আজ ২১ সেপ্টেম্বর কবি কুসুমকুমারী দাশের জন্মদিন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কিছু নাম আলোয় থাকে, আর কিছু নাম থাকে আলোর পেছনে। আলোর পেছনের মানুষটি অনেক সময় আলোর উৎসও বটে। কুসুমকুমারী দাশ তেমনই একজন। বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশের জননী হিসেবেই তিনি বেশি পরিচিত। কিন্তু সেটিই তার একমাত্র পরিচয় নয়। তিনি নিজেও কবি ছিলেন, সমাজকর্মী ছিলেন, ব্রাহ্মসমাজের বেদি থেকে উপাসনা পরিচালনাকারী আচার্য ছিলেন। উনিশ শতকের শেষভাগে বরিশালের মতো মফস্বল শহরে জন্ম নিয়েও তিনি কলকাতার বেথুন স্কুলে পড়েছেন, পত্রিকার পাতায় লিখেছেন, নারীদের সংগঠিত করেছেন।
আজ তার দু-একটি চরণ আমাদের স্মৃতিতে টিকে আছে, কিন্তু নামটি অনেকের কাছে অচেনা। ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’ বহু প্রজন্মের শিশু মুখস্থ করেছে, শ্রেণিকক্ষে আবৃত্তি করেছে। অথচ অনেকেই জানে না, এর রচয়িতা কে। এটি কেবল একজন কবির প্রতি অবিচার নয়, আমাদের সাহিত্যস্মৃতির একটি বড় শূন্যতাও। কুসুমকুমারীর জন্মদিনে বাতিঘরের আজকের আয়োজেনে আমরা তার জীবন, সমাজকর্ম, কবিতা এবং জীবনানন্দের কাব্যচেতনায় তার প্রভাব নিয়ে কথা বলব। দেখব, সীমিত সুযোগের মধ্যেও একজন নারী কীভাবে নিজের জায়গা তৈরি করেছিলেন, আর সেই সুযোগ কেন শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পেল না।
বরিশালের ব্রাহ্মপরিবারে বেড়ে ওঠা
কুসুমকুমারী দাশের জন্ম ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে বরিশাল শহরে। জন্মতারিখ নিয়ে সূত্রভেদ আছে। একটি সূত্রে ২১ সেপ্টেম্বর, অন্যটিতে ২১ পৌষ ১২৮২ বঙ্গাব্দ। তার বাবা চন্দ্রনাথ দাশ, মা ধনমণি। পৈতৃক নিবাস গৌরনদী থানার গৈলা গ্রামে, যে গ্রাম ‘মনসামঙ্গল’-এর কবি বিজয়গুপ্তের জন্মস্থান বলেও খ্যাত। চন্দ্রনাথ ও তার অগ্রজ কালীমোহন ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করলে গ্রামবাসীর বিরোধিতায় তাদের পৈতৃক ভিটা ছাড়তে হয়। সেই থেকে তাদের ঠিকানা বরিশাল শহর।
ধর্মান্তরের মূল্য সেকালে সহজ ছিল না। সমাজচ্যুতি, স্বজনবিচ্ছেদ, পিতৃভূমি হারানো, সবই ছিল এর অংশ। তবু বরিশালের ব্রাহ্মসমাজ তখন প্রাণবন্ত এক প্রতিষ্ঠান। কুসুমকুমারীর ছোট বোন হেমন্তকুমারীর বর্ণনায় সেখানে বাস করতেন বহু সুশিক্ষিত ও গণ্যমান্য মানুষ। ছিল জিলা স্কুল, অশ্বিনীকুমার দত্তের প্রতিষ্ঠিত ব্রজমোহন ইনস্টিটিউশন। ধর্মভাবের উত্তাপ আর জ্ঞানচর্চার আগ্রহ মিলেমিশে এক বিশেষ পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। সেখানেই বেড়ে উঠলেন চন্দ্রনাথের এক পুত্র ও তিন কন্যার জ্যেষ্ঠ কুসুমকুমারী।
