ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণ ছিল মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষ উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজনির্ভর। কলকাতার সেই অভিজাত নাগরিক পরিমণ্ডলের বাইরে মফস্বল ও গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য যে কতিপয় ব্যক্তিত্ব আজীবন আপসহীন সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন হরিনাথ মজুমদার। যিনি ‘কাঙ্গাল হরিনাথ’ বা ‘ফিকির চাঁদ বাউল’ নামে সমধিক পরিচিত।
গ্রামীণ সাংবাদিকতার এ পথিকৃৎ একাধারে ছিলেন সাহিত্যিক, সংবাদ-সাময়িকপত্র পরিচালক, সমাজসংস্কারক, নারী শিক্ষার অগ্রদূত, দেশহিতৈষী, মরমি বাউল সাধক এবং শোষিত রায়ত-কৃষকদের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক শাসন, নীলকরদের অবর্ণনীয় অত্যাচার এবং দেশীয় জমিদারগণের প্রজাপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি কলম ও দোতারাকে যুগপৎ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাই কাঙ্গাল হরিনাথের জীবনসংগ্রাম, শিক্ষাবিস্তারে অবদান, আপসহীন সাংবাদিকতা এবং তার বাউল দর্শন বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে শিক্ষনীয় ও অনুপ্রেরণার।
জন্ম ও নিয়তির নির্মম পরিহাস
কাঙ্গাল হরিনাথ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের নদীয়া জেলার কুমারখালী মহকুমার (বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলা) কুন্ডুপাড়া গ্রামে এক তিলি পরিবারে ১৮৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। হরিনাথের জন্মতারিখ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও; অধিকাংশ গবেষকের মতে ২০ জুলাই ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দ বা ৫ শ্রাবণ ১২৪০ বঙ্গাব্দ (বৃহস্পতিবার) তারিখটিই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিসংগত। তার পিতার নাম হলধর মজুমদার (মতান্তরে হরচন্দ্র মজুমদার) এবং মাতা কমলিনী দেবী (মতান্তরে কমলমণি দেবী)। হরিনাথ ছিলেন তার পিতামাতার একমাত্র সন্তান। কিন্তু জন্মের পরপরই তাকে এক চরম পারিবারিক ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হতে হয়। তার বয়স যখন মাত্র ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে, তখন তার মাতার জীবনাবসান ঘটে। মাতৃবিয়োগের শোক কেটে না উঠতেই, হরিনাথের বয়স যখন সাত বছর, তখন তার পিতাও ইহলোক ত্যাগ করেন।
সম্পূর্ণ অনাথ ও অসহায় হয়ে পড়া হরিনাথের আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই আর্থিকভাবে সচ্ছল ও অবস্থাপন্ন হলেও পিতৃমাতৃহীন এই বালকের দায়িত্ব গ্রহণে কেউ এগিয়ে আসেননি। চরম অবহেলা আর বঞ্চনার মাঝে অনাথ হরিনাথকে প্রতিপালনের দায়িত্ব নেন তার এক বৃদ্ধা খুল্লপিতামহী (বড় দাদী)। এই বিধবা বৃদ্ধার নিজেরই অন্ন-বস্ত্রের কোনো স্থায়ী সংস্থান ছিল না। তিনি অত্যন্ত কষ্টসংগৃহীত অন্নের ভাগ হরিনাথকে দিয়ে, তাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। শৈশবের এই চরম দারিদ্র্য এবং পিতামাতার স্নেহবঞ্চনা হরিনাথের মনে গভীর দাগ কাটে। যার ফলে তিনি পরবর্তীতে নিজের নামের পূর্বে ‘কাঙ্গাল’ ভণিতা যুক্ত করেন এবং সেই পরিচয়টিই তার জীবনে স্থায়ী রূপ লাভ করে।
