সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬,
১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: অনুসন্ধানে অবহেলার মাশুল দিচ্ছে দেশ      আমি মানুষ হত্যা করতে চাই না : ট্রাম্প      নতুন নীতিমালায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম চালু      মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি করতে চায় বাংলাদেশ      ঢাবিতে ভর্তি আবেদন ১১ নভেম্বর থেকে, পরীক্ষা শুরু ৫ ডিসেম্বর      সব বেসরকারি দাখিল-আলিম মাদ্রাসার অ্যাডহক কমিটি বাতিল      ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ল ৭০ টাকা      
বাতিঘর
সব্যসাচী লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ
খোলা কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৮ পিএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলা সাহিত্যের বিশ শতকের ষাট দশকের যে কয়েকজন লেখক নিজেদের বহুমাত্রিক প্রতিভা দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন, আবদুল মান্নান সৈয়দ তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য। কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, সমালোচক, নাট্যকার, সম্পাদক, গবেষক ও চিত্রশিল্পী- এতগুলো পরিচয় একই মানুষের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না। সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় তার সাবলীল বিচরণ এবং প্রতিটি ক্ষেত্রেই মৌলিক অবদান তাকে বাংলাদেশের সাহিত্যমহলে এক ব্যতিক্রমী স্থান দিয়েছে। 

জীবদ্দশায় তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দেড় শতাধিক ছাড়িয়ে যায়, যা এ সত্যকেই প্রমাণ করে যে সাহিত্যচর্চাই ছিল তার জীবনের একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। বাতিঘরের আজকের সংখ্যাটি সাজানো হয়েছে এই মহান কবিকে নিয়ে।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

আবদুল মান্নান সৈয়দের জন্মসূত্রে নাম ছিল সৈয়দ আবদুল মান্নান। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৩ সালের ৩ আগস্ট, অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার জালালপুর নামক একটি গ্রামে। তার জন্মকাল ছিল ভয়াবহ পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময়, যা তৎকালীন বাংলার সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক করুণ প্রতিচ্ছবি বহন করে। তার পিতা সৈয়দ এ. এম. বদরুদ্দোজা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী এবং মাতা কাজী আনোয়ারা মজিদ। ছয় ভাই ও চার বোনের এক বিশাল পরিবারে তিনি বেড়ে ওঠেন।

১৯৫০ সালে পশ্চিমবঙ্গে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে তার পিতা পরিবারসহ পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) চলে আসেন এবং ঢাকার গোপীবাগে বসতি স্থাপন করেন। এই দেশত্যাগ ও নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তার সাহিত্যকর্মে গভীর ছাপ রেখেছিল। বড় হয়ে তিনি বিবাহ করেন সায়রা সৈয়দ রানুকে এবং তাদের একমাত্র কন্যার নাম জিনান সৈয়দ শম্পা।

আবদুল মান্নান সৈয়দ ১৯৫৮ সালে ঢাকার নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা (মেট্রিকুলেশন) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর ঢাকা কলেজ থেকে কলা বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন ১৯৬০ সালে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৬৩ সালে স্নাতক ও ১৯৬৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

নিজের সাহিত্যজীবনের প্রস্তুতিপর্ব সম্পর্কে তিনি একবার আত্মকথনে বলেছিলেন যে তার জীবনে কাজী নজরুল ইসলামের মতোই একটি ‘লেটো পিরিয়ড’ ছিল- সপ্তম-অষ্টম শ্রেণি থেকে এমএ পাস করা পর্যন্ত সময়টাতে তিনি বিরামহীন লেখালেখি ও ছবি আঁকার চর্চা করতেন, যদিও তার কড়া বাবা তখন তার লেখা প্রকাশিত হতে দিতেন না। এই সময়টাতেই তিনি নিজেকে ক্রমাগত শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক করে তোলার চেষ্টা করেন। তিনি নিজেই ১৯৬৫ সালকে তার প্রকৃত সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশের বছর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

