক্রান্ত সমস্যা এবং সংগীত বিষয়ে চারটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। এ ছাড়া তিনি আমপারার বাংলা অনুবাদ সম্পাদনা ও রচনায় অবদান রাখেন।

তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো মোস্তফা-চরিত, যা বর্তমানে খোশরোজ কিতাব মহল থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। এ গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে মোস্তফা-চরিতের বৈশিষ্ট্য শীর্ষক আলোচনাও তার সাহিত্যিক অবদানের অংশ। তিনি বাইবেলের নির্দেশ ও প্রচলিত খ্রিষ্টান ধর্ম বিষয়ে লিখে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রেও অবদান রাখেন। এ ছাড়া মোছলেম বঙ্গের সামাজিক ইতিহাস (ঐতিহ্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত) গ্রন্থে তিনি মুসলিম সমাজের ইতিহাস ও সামাজিক বিবর্তন তুলে ধরেন।

তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তাফসিরগ্রন্থ হলো তাফসীরুল কোরআন (১-৫ খণ্ড), যা খোশরোজ কিতাব মহল থেকে প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি মুক্তি ও ইসলাম গ্রন্থেও তিনি ইসলামি জীবনদর্শন ও মুক্তি সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন। এসব সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন মুসলিম সমাজে ধর্মীয়, সামাজিক ও বৌদ্ধিক জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সম্মাননা ও পদক

মওলানা আকরম খাঁ সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সময়ে দেশি-বিদেশি বহু সম্মাননা ও পদকে ভূষিত হন। ১৯৫৮ সালে তিনি পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্টস অ্যাওয়ার্ড ফর প্রাইড অফ পারফরম্যান্স ইন লিটারচার লাভ করেন।

পরবর্তী সময়ে ১৯৮১ সালে তাকে বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রদান করা হয়। তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো হিসেবেও মনোনীত হন, যা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তার অবদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। 

এ ছাড়া ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে তিনি বিভিন্ন উপাধি, স্বীকৃতি ও সম্মাননায় ভূষিত হন, যা তার দীর্ঘ কর্মজীবনের বহুমাত্রিক অবদানকে তুলে ধরে। 

মৃত্যু

মওলানা আকরম খাঁ ১৯৬৮ সালের ১৮ আগস্ট ঢাকেশ্বরী রোড, লালবাগে তার নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন। বার্ধক্যজনিত জটিলতা এবং নানাবিধ শারীরিক অসুস্থতা তার মৃত্যুর কারণ ছিল।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  মওলানা আকরম খাঁ   সাংবাদিকতা   দিকপাল  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close