নিজের শৈশব নিয়ে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’তে হরিনাথ লিখেছিলেন: ‘যখন আমার বয়স এক বৎসর অতিক্রম করে নাই, তখন মাতৃদেবী ইহলোক ত্যাগ করেন। আমি মাতৃহীন হইয়া অজ্ঞানাবস্থায় যে কত কাঁদিয়াছি, তাহা কে বলিতে পারে? খুল্লপিতামহী আমাকে প্রতিপালন করেন। আমার পিতা পুনরায় দারপরিগ্রহ করেন নাই, কিন্তু বোধহয় তন্নিমিত্তই সংসারে উদাসীন ছিলেন। তিনি বিষয়কার্য্যে তাদৃশ মনোযোগ বিধান না করায়, পৈতৃক সম্পত্তি যাহা ছিল, তৎসমুদয়ই নষ্ট হয়। সুতরাং মাতৃবিয়োগ হইতেই সাংসারিক দুঃখ যে আমার সহচর হইয়াছে, সে কথা বলা বাহুল্য।’
শিক্ষাজীবন
কাঙ্গাল হরিনাথের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং তা দারিদ্র্যের কষাঘাতে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। ১৮৪১ সালে তিনি স্থানীয় একটি ঐতিহ্যবাহী পাঠশালায় গুরুমশাইয়ের অধীনে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন।
পরবর্তীতে খুল্লতাত (বড় চাচা) নীলকমল মজুমদারের আর্থিক সহায়তায়; ১৮৪৪ সালে কুমারখালীতে কৃষ্ণধন মজুমদার প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু নীলকমল মজুমদারের আকস্মিক ব্যবসায়িক ও ভাগ্য বিপর্যয়ের কারণে সেই আর্থিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দারিদ্র্যতার কাছে নতি স্বীকার করে হরিনাথকে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের ইতি টানতে হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দুয়ার বন্ধ হয়ে গেলেও, হরিনাথের জ্ঞানার্জনের অদম্য স্পৃহা তাকে স্তিমিত করে রাখতে পারেনি। তিনি সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে স্বশিক্ষার কঠিন পথ বেছে নেন।
কুমারখালীর ব্রাহ্মধর্মের প্রচারক দয়ালচাঁদ শিরোমণির সান্নিধ্যে এসে তিনি বাংলা ব্যাকরণে শিক্ষা অর্জন করেন। দয়ালচাঁদের সংগ্রহে থাকা তৎকালীন যুগের বিখ্যাত প্রগতিশীল পত্রিকা ‘তত্ত্ববোধিনী’র সকল সংখ্যা এবং বিভিন্ন ব্রাহ্মধর্মীয় গ্রন্থ তিনি গভীর মনোযোগ সহকারে পাঠ করেন।
বাড়িতে বসে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ এবং কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ নিয়মিত পাঠ করার মাধ্যমে নিজের গদ্যরীতি ও ভাষাজ্ঞানের ভিত গড়ে তোলেন। এই স্বশিক্ষা ও গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাই তাকে পরবর্তীকালে একজন শক্তিমান লেখক ও প্রখর গ্রামীণ বুদ্ধিজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।
নিদারুণ জীবনযুদ্ধ ও কর্মজীবন
অনাথ হরিনাথের বেঁচে থাকার লড়াইটি ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও প্রতিকূলতায় ভরপুর। শৈশবে ক্ষুধা নিবারণের জন্য তাকে পিতামহীর অতি সাধারণ পান্তাভাত, জামিরের পাতা আর নুন খেয়ে দিনাতিপাত করতে হতো। কখনো স্থানীয় লালনপন্থী বা মন্দিরের প্রসাদ কিংবা বন্ধুদের দেওয়া সামান্য খাবারই ছিল তার বেঁচে থাকার সম্বল। জীবন ধারণের তাগিদে মাত্র বারো বছর বয়সে কুমারখালী বাজারে মাত্র দুই পয়সা বেতনে একটি কাপড়ের দোকানে কর্মচারী হিসেবে চাকরি নেন। কিন্তু নীতিবোধ ও সত্যনিষ্ঠার কারণে অল্পদিনেই এই চাকরিটি তাকে হারাতে হয়। এরপর জীবিকার তাগিদে তিনি পুথি ও বইপত্র নকল করার কাজও করেছেন।