শিক্ষাজীবন শেষে আবদুল মান্নান সৈয়দ প্রথমে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি অধ্যাপনাকেই তার মূল জীবিকা হিসেবে বেছে নেন। তিনি সিলেটের বিখ্যাত এম. সি. কলেজ, ফরিদপুরের শেখ বোরহানুদ্দীন কলেজ এবং ঢাকার জগন্নাথ কলেজে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন। এছাড়া তিনি ডিসট্রিক্ট গেজেটিয়ার প্রণয়নের কাজেও দায়িত্ব পালন করেন।

ঢাকার জগন্নাথ কলেজে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করার পর ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এই পদে থাকাকালীন তাকে স্কলার-ইন-রেসিডেন্স পদমর্যাদায় নিয়োগ দিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংগ্রামী জীবনকে ভিত্তি করে একটি পূর্ণাঙ্গ নজরুল-জীবনী রচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পোয়েট ইন রেসিডেন্স’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন এবং উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিযুক্ত প্রথম ‘পোয়েট ইন রেসিডেন্স’।

সাহিত্যচর্চার সূচনা ও বৈশিষ্ট্য

তাকে বলা হয় ‘সব্যসাচী লেখক’ অর্থাৎ যিনি উভয় হাতে সমান দক্ষতায় লিখতে পারেন। বাংলা সাহিত্যের যে শাখায়ই তিনি হাত দিয়েছেন, সেখানেই সাফল্য ও কীর্তি অনায়াসে ধরা দিয়েছে। তার সমসাময়িক ও পরবর্তী প্রজন্মের লেখকদের মতে, বাংলাদেশে তার মতো পরিশ্রমী লেখক বিরল। প্রতিটি রচনায় তিনি নিরীক্ষা চালাতেন, প্রচণ্ড তোলপাড় করা এক শক্তি নিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিপুল পরিমাণ কাজ করার পরও ভগ্নস্বাস্থ্য উপেক্ষা করে তিনি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আরও কাজের পরিকল্পনা করে গেছেন। তিনি বলেছিলেন যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস নিয়ে লেখার ইচ্ছা তার ছিল, ফররুখ আহমদকে তিনি একজন বিরাট কবি মনে করতেন এবং কবি জসীমউদ্দীনের ওপর কাজ করতে না পারাকে তিনি নিজের একটি বড় আক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 

জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে যে গভীর গবেষণা তিনি করেছিলেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়েও অনুরূপ কাজ করা উচিত ছিল বলে তিনি মনে করতেন। তার আত্মজৈবনিক রচনাগুলোতে এক গভীর বিষাদের সুর লক্ষ করা যায়- নিজের তুলনারহিত সৃজনক্ষমতার যথাযথ স্বীকৃতি জীবদ্দশায় না পাওয়ার এক ধরনের অভিমান তার লেখায় বারবার ফুটে উঠেছে। স্বীয় রাজনৈতিক উদারনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তাকে প্রায়ই রাষ্ট্রীয় উপেক্ষার শিকার হতে হয়েছে বলেও সাহিত্য-সমালোচকরা মনে করেন।

কাব্যসাধনা

আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহিত্যজীবনের সূচনা কবিতা দিয়েই। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন ইত্তেফাক পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে ‘সোনার হরিণ’ শিরোনামে তার একটি কবিতা প্রকাশিত হয়, যাকে তার কাব্যজীবনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে বাংলা কবিতায় তার প্রকৃত প্রতিষ্ঠা ঘটে ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে।

ষাটের দশকের আধুনিকতাবাদী কবিদের মধ্যে আবদুল মান্নান সৈয়দ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম। তিনি সেই কবি যিনি সমকালীন কাব্যরুচিকে পরিবর্তনের অভিপ্রায়ে পরাবাস্তববাদের (সুররিয়ালিজম) শরণাপন্ন হয়েছিলেন এবং এভাবেই নিজের কণ্ঠস্বরকে অনন্য করে তুলেছিলেন। বাংলা কবিতায় তিনি যুক্ত করেছিলেন পরাবাস্তববাদী এক নতুন দিগন্ত, যা তার পূর্বসূরিদের থেকে তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথের যাত্রী করে তুলেছিল।