তার শিক্ষার গল্প নিজেই একটি ছোট সংগ্রামের আখ্যান। তখন বরিশালে মেয়েদের জন্য হাইস্কুল ছিল না। ১২৯৬ বঙ্গাব্দে একটি মেয়েদের হাইস্কুল চালু হলো, কিন্তু হিন্দু কি মুসলমান, কোনো পরিবারই মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে চাইত না। ছাত্রীর অভাবে অচিরেই স্কুলটি বন্ধ হয়ে গেল। কুসুমকুমারী তখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। মেয়ের পড়ার আগ্রহ দেখে বাবা ও স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পরামর্শে তাকে কলকাতার বেথুন স্কুলে ভর্তি করানো হলো। হেমন্তকুমারী লিখেছেন, তারা নিঃসম্বল ছিলেন, কিন্তু উচ্চশিক্ষা দিতে পিতা কার্পণ্য করেননি।
কলকাতায় বোর্ডিংয়ে জায়গা না থাকায় প্রথমে তার থাকার ব্যবস্থা হয় ‘প্রবাসী’ সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের গৃহে। পরে তিনি ব্রাহ্মবালিকা বোর্ডিংয়ে লাবণ্যপ্রভা বসুর তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করেন। রামানন্দের সান্নিধ্য তার সাহিত্যজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়েছিল। ১৮৯৪ সালে প্রবেশিকা শ্রেণিতে পড়ার সময়ই তার বিয়ে হয় ব্রজমোহন ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক এবং মাসিক ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক সত্যানন্দ দাশের সঙ্গে। এর সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষারও সমাপ্তি ঘটে।
এখানে থমকে দাঁড়াতে হয়। যে মেয়ে এত কষ্ট করে শিক্ষার পথে এসেছিলেন, তার পড়াশোনা প্রবেশিকার দোরগোড়ায় থেমে গেল। জীবনানন্দ পরে লিখেছেন, মা ইচ্ছা করলে অনায়াসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারতেন। এই মন্তব্যে গর্ব আর ক্ষোভ একসঙ্গে মিশে আছে।
ব্রাহ্মসমাজের কর্মী ও সমাজসেবী
বিয়ের পর কুসুমকুমারী বরিশালের দাশ পরিবারের সদস্য হলেন। শ্বশুর সর্বানন্দ দাশ ছিলেন বরিশাল ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক। ধর্মান্তরের পর তিনি বৈদ্যদের জাতিচিহ্ন ‘গুপ্ত’ পদবি ছেড়ে ‘দাশ’ লিখতে শুরু করেন। স্বামী সত্যানন্দ ছিলেন মোহমুক্ত, প্রজ্ঞাকামী মানুষ। সেই গৃহে শিক্ষার আবহ ছিল, কিন্তু ছিল অসচ্ছলতা আর বিশাল যৌথ সংসারের নিরবচ্ছিন্ন দায়ও।
এর মধ্যেই কুসুমকুমারী নিজের কর্মজীবন গড়েছেন, আর তার প্রায় পুরোটায় প্রাধান্য পেয়েছে সমাজসেবা। ব্রাহ্মসমাজের সুবাদে সেকালের নারীরা ঘরের বাইরে পা রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন, আর কুসুমকুমারী সেই সুযোগকে কাজে পরিণত করেছেন গভীর নিষ্ঠায়। শিশু সন্তানদের বাড়িতে রেখে রাত্রিবেলা প্রতিবেশীর বিপদে ছুটে যাওয়ার মতো নারী সেকালে যেমন, এ যুগেও তেমন বিরল। এই সেবাপরায়ণতার মধ্যেই রামমোহন রায় ও বিদ্যাসাগরের নবজাগরণী ভাবনার সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