পরবর্তীতে তিনি কুমারখালীর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে পরিচালিত একটি নীলকুঠিতে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন, যা ছিল প্রায় ৫১টি নীলকুঠির হেড অফিস। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর নীলকুঠির কুঠিয়াল ও সাহেবদের দ্বারা সাধারণ কৃষকদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার ও শোষণ নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেন। তার ন্যায়নিষ্ঠ মন ও নৈতিক মূল্যবোধ এই শোষণকে মেনে নিতে পারেনি। ফলে কৃষকদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি নীলকুঠির চাকরিটি ঘৃণাভরে পরিত্যাগ করেন এবং নিজেকে সাধারণ মেহনতি রায়তদের একজন হিসেবে বিলিয়ে দেন।
পরবর্তীতে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’তে এ বিষয়ে তিনি লিখেছিলেন : ‘নীলকরেরা, হাঙ্গামা উপস্থিত করিয়াছেন। নিরর্থক মোকদ্দমায় দুঃখী প্রজাতিগকে আবদ্ধ রাখিয়া তাহাদিগকের আবাদি ভূমিতে বড়পূর্বক নীল বিজ ছড়াইতেছেন।’
শিক্ষকতা ও নারী শিক্ষায় অবদান
কাঙ্গাল হরিনাথ অনুভব করেছিলেন, গ্রামীণ সমাজের কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা এবং শোষণ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো শিক্ষা। তাই চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও তিনি শিক্ষাবিস্তারে ব্রতী ছিলেন।
১৮৫৫ সালের ১৩ জানুয়ারি হরিনাথ তার ঘনিষ্ঠ সুহৃদ গোপাল কুণ্ডু, যাদব কুণ্ডু ও গোপালের সহযোগিতায় নিজ গ্রামে একটি অবৈতনিক ‘ভার্নাকুলার স্কুল’ (বাংলা বিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি নিজেই এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং বিনা বেতনে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে বিদ্যালয়টি অল্পদিনেই ব্যাপক সুনাম অর্জন করে এবং উড্রো, মার্টিন প্রমুখ বিদ্যালয় পরিদর্শকের বিশেষ সুপারিশে সরকারি অনুদান লাভ করে। তখন হরিনাথের বেতন নির্ধারিত হয় ২০ টাকা। কিন্তু বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষকের কথা চিন্তা করে; তিনি নিজের বেতন কমিয়ে ১৫ টাকা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন।
হরিনাথ ঊনবিংশ শতকের পূর্ববাংলার রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজে নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন।
তাই ১৮৫৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর কৃষ্ণধন মজুমদারের সক্রিয় সহযোগিতায় কুমারখালীতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। যা বর্তমানে ‘কুমারখালী পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত। এই বালিকা বিদ্যালয়টি ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের প্রথম এবং অবিভক্ত বাংলার তৃতীয় নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নারী শিক্ষার অগ্রসূত্রে ১৮৫৮ সালে স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কুমারখালীতে এসে এই বালিকা বিদ্যালয়টির নতুন ভবনের উদ্বোধন করেন এবং হরিনাথের এই মহতী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
নারী অধিকার নিয়ে ‘সাবিত্রী নাটিকা’য় হরিনাথ লিখেছেন : ‘(চিরদিন পরাধীন, কুলের অঙ্গনা। কে আছে এমন সুহৃৎ কারে বলি বেদনা। হয়ে মায়ের অনুগত, বাল্যকাল করে গত, যৌবন পতির অধীন, স্বাধীনতা জানে না। বৃদ্ধকালে নারীগণে রহে, পুত্রের অধীনে, অধীনতাম বন্ধনে জন্মবধি পায় যন্ত্রণা। বিধাতার বিনয় করি, কেহ যেন না হয় নারী যদি নারী হয় তবে, যেন হয় না পরাধীন।)’