তার কাব্যশৈলীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো আধুনিকতা ও নন্দনতত্ত্বের বহুমাত্রিক প্রয়োগ। প্রতীক-পরাবাস্তব থেকে শুরু করে সহজ-সরল ধর্মীয় ভাবধারার কবিতা পর্যন্ত, অক্ষরবৃত্ত-মাত্রাবৃত্ত ছন্দ থেকে সনেট ও টানাগদ্য পর্যন্ত প্রায় সর্বধরনের কাব্যআঙ্গিকে তিনি নিরীক্ষা চালিয়েছেন। নিজের কাব্যযাত্রা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন যে কবিতায় তিনি চিরকাল ভ্রাম্যমাণ থেকেছেন প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে কবিতা লিখলেও তার মধ্যে যে রূপান্তর ঘটেছে তাতে তিনি কখনো বাধা দেননি এবং জোর করে কখনো কবিতা লেখেননি। তার ভাষায়, কবিতা তিনি তখনই লিখতেন যখন কবিতা নিজে এসে তার ওষ্ঠ চুম্বন করত।

তার কাব্যজীবনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ সময় ছিল আশির দশক, যে সময়ে তার ছয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। জীবদ্দশায় তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মোট সংখ্যা একুশ। উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ (১৯৬৭); জ্যোৎস্না রৌদ্রের চিকিৎসা (১৯৬৯); ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ (১৯৭৪); পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি (১৯৮৩); কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড (১৯৮২); পরাবাস্তব কবিতা (১৯৮৪); মাছ সিরিজ (১৯৮৪); সব প্রশংসা তার (১৯৯৩); আমার সনেট; নির্বাচিত কবিতা (২০০১)

‘নির্বাচিত কবিতা’ সংকলনগ্রন্থে তার সামগ্রিক কাব্যসত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। তার কবিতায় বারবার ঘুরেফিরে এসেছে যে অভিপ্রায়টি তা হলো ১৯৩০-এর দশকের কবিদের প্রভাবমুক্ত হয়ে বাংলা আধুনিক কবিতায় সম্পূর্ণ নতুন এক দিগন্ত সৃষ্টি করা।

কথাসাহিত্য : উপন্যাস ও ছোটগল্প
 
কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্যেও আবদুল মান্নান সৈয়দ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে গেছেন। ষাটের দশকের গল্পকারদের মধ্যে তাকে সবচেয়ে বেশি প্রাতিস্বিকতাবিলাসী শিল্পী বলে মনে করা হয়। আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতাকে গল্পের ভাষ্যে রূপান্তরিত করায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। বিষয়বস্তু ও প্রকরণগত অভিনবত্বে তার গল্পসাহিত্য এক বিশিষ্ট স্থান দাবি করে। তার গল্প-উপন্যাসে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে এবং প্রতীকী ও পরাবাস্তববাদী উপস্থাপনা তার ছোটগল্পের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত।

তার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সত্যের মতো বদমাশ’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে। এই গ্রন্থটি তৎকালীন সরকার কর্তৃক অশ্লীলতার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল, যা তার সাহিত্যিক সাহস ও পরীক্ষামূলক মানসিকতার একটি বড় প্রমাণ। এই গল্পগ্রন্থের নামগল্প ‘সত্যের মতো বদমাশ’ একটি কিশোরের মেলায় গিয়ে জীবনের জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান।

তার উল্লেখযোগ্য ছোটগল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে

সত্যের মতো বদমাশ (১৯৬৮), চলো যাই পরোক্ষে, মৃত্যুর অধিক লাল ক্ষুধা, নেকড়ে হায়েনা, তিন পরী
উপন্যাসের ক্ষেত্রেও তার অবদান কম উল্লেখযোগ্য নয়। তার সবচেয়ে বেশি আলোচিত দুটি উপন্যাস হলো ‘পরিপ্রেক্ষিতের দাস-দাসী’ এবং ‘অ-তে অজগর’ (১৯৮২)। এছাড়া তার অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে কলকাতা (১৯৮০), ক্ষুধা প্রেম আগুন (১৯৯৪) পোড়ামাটির কাজ, হে সংসার হে লতা তার উপন্যাস ও ছোটগল্পের ভাষা উপমাবহুল এবং চলচ্চিত্রময় দৃশ্যকল্পে সমৃদ্ধ বলে সমালোচকরা মনে করেন। ঘটনার বিবরণে চারপাশের সমাজবাস্তবতার স্পর্শ তার রচনাগুলোকে একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।