তার সামাজিক ভূমিকার কয়েকটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য : কলকাতায় ব্রাহ্মসমাজের শতবার্ষিকী উৎসবে তিনি বরিশালের মহিলাদের প্রতিনিধি হয়ে গিয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। ১৩১৯ থেকে ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছর বরিশাল ছাত্র সংঘের সপ্তাহব্যাপী মাঘোৎসবের মহিলা দিবসের উপাসনায় তিনি আচার্যের কাজ করেছেন। জীবনানন্দ লিখেছেন, বাবা ও পিসেমশায়ের অবর্তমানে মা বরিশাল ব্রাহ্মসমাজে আচার্যের দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি বরিশাল মহিলা সভার সম্পাদক ছিলেন। এর মাধ্যমে এ অঞ্চলের নারীদের স্বাবলম্বী হতে এবং মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছেন। ‘ব্রহ্মবাদী’ পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লিখতেন। তার প্রবন্ধ মূলত ব্রাহ্মসমাজের সভায় পাঠের জন্য রচিত। ‘নারীত্বের আদর্শ’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় তিনি স্বর্ণপদক পান।
একই নারী একইসঙ্গে বড় সংসারের গৃহিণী, সন্তানদের জননী, সমাজের সংগঠক এবং ধর্মসভার আচার্য। ভূমিকাগুলো পরস্পরবিরোধী মনে হতে পারে, কিন্তু তার জীবনে এগুলো একই সূত্রে বাঁধা ছিল। সেবা ও কর্মকেই তিনি সাধনা বলে জেনেছেন। ব্রাহ্মসমাজের নারীরা সে সময় স্ত্রীশিক্ষা ও স্ত্রীস্বাধীনতার পথ উন্মুক্ত করেছিলেন, আর কুসুমকুমারী ছিলেন সেই ধারার একজন সক্রিয় বাহক।
কুসুমকুমারীর কবিতা : পাঠ ও বিশ্লেষণ
কুসুমকুমারীর কবিতার সংখ্যা সীমিত, আর যেটুকু টিকে আছে তা বিচ্ছিন্নভাবেই। তবু সেই অল্প কবিতাতেই তার কাব্যমানসের পরিচয় স্পষ্ট। ছোটবেলা থেকেই তার কবিতা ও প্রবন্ধ লেখার হাত ছিল। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় শিশুদের জন্য যে বর্ণশিক্ষার বই লিখেছিলেন, তার প্রথম ভাগে কুসুমকুমারীর যুক্তাক্ষরবিহীন ছোট পদ্যাংশ ছিল, যেমন ‘ছোট নদী দিনরাত বহে কুলকুল’। তার কবিতা ছাপা হয়েছে ‘ব্রহ্মবাদী’, ‘প্রবাসী’ ও ‘মুকুল’ পত্রিকায়। তার কবিতাকে বিষয় অনুযায়ী মোটামুটি চার ভাগে ভাগ করা যায়।
সবচেয়ে পরিচিত কবিতা ‘আদর্শ ছেলে’। এর প্রথম দুই চরণেই কবিতাটির মূল প্রশ্ন : কবে আসবে সেই ছেলে, যে ‘কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়’ হবে? কবিতার গড়ন সরল। জোড়ায় জোড়ায় মিল, প্রশ্ন ও আদেশের পালাবদল, আর ছোট ছোট বাক্য। ‘নাই কি শরীরে তব রক্ত, মাংস, প্রাণ?’ বা ‘হাত পা সবারই আছে, মিছে কেন ভয়?’ ধরনের প্রশ্ন সরাসরি পাঠকের বিবেকে আঘাত করে। কথায় কথায় যার চোখে জল আসে, তাকে কবি চান না। এতে কিছতা কঠোর পৌরুষের আদর্শ আছে, যা স্বদেশি যুগের মেজাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কবিতাটির শেষ দুই চরণে আদর্শ অনেক উদার হয়ে ওঠে : কৃষকের শিশু আর রাজার কুমার, সবার জন্যই এ বিশ্বে কাজ আছে। এই সাম্যের ঘোষণা ব্রাহ্মসমাজের মানবতাবাদী চেতনারই প্রতিধ্বনি।
‘মনুষ্যত্ব’ কবিতাকে ‘আদর্শ ছেলে’-র পরবর্তী পর্ব বলা চলে। এর সূচনাই চমকপ্রদ : কবি নিজের আগের কবিতার কথা স্মরণ করে বলছেন, ‘একদিন লিখেছিনু আদর্শ যে হবে’, আর আজ লিখছেন ‘বড় দুঃখ লয়ে প্রাণে’। কবিতার কেন্দ্রীয় অভিযোগ, বাঙালি এখনো বোঝেনি মানুষ কোন উপাদানে গড়ে ওঠে। পুঁথি হাতে পাঠ শেখা আর দু-চারটে পাশ দিয়ে আজকের দিনে আশ্বাস মেলে না। চাই শৌর্য, বীর্য, তেজে ভরা মন, আর একতার বল। এই কবিতায় শিক্ষা সম্পর্কে কবির যে সংশয়, তা তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই আসা বলে মনে হয়। ‘উদ্বোধন’ কবিতার সম্বোধন ‘বঙ্গের ছেলে-মেয়ে জাগো’। এখানে ‘মেয়ে’ শব্দটি লক্ষণীয়, কারণ জাতির জাগরণের ডাকে কন্যারাও ছেলেদের পাশে স্থান পেয়েছে। আত্মনির্ভরতা, ত্যাগ ও একতার বাণীই এই কবিতার প্রাণ।
‘মায়ের প্রতি’ কবিতায় দেশ ‘বন্দিনী মূর্তি’ ধরে দেখা দেয়। ‘হিমাচল হবে দূর কুমারিকা পার’ চরণে ভারতজুড়ে জাগরণের কল্পনা আছে। এখানে ভাষা গম্ভীর, ভঙ্গি স্তোত্রের মতো। কবিতার মা একই সঙ্গে জননী, জন্মভূমি ও দেবী। ‘কোটি কোটি মৃত প্রাণ, হোমাগ্নির প্রায় উঠুক জ্বলিয়া’ পঙ্ক্তিতে হোমের আগুনের উপমা ব্রাহ্ম-আধ্যাত্মিক আবহ ও স্বদেশি উদ্দীপনাকে মিলিয়ে দেয়। এই কবিতা স্বদেশি যুগে জন্ম নেওয়া নারীকণ্ঠের একটি উল্লেখযোগ্য দলিল।
‘অরূপের রূপ’ ও ‘সাধন পথে’ ব্রাহ্ম-সাধনার কবিতা। ‘রূপসিন্ধু মাঝে হেরি অরূপ তোমায়’, এই একটি চরণে ব্রাহ্মধর্মের নিরাকার ঈশ্বরের ধারণা ধরা পড়েছে। কবি তীর্থে তীর্থে ঈশ্বর খোঁজেন না। তিনি তাকে দেখেন উদার আকাশে, সিন্ধুর সুনীল জলে, গিরি-নির্ঝরিণী আর দিগন্তলীন প্রান্তরে। ‘সাধন পথে’ কবিতায় কর্মক্লান্ত দুটি বাহু কাজ করে চলে, আর অন্তরে জেগে থাকে দুরন্ত সাধনা। এখানে কাজই সাধনা। কবির জীবনদর্শনের সঙ্গে কবিতার মিল স্পষ্ট। ‘বসন্তে’ ও ‘বন্দনা’ প্রকৃতির উচ্ছ্বাসে ভরা। বসন্তের গানে ‘নূতন দেশের মোহন ঝঙ্কার’ শুনে কবি ‘কে বাঁচিবি আয়’ বলে সবাইকে ডাকেন। ‘বন্দনা’-য় ভোরের সূর্য, সাগর, ফুল, সমীরণ ও তারকারাজি যেন এক বিশ্ববন্দনায় যোগ দিয়েছে।
‘দাদার চিঠি’ ও ‘খোকার বিড়াল ছানা’-য় কবি অন্য এক রূপে ধরা দেন। প্রবাসী ভাইয়ের চিঠির ছলে লেখা ‘দাদার চিঠি’-তে ‘মনা, ভুতো, বুলী, পুঁটি’-দের নামের সারি, স্টেশনের বিদায়দৃশ্য, মায়ের জলভরা চোখ, সব মিলিয়ে বাঙালি ঘরের স্নেহের ছবি ফুটে ওঠে। ‘বিদেশ এলে বুঝতে পারবে... এক রক্তের টান’ চরণে আছে সহজ সত্যের উচ্চারণ। ‘খোকার বিড়াল ছানা’-য় সোনামুখী, সোহাগিনী ও চাঁদের কণা নামের তিন বিড়ালছানা ঘরোয়া সংসারের হালকা আনন্দ ছড়িয়ে দেয়। জীবনানন্দ নিজে মায়ের প্রথম জীবনের কবিতা হিসেবে ‘দাদার চিঠি’-র নাম করেছেন।
কুসুমকুমারীর কবিতার বৈশিষ্ট্য সরল ভাষা, স্পষ্ট নৈতিক বক্তব্য, মিলনির্ভর সহজ ছন্দ আর আন্তরিকতা। শিক্ষণীয় বার্তা অনেক জায়গাতেই কবিতার শিল্পকে ছাপিয়ে যায়, ফলে কিছু কবিতা উপদেশমূলক হয়ে পড়েছে। কিন্তু জীবনানন্দের ভাষায় তার কবিতায় ‘আশ্চর্য প্রসাদগুণ’ ছিল। মাঝে মাঝে ‘দু-চারটে বিচ্ছিন্ন সিদ্ধি’ ছাড়া সম্পূর্ণ সিদ্ধি না পেলেও মহৎ কবিতার আভাস তাতে ছিল। এখানে আরও একটি কথা মনে রাখা দরকার। তার সমসাময়িক অনেক নারী কবি ভাবালুতা ও ব্যক্তিগত বেদনায় আবদ্ধ ছিলেন। কুসুমকুমারী সেখানে সমাজ, জাতি ও নীতির বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছেন, যা তৎকালীন নারীকণ্ঠে তুলনামূলকভাবে বিরল।