হরিনাথ কেবল নারী শিক্ষার প্রসারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং সতীদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ ও অন্যান্য কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি অবিরাম সোচ্চার ছিলেন। ধর্মের নামে সাধারণ মানুষের ওপর শোষণ বন্ধে তিনি পত্রিকায় নিয়মিত নিবন্ধ লিখতেন।
গ্রামীণ সাংবাদিকতা ও ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র বিপ্লবী ভূমিকা
কাঙ্গাল হরিনাথকে ‘গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক’ এবং বাংলাদেশি সাংবাদিকতার গুরু হিসেবে গণ্য করা হয়। কলকাতার বাবু-সমাজ যখন নিজেদের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও আভিজাত্য রক্ষায় ব্যস্ত ছিল; তখন হরিনাথ তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্রামবাংলার দুঃখ-দুর্দশাকে সংবাদপত্রের পাতায় তুলে ধরেছিলেন।
সাংবাদিকতার হাতেখড়ি :
হরিনাথের সাংবাদিকতার সূচনা ঘটে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের বিখ্যাত ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় কুমারখালীর মফস্বল সংবাদদাতা হিসেবে লেখার মাধ্যমে। তিনি মূলত স্থানীয় কৃষকদের ওপর নীলকরদের অত্যাচার, জমিদারদের শোষণ এবং পুলিশের দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদন পাঠাতেন। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত হরিনাথের লেখার সত্যনিষ্ঠা ও তেজস্বিতা দেখে তাকে নিজের অন্যতম যোগ্য সাহিত্যশিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তার লেখাগুলো সংশোধন করে নিয়মিত প্রকাশ করতে থাকেন।
গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার উদ্ভব :
সংবাদ প্রভাকরে গ্রামীণ সব খবর বিস্তারিত প্রকাশের সীমাবদ্ধতা থাকায় হরিনাথ নিজেই একটি স্বাধীন সংবাদপত্র প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। ফলশ্রুতিতে, ১৮৬৩ সালের এপ্রিল মাসে কুমারখালী থেকে প্রকাশিত হয় ঐতিহাসিক ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’। এটি প্রাথমিকভাবে মাসিক হিসেবে প্রকাশিত হতো, যার চার ফর্মার মূল্য ছিল পাঁচ আনা।
পরবর্তীতে ১৮৬৪ সালে এটি পাক্ষিক এবং ১৮৭১ সালের এপ্রিল থেকে এটি এক পয়সা মূল্যের সাপ্তাহিকী পত্রিকায় রূপান্তরিত হয়। ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ ছিল তৎকালীন বাংলার তমসাবৃত গ্রামীণ সমাজের জাগ্রত বিবেক। এতে সাহিত্য, দর্শন ও বিজ্ঞানবিষয়ক জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ প্রকাশের পাশাপাশি জমিদার, মহাজন, কুসীদজীবী এবং ইংরেজ নীলকরদের অত্যাচারের কেচ্ছা-কাহিনী চরম সাহসিকতার সঙ্গে প্রকাশ করা হতো। হরিনাথ একইসঙ্গে এই পত্রিকার সম্পাদক, রিপোর্টার, প্রকাশক এবং নিজেই গ্রামগঞ্জে ঘুরে ঘুরে পত্রিকা বিক্রির হকার হিসেবে কাজ করতেন।
‘গরুচোর ম্যাজিস্ট্রেট’ প্রতিবেদন :
কাঙ্গাল হরিনাথের সাংবাদিকতার অন্যতম ঐতিহাসিক ও সাহসী দৃষ্টান্ত ছিল পাবনার তৎকালীন ব্রিটিশ ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট স্যার হামফ্রের বিরুদ্ধে করা এক প্রতিবেদন। ম্যাজিস্ট্রেট স্যার হামফ্রে একবার মফস্বল পরিদর্শনে এসে এক দরিদ্র বিধবা নারীর একমাত্র দুগ্ধবতী গাভীটি জবরদস্তিমূলকভাবে উঠিয়ে নিয়ে যান। এই অন্যায়ের খবর পেয়ে হরিনাথ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং তার ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকায় তীব্র ধিক্কার জানিয়ে ‘গরুচোর ম্যাজিস্ট্রেট’ শিরোনামে এক দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ভিত্তি কেঁপে উঠেছিল এবং ম্যাজিস্ট্রেট হরিনাথকে চরম শায়েস্তা করার হুমকি দিলেও, তিনি তার সত্যের পথ থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হননি।
মথুরানাথ প্রেস : এক নতুন দিগন্তের সূচনা
‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ শুরুর দিকে কলকাতায় ‘গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন প্রেস’ থেকে মুদ্রিত হয়ে আসত, যা ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। এই মুদ্রণ জটিলতা দূর করতে হরিনাথ নিজের গ্রামেই একটি ছাপাখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেন। ১৮৭৩ সালে হরিনাথ তার সুহৃদ ও বিখ্যাত ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়ের পিতা মথুরানাথ মৈত্রেয়ের আর্থিক সহায়তায় কুমারখালীতে তার মৃত বাল্যবন্ধু মথুরানাথ মজুমদারের স্মরণে ‘মথুরানাথ প্রেস’ (এম.এন প্রেস) স্থাপন করেন। যা পূর্ববঙ্গের প্রথম প্রকাশনী ও মুদ্রণযন্ত্র। এই ঐতিহাসিক যন্ত্রটি ইংল্যান্ডের লন্ডনের ‘১০ ফিন্সবারি স্ট্রিটের’ ক্লাইম্যান ডিক্সন অ্যান্ড কোম্পানি থেকে তৈরি কলম্বিয়া প্রেস মডেলের (মডেল ১৭০৬) একটি উন্নত যন্ত্র ছিল। যা রানি স্বর্ণকুমারীর অর্থানুকূল্যে ৬০০ টাকায় নিলাম থেকে ক্রয় করা হয়েছিল। ডাবল ক্রাউন সাইজের এই বিশাল মেশিনটির ওজন ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ মণ, যা চালাতে ৩ থেকে ৪ জন লোকের প্রয়োজন হতো।
এই প্রেসটি শুধু ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশের ক্ষেত্রেই অবদান রাখেনি, বরং এটি বাংলা সাহিত্যের এক ঐতিহাসিক পীঠস্থানে পরিণত হয়েছিল। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের কালজয়ী উপন্যাস ‘বিষাদ সিন্ধু’ এই প্রেস থেকে প্রথম মুদ্রিত হয়েছিল। এছাড়া মহাত্মা লালন শাহের বাউল কিছু গান ও হরিনাথের যাবতীয় বই-পত্র এখান থেকেই মুদ্রিত হয়েছে।
রাজশাহীর রানি স্বর্ণকুমারী দেবী দীর্ঘ ১৮ বছর এই প্রেস ও পত্রিকাটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য নিয়মিত আর্থিক অনুদান প্রদান করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকারের কঠোর মুদ্রণ আইন (ঠবৎহধপঁষধৎ চৎবংং অপঃ) এবং চরম আর্থিক সংকটের কারণে ১৮৮৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর (১২৯২ বঙ্গাব্দের আশ্বিন) মাসে এই ঐতিহাসিক পত্রিকার প্রকাশনা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এই প্রেস ঘরে বোমা নিক্ষেপ করেছিল, যার ফলে কাঙ্গাল কুঠিরের ব্যাপক ক্ষতি হলেও লোহার তৈরি এই ঐতিহাসিক প্রেসটি অলৌকিকভাবে অক্ষত রয়ে যায়।
লালন সাঁইয়ের সখ্য ও লাঠিয়াল প্রতিরোধ
কাঙ্গাল হরিনাথের জীবনের এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার মহান বাউল সাধক লালন শাহের সংস্পর্শে আসার পর। লালন ও হরিনাথ ছিলেন পরস্পরের পরম মিত্র এবং আধ্যাত্মিক পথের পরিপূরক দুই সাথী। শিলাইদহ ও কুমারখালী অঞ্চলে যখন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর জমিদাররা সাধারণ প্রজাদের ওপর অত্যাচার ও শোষণ শুরু করেন, তখন কাঙ্গাল হরিনাথ তার ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’য় ঠাকুর জমিদারদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ঠাকুর পরিবার তাকে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বশীভূত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলে, তাকে শায়েস্তা করার জন্য ভাড়াটে লাঠিয়াল বাহিনী প্রেরণ করে। এই সংবাদ পেয়ে বাউল সম্রাট লালন শাহ তৎক্ষণাৎ তার অনুসারী ও লাঠিয়াল শিষ্যদের নিয়ে কাঙ্গাল কুঠিরকে পাহারা দিয়ে ঘিরে রাখেন এবং জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। লালন ও তার শিষ্যদের অদম্য প্রতিরোধের মুখে জমিদারের ভাড়াটে গুন্ডারা রণভূমি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। এভাবে কাঙ্গাল হরিনাথের জীবন রক্ষা পায়।
কাঙ্গাল ফিকির চাঁদের দল
লালনের আধ্যাত্মিক দর্শনে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাঙ্গাল হরিনাথ ১৮ বছর গ্রামবার্ত্তা সম্পাদনার পর সাংবাদিকতার উত্তাল পথ ছেড়ে আত্মিক শান্তির জন্য ধর্মসাধনায় নিমজ্ঞ হন। গ্রামীণ মানুষের মাঝে সহজ-সরল ভাষায় আধ্যাত্মিক ও নৈতিক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৮৮০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত বাউল দল ‘কাঙ্গাল ফিকির চাঁদের দল’। জনশ্রুতি আছে, সংগীত উপলক্ষে হরিনাথ যেখানেই গান করতেন, সে স্থান তার বাউল সংগীতের পবিত্র স্রোতে প্লাবিত হয়ে যেত। হরিনাথ ‘ফিকির চাঁদ বাউল’ ছদ্মনাম ধারণ করে প্রায় ১ হাজার বাউল গান রচনা করেন এবং সদলবলে হাটে-ঘাটে-মাঠে তা গেয়ে বেড়াতেন।
তার রচিত গানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি কালজয়ী আধ্যাত্মিক সৃষ্টি হলো :
‘হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হলো পার কর আমারে!
তুমি পারের কর্তা শুনে বার্তা ডাকি হে তোমারে।
আমি আগে এসে ঘাটে রইলাম বসে,
যারা পরে এল আগে গেল আমি রইলাম পরে।’
এই গানটি বাংলার লোকসংস্কৃতির আকাশে এক ধ্রুবতারার মতো বিরাজ করছে এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ সমকালীন বহু বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
সাহিত্য সাধনা ও গ্রন্থতালিকা
কাঙ্গাল হরিনাথ কেবল সাংবাদিক বা বাউল সাধক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন উচ্চমানের সাহিত্যস্রষ্টা। উনিশ শতকের মধ্যভাগে নিভৃত পল্লীতে বসে হরিনাথ লোকশিক্ষা, সুনীতি প্রচার ও সংস্কৃতিচর্চার আদর্শ প্রতিষ্ঠায় অনন্য গদ্য ও পদ্য রচনা করে এক ব্যতিক্রমধর্মী ও বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
১৮৫৯ সালে প্রকাশিত তার ‘বিজয় বসন্ত’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় আদি উপন্যাস হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। যার জনপ্রিয়তার কারণে জীবদ্দশাতেই বইটির একাধিক সংস্করণ প্রকাশ করতে হয়েছিল। তার গদ্য-পদ্য, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ মিলিয়ে মোট গ্রন্থের সংখ্যা ১৮টি মুদ্রিত হলেও অপ্রকাশিত ও আংশিক মুদ্রিত মিলিয়ে প্রায় ৪২টি রচনা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে : ১. বিজয়-বসন্ত (১৮৫৯) ২. পদ্মপুণ্ডরিক (১৮৬২) ৩. চারুচরিত্র (১৮৬৩) ৪. কবিতা কৌমুদি (১৮৬৬) ৫. বিজয়া (১৮৬৯) ৬. কবিকল্প (১৮৭০) ৭. অক্রুর সংবাদ (১৮৭৩) ৮. চিত্তচপলা (১৮৭৬) ৯. সাবিত্রী নাটিকা (১৮৭৮) ১০. কাঙ্গাল-ফিকিরচাঁদ ফকীরের গীতাবলী (১২৯৩-১৩০০ বঙ্গাব্দ) ১১. ব্রক্ষ্মণ্ডবেদ (১২৯৪-১৩০২ বঙ্গাব্দ) ১২. মাতৃমহিমা (মৃত্যুর পূর্বে লিখিত)।
তার সাহিত্যিক দীক্ষায় অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীতে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় (ঐতিহাসিক), জলধর সেন (সম্পাদক ও ভ্রমণকাহিনী লেখক) এবং দীনেন্দ্রকুমার রায়ের মতো দিকপাল পণ্ডিতরা বাংলা সাহিত্যজগতে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
জীবনাবসান ও অন্তিম ইচ্ছা
দীর্ঘ অভাব-অনটন, অক্লান্ত শারীরিক পরিশ্রম এবং ঔপনিবেশিক শাসনের মানসিক পীড়নে কাঙ্গাল হরিনাথের শরীর ক্রমশ ভেঙে পড়েছিল। জীবনের শেষ ভাগে তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে নিজেকে সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক সাধনায় বিলীন করে দিয়েছিলেন। ১৮৯৬ সালের ১৬ এপ্রিল (বাংলা ১৩০৩ সালের ৫ বৈশাখ, অক্ষয় তৃতীয়া তিথি) বৃহস্পতিবার অপরাহ্ন ৩-৩০ মিনিটে এই মহান সাধক ও নির্ভীক কলমযোদ্ধা কুমারখালীর কাঙ্গাল-কুটিরে ৬৩ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। তার প্রয়াণে তৎকালীন কলকাতার বিখ্যাত ‘ইন্ডিয়ান মিরর’ পত্রিকা গভীর শোক প্রকাশ করে লিখেছিল : ‘নদীয়া জেলাবাসী আজ তাদের একজন অত্যন্ত মহান ও নিঃস্বার্থ সুসন্তানকে হারালো।’
মৃত্যুর পূর্বে কাঙ্গাল হরিনাথ এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী অন্তিম ইচ্ছা প্রকাশ করে গিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তাকে যেন প্রথাগতভাবে সম্পূর্ণ দাহ করে ভস্মীভূত না করা হয়। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, মৃত্যুর পর তার দেহের বাম হাতের কনিষ্ঠা অঙ্গুলি, মাথার খুলির কিয়দাংশ এবং বাম পায়ের বুড়ো আঙুলটি চিতার আগুন থেকে রক্ষা করে সযত্নে তুলে রাখা হয়। পরবর্তীতে দাহাবশেষের ছাইভস্মসহ এই তিনটি পবিত্র দেহাংশ তার বাড়ির নিজ পূজার ঘরের মেঝেতে সমাহিত করা হয়, যা আজও তার উত্তরসূরিদের দ্বারা পরম শ্রদ্ধায় সংরক্ষিত রয়েছে।
স্মৃতি সংরক্ষণ ও কাঙ্গাল হরিনাথ জাদুঘর
কাঙ্গাল হরিনাথ উনিশ শতকের অবহেলিত গ্রামীণ জাগরণের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তার মৃত্যুর পর দীর্ঘকাল পর্যন্ত তার উত্তরসূরিরা, বিশেষ করে প্রপৌত্র শ্রী অশোক মজুমদার ও তার সহধর্মিণী গীতা রানী মজুমদার অত্যন্ত প্রতিকূলতার মাঝেও ঐতিহাসিক মুদ্রণযন্ত্রটি নিজেদের জরাজীর্ণ বসতভিটায় সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে, এই সাহসী ঐতিহ্যকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশ সরকার প্রায় ৬ কোটি টাকা বাজেটে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে তার স্মৃতি বিজড়িত কুন্ডুপাড়ায় ২৮ শতক জমির উপর একটি দ্বিতল স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করে।
২০১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর ‘কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর’ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ২০২৩ সালের ২০ জুলাই কাঙ্গালের ১৯০তম জন্মবার্ষিকীতে তার ঐতিহাসিক ‘মথুরানাথ প্রেস’ মুদ্রণযন্ত্রটি এই জাদুঘরের দ্বিতীয় তলায় দর্শনার্থীদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত করা হয়। বর্তমানে এই জাদুঘরের গ্যালারিতে কাঙ্গালের ব্যবহৃত ঐতিহাসিক মুদ্রণযন্ত্র, ধাতব টাইপ হরফের বাক্স, পাণ্ডুলিপি এবং প্রায় ১৭০টিরও বেশি দুর্লভ ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে।
কেকে/ এমএস