সাহিত্য-সমালোচনা : তার সবচেয়ে খ্যাতিমান পরিচয়

কবিতা কিংবা কথাসাহিত্যের চেয়েও আবদুল মান্নান সৈয়দ সাহিত্য-সমালোচক হিসেবে অধিকতর খ্যাতিমান। প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি নিরলসভাবে সাহিত্য-সমালোচনার ক্ষেত্রে কাজ করে বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যকে একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তার সমালোচনা সবসময়ই নিবিড় গবেষণার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং সমালোচনার জন্য তিনি নিজস্ব এক ধরনের ভাষা আবিষ্কার করেছিলেন, যা প্রায়শই দুর্জ্ঞেয় ও দুরতিক্রম্য।

তার প্রথম প্রবন্ধ ‘কথাসাহিত্য প্রাসঙ্গিক’ শিরোনামে সাম্প্রতিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৩ সালে। প্রথম গ্রন্থালোচনা প্রকাশ পায় সমকাল পত্রিকায়। তার প্রবন্ধ রচনার বিষয় নির্বাচনে মূলত নন্দনতত্ত্বের বিভিন্ন শাখা তাকে আকৃষ্ট করলেও, কবি ও কবিতা এবং কাব্য-আঙ্গিক ছিল তার একান্ত মনোযোগের ক্ষেত্র। অনেক ক্ষেত্রে তার প্রবন্ধে যুক্তি-জ্ঞান-অভিজ্ঞতার চেয়ে কবি-কল্পনাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে বলে সমালোচকরা মনে করেন।

তার উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ ও সমালোচনাগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘শুদ্ধতম কবি’, ‘করতলে মহাদেশ’, ‘দশ দিগন্তের দ্রষ্টা’, ‘বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা’, ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’, ‘আমার বিশ্বাস’ এবং ‘ছন্দ’। ‘ষাটের কাব্য-লক্ষণ’ প্রবন্ধটিকে তার গদ্যভাষার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। ষাটের দশকের প্রাবন্ধিকদের মধ্যে সুগভীর শিল্প-এষণা, নন্দনতাত্ত্বিক ব্যুৎপত্তি এবং সাহিত্যচর্চায় প্রশ্নাতীত নিষ্ঠা তাকে একটি স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

জীবনানন্দ ও নজরুল চর্চা

আধুনিক বাংলা কবিতার পথিকৃৎ ও প্রধানতম কবি জীবনানন্দ দাশের ওপর তার গবেষণাকর্ম বাংলা সাহিত্যে অনন্য এক অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। ‘শুদ্ধতম কবি’ গ্রন্থটি জীবনানন্দ দাশ বিষয়ে তার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আলোচনাগ্রন্থ। এক সময় তিনি প্রায় একাকীই জীবনানন্দ দাশ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে গিয়েছেন এবং জীবনানন্দের বহু অগ্রন্থিত কবিতা তিনিই প্রথম সংকলিত করে প্রকাশ করেছিলেন, যা দুই বাংলার জীবনানন্দ-চর্চাকারীদের গভীরভাবে উদ্দীপিত করেছিল।
 
জীবনানন্দ দাশের কবিতা, গল্প ও পত্রাবলী সংগ্রন্থিত করে তিনি এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এবং তার জীবনানন্দ পাঠকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে গণ্য করা হয়। জীবনানন্দ-বিষয়ক তার গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘শুদ্ধতম কবি’ (১৯৭২), ‘জীবনানন্দ’ (১৯৮৪), ‘জীবনানন্দ দাশ’ (১৯৯৩), ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (১৯৮৬), ‘জীবনানন্দ দাশের পত্রাবলী’ (১৯৮৭) এবং ‘জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ গল্প’ (১৯৮৯)।

কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়েও আবদুল মান্নান সৈয়দের গবেষণা উল্লেখযোগ্য। কবি মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ এবং প্রাবন্ধিক শাহাবুদ্দীন আহমদের গবেষণা দ্বারা তিনি নজরুল চর্চায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তার ‘নজরুল ইসলাম : কবি ও কবিতা’ গ্রন্থটি নজরুল-গবেষণার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাকে একটি পূর্ণাঙ্গ নজরুল-জীবনী রচনার গুরুদায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল।