একটি বেদনাদায়ক সত্যও বলতে হয়। ‘মুকুল’ ও ‘পৌরাণিক আখ্যায়িকা’ নামে দুটি বইয়ের কথা অনেকে উল্লেখ করলেও আজ পর্যন্ত কোনো গ্রন্থাগারে বা মুদ্রিত গ্রন্থতালিকায় তার কোনো বইয়ের সন্ধান মেলেনি। ‘স্মৃতিসুধা’ নামে একটি আত্মজীবনী তিনি লিখতে শুরু করেছিলেন, তা-ও বেশিদূর এগোয়নি। যে পত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতো, তার অনেকই হারিয়ে গেছে, কিছু হয়তো তিনি নিজেই নষ্ট করেছেন। তাই তার সৃষ্টির পূর্ণ পরিচয় আজ পাওয়া কঠিন। পুরোনো পত্রিকার নথি ঘেঁটে তার ছড়িয়ে থাকা লেখা সংগ্রহ ও সংকলনের উদ্যোগ এখন জরুরি।
জীবনানন্দের সাহিত্যে প্রভাব
কুসুমকুমারীর জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় সম্ভবত মা হিসেবে। তার তিন সন্তান জীবনানন্দ, অশোকানন্দ ও সুচরিতা। জ্যেষ্ঠ পুত্র জীবনানন্দ ১৮৯৯ সালে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’র শেষে সংযোজিত জীবনকথায় বলা হয়েছে, তিনি মায়ের কাছ থেকেই কবিতা ও প্রকৃতিপ্রীতি লাভ করেছিলেন।
জীবনানন্দ নিজে ‘আমার মা ও বাবা’ প্রবন্ধে মায়ের যে মূল্যায়ন করেছেন, তা কেবল ভক্তের শ্রদ্ধাঞ্জলি নয়, একজন সাহিত্যিকের সুচিন্তিত বিচারও। তিনি লিখেছেন, দেশি-বিদেশি কবি ও ঔপন্যাসিকের কোথায় কী ভালো, সেসবের প্রায় প্রথম পাঠ তিনি মায়ের কাছেই নিয়েছেন। মায়ের মুখে শুনেছেন ওয়ার্ডসওয়ার্থের অনেক ছোট কবিতা। বৈষ্ণব পদাবলী থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাংলা কবিতার প্রায় সম্পূর্ণ ঐতিহ্য মা জানতেন ও ভালোবাসতেন। ফলে তার স্বাভাবিক কবিমন হয়েছিল শিক্ষিত ও স্বতন্ত্র। আধুনিক বাংলা কবিতার এক প্রধান পুরুষের প্রথম সাহিত্যপাঠ যে এক নারীর কণ্ঠে শোনা, এ ঘটনা আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষ ভাবনার বিষয়।
এই প্রবন্ধের একটি ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। জীবনানন্দ তখন তরুণ। চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যুর পর তিনি তার ওপর একটি কবিতা লিখে মাকে পাঠিয়েছিলেন। মা ফেরত ডাকে লিখলেন, চিত্তরঞ্জন সম্বন্ধে লিখে ভালোই করেছ, কিন্তু রামমোহন ও মহর্ষির ওপর লিখতে বলেছিলাম। তিনি লক্ষ করেছিলেন, তরুণ জীবনানন্দের মন বড় বড় আদর্শ পুরুষকে তাদের উঁচু আসন থেকে নামিয়ে বিশ্লেষণী বুদ্ধিতে আঘাত করতে চায়। মা বলেছিলেন, আগে তাদের মহত্ত্বে বিশ্বাস কর। মনের নেতিবাচকতা সরিয়ে ফেল। শুধু মহামানুষ নয়, যে-কোনো মানুষ কতখানি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের পাত্র, তা অনুভব করতে শেখ।
জীবনানন্দ স্বীকার করেছেন, অনেক তর্ক-বিতর্কের পর তিনি বুঝেছেন, মা ঠিকই বলেছিলেন। জীবনানন্দের কবিতার গভীর মানবিক মমতা, প্রকৃতির প্রতি অনুরাগ আর স্বদেশের প্রতি আত্মিক টানের শেকড়ের একটি সূত্র এখানে পাওয়া যায়। তার ‘রূপসী বাংলা’-র ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে’ পঙ্ক্তি যে বাংলা-প্রীতির কথা বলে, মায়ের ‘বন্দনা’ ও ‘অরূপের রূপ’-এর প্রকৃতিমুগ্ধতার সঙ্গে তার নিকট আত্মীয়তা অনুভব করা যায়। তবে দুজনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। মায়ের প্রকৃতি ঈশ্বরের স্বরূপ, ছেলের প্রকৃতি নিজেই এক স্বতন্ত্র অস্তিত্ব।
মায়ের সাহিত্যিক সম্ভাবনা পূর্ণতা পেল না বলে জীবনানন্দের আক্ষেপ স্পষ্ট। তিনি লিখেছেন, খুব বড় সংসারে এসে পড়েছিলেন মা। সেখানে শিক্ষার আবহ ছিল বটে, কিন্তু দিনরাতের অবিশ্রান্ত কাজের ফাঁকে লেখার সময় করা সেকালের অসচ্ছল সংসারের একজন স্ত্রীলোকের পক্ষে শেষ পর্যন্ত সম্ভব হলো না। মা আরও লিখলে বাংলা সাহিত্যকে বিশেষ কিছু দিয়ে যেতে পারতেন, এমন বিশ্বাসও তার ছিল। মা নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন, কোনো প্রকাশ্য পুরস্কার নিতে যাননি। জীবনানন্দের কথায়, যে সাহিত্যিক গরিমা তার প্রাপ্য ছিল, তাকে তিনি অন্তর্দমিত করে রাখলেন।
এখানেই কুসুমকুমারীর জীবনের বড় প্রশ্নটি ধরা পড়ে। যে সমাজ একজন প্রতিভাময়ী নারীকে গৃহকর্মের অন্তহীন বৃত্তে আবদ্ধ রাখে, সে সমাজ কি হারায়? কুসুমকুমারী হয়তো নিজের ভূমিকায় তৃপ্ত ছিলেন, কিন্তু আমাদের হারানোর হিসাব আলাদা। আমরা হারিয়েছি এমন এক কবিকে, যার ‘স্বাভাবিক কবিমন’ প্রকাশের পূর্ণ সুযোগ পায়নি।
১৯৪৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর, ৭৩ বছর বয়সে, কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউর বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। দেশভাগের ঝড়ে বরিশালের সেই দাশ পরিবার তখন কলকাতায় স্থিত। ‘আদর্শ ছেলে’-র কবি বিদায় নিলেন তার জন্মভূমি থেকে বহু দূরে।
কুসুমকুমারীর জীবন আমাদের দ্বিমুখী শিক্ষা দেয়। একদিকে এক নারীর অদম্য সংকল্প। নিঃসম্বল পরিবারে জন্ম নিয়েও তিনি শিক্ষার আলোয় পৌঁছেছেন, সমাজসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, নারীদের পথ দেখিয়েছেন, কবিতায় সৃষ্টিশীল থেকেছেন। অন্যদিকে সেই সমাজের সীমাবদ্ধতা, যা এমন প্রতিভাকে পূর্ণ বিকাশের সুযোগ দেয়নি।
তার জন্মদিনে আমাদের করণীয় কেবল স্মরণ নয়। হারিয়ে যাওয়া লেখা খুঁজে বের করা, ছড়িয়ে থাকা কবিতা একত্র করে প্রকাশ করা, তার ভূমিকা নিয়ে গবেষণার পথ খোলা, এই কাজগুলো এখনো বাকি। জীবনানন্দ-চর্চার পাশে কুসুমকুমারী-চর্চাও সমান জরুরি, কারণ কবির নির্মাণে জননীর ভূমিকা না বুঝলে সেই চর্চা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
‘কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’, এই চরণ কুসুমকুমারী লিখেছিলেন একটি প্রজন্মকে উদ্দেশ করে। বিস্ময়করভাবে, তিনি নিজেই ছিলেন এর সবচেয়ে সার্থক দৃষ্টান্ত। তার সেই কাজের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়ার দায় এখন আমাদের।
কেকে/ এমএস