নাট্যসাহিত্য ও গ্রন্থ সম্পাদনা 

আবদুল মান্নান সৈয়দ শুধু কবিতা ও কথাসাহিত্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, নাটকের ক্ষেত্রেও তার কলম সমান সচল ছিল। তিনি কাব্যনাট্য, প্রহসন, একাঙ্ক নাটক, শ্রুতিনাটক, পূর্ণাঙ্গ নাটক এবং অনুবাদ নাটক- সবক্ষেত্রেই লিখেছেন। ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি থেকে তার ‘নাট্যগুচ্ছ’ প্রকাশিত হয় এবং ২০০৯ সালে তার নাট্যধর্মী সকল লেখার সংকলন ‘নাট্যসমগ্র’ প্রকাশ পায়। এছাড়া তিনি নিজের কিছু ছোটগল্পের নাট্যরূপও দিয়েছেন।

তার প্রকাশিত কাব্যনাট্যের সংখ্যা ছয়টি- বিশ্বাসের তরু, জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা, ঈশ্বরপ্রাপ্তির ছোট্ট গাথা, চাকা (১৯৮৫), কবি ও অন্যেরা (১৯৯৬) এবং আটতলার ওপরে। এই কাব্যনাট্যগুলোর চরিত্র ও সংলাপ কাব্যিক সুষমায় ভরপুর, আকারে ছোট হলেও ভাবগাম্ভীর্যে সমৃদ্ধ। যদিও নাট্যকার হিসেবে সৈয়দ শামসুল হকের মতো তার খ্যাতি ব্যাপক প্রচার পায়নি, তবু কাব্যনাট্যকার হিসেবে তার অবদান শ্রদ্ধার দাবি রাখে বলে সাহিত্য-সমালোচকরা মনে করেন।

বিভিন্ন লেখক-সাহিত্যিকের রচনাসমগ্র সংকলন ও সম্পাদনার কাজে আবদুল মান্নান সৈয়দ অতুলনীয় ধৈর্য ও পরিশ্রমের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তার সম্পাদিত ও গ্রন্থনাকৃত গ্রন্থগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জীবনানন্দ দাশের কবিতা, ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৭৫) ফররুখ রচনাবলী (প্রথম খণ্ড, ১৯৭৯), ইসলামী কবিতা : শাহাদাত হোসেন (১৯৮৩), বাংলাদেশের কবিতা (যৌথ, ১৯৮৮), বাংলাদেশের ছড়া (১৯৮৮) মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন স্মৃতি অ্যালবাম (১৯৮৮); সমর সেনের নির্বাচিত কবিতা (১৯৮৯), মোহিতলাল মজুমদারের নির্বাচিত কবিতা (১৯৮৯), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সুনির্বাচিত কবিতা (১৯৯০), বুদ্ধদেব বসুর সুনির্বাচিত কবিতা (১৯৯০) মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী রচনাবলী (দুই খণ্ড, ১৯৯০ ও ১৯৯২), মাইকেল মধুসূদন দত্ত: শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯২) কমরেড মোজাফফর আহমদের পত্রাবলী।

এছাড়া তিনি কবি আবিদ আজাদ সম্পাদিত সাহিত্য সাময়িকী ‘শিল্পতরু’-র উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবেও দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময় নবীন ও প্রবীণ সব কবি-সাহিত্যিকের রচনাকে তিনি সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেন, এবং তার সম্পাদনার মাধ্যমে শিল্পতরু আশির দশকের শেষভাগে একটি মর্যাদাবান সাহিত্যপত্রে পরিণত হয়েছিল।

আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহিত্যকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অনুবাদ সাহিত্য। তিনি ১৯৭০ সালে ‘মাতাল মানচিত্র’ শিরোনামে একটি অনুবাদ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন, যেখানে বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন কবিতা তিনি বাংলায় রূপান্তরিত করেন। বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে তার ছিল গভীর ও অগাধ জ্ঞান, যা তার অনুবাদকর্মে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। নাটকের ক্ষেত্রেও তিনি অনুবাদ একাঙ্ক নাটক রচনা করেছেন, যা তার নাট্যসংকলনগুলোর অন্তর্ভুক্ত।

জীবনীগ্রন্থ রচনাতেও আবদুল মান্নান সৈয়দের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাংলা সাহিত্যিক ও ব্যক্তিত্বের জীবনী রচনা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে নজরুল ইসলাম : কবি ও কবিতা, বেগম রোকেয়া, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সৈয়দ মুর্তজা আলী, ফররুখ আহমদ, শাহাদাত হোসেন, জীবনানন্দ দাশ, প্রবোধচন্দ্র সেন, আবদুল গণি হাজারী তার স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থের মধ্যে ‘ভেসেছিলাম ভাঙা ভেলায়’ এবং ‘প্রণীত জীবন’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া গবেষণাগ্রন্থ হিসেবে ‘কালান্তরের যাত্রী’ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা।

গদ্যভাষার বৈশিষ্ট্য

আবদুল মান্নান সৈয়দ তার নিজস্ব প্রকাশরীতির জন্য একটি বিশেষ ধরনের গদ্যভাষা আবিষ্কার করেছিলেন। তার বাক্যে পদসংস্থাপনার ক্রম ছিল অভিনব এবং সমাসবদ্ধ শব্দের ব্যবহার ছিল অকাতর, ফলে তার ভাষা কিছুটা জটিল ও দুর্বোধ্য মনে হলেও তা প্রকাশক্ষমতায় ছিল অত্যন্ত ঋদ্ধ। জীবনের শেষভাগে এসে তিনি অপেক্ষাকৃত সহজ-সরল ভাষায় লিখতে শুরু করেন, যদিও প্রচুর সমাসবদ্ধ শব্দ সৃষ্টি ও ব্যবহারের এই বৈশিষ্ট্য তার গদ্যরীতির একটি স্বতন্ত্র পরিচয় হিসেবেই থেকে গেছে।

শৈশব থেকেই আবদুল মান্নান সৈয়দ ছবি আঁকতেন এবং ষাটের দশকে তিনি বেশ কিছু চিত্রকর্ম তৈরি করেছিলেন, যখন তিনি ‘অশোক সৈয়দ’ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তবে দীর্ঘকাল তার এই চিত্রকর পরিচয়টি প্রায় বিস্মৃত ছিল। ২০০৮ সালের আগস্ট মাসে খেয়া সাময়িকীর ২৫তম বর্ষের প্রথম সংখ্যায় তিন-চার দশকের ব্যবধানে তার আঁকা ছবি প্রকাশিত হলে তার চিত্রকর পরিচয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

দেড় শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবদ্দশায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তার উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননাগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১); আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১); একুশে পদক নজরুল পুরস্কার, পশ্চিমবঙ্গ (১৯৯৮); নজরুল পদক (২০০১); কবি তালিম হোসেন পুরস্কার (২০০০); লেখিকা সংঘ পুরস্কার (২০০০) অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (২০০২) ।

এত পুরস্কার ও সম্মাননা পাওয়া সত্ত্বেও সমালোচকদের মতে, তার তুলনারহিত সৃজনশক্তির যথাযথ মূল্যায়ন তার জীবদ্দশায় পুরোপুরি হয়নি। স্বীয় রাজনৈতিক উদারনৈতিক বিশ্বাসের কারণে তিনি প্রায়ই রাষ্ট্রীয় অবহেলার শিকার হয়েছেন বলে অনেকে মনে করেন।

শুদ্ধতার সাধক

আবদুল মান্নান সৈয়দ জীবনানন্দ দাশকে ‘শুদ্ধতম কবি’ আখ্যা দিয়েছিলেন, আর নিজের জীবনেও তিনি ছিলেন এক প্রকৃত ‘শুদ্ধতার সাধক’। দীর্ঘ, সুঠাম দেহাবয়ব এবং কাঁধের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া চুলের গুচ্ছ নিয়ে তিনি ছিলেন সুদর্শন পুরুষ। একদিকে তিনি ছিলেন পৌরুষদীপ্ত ও ব্যক্তিত্বময়, অন্যদিকে সদালাপী ও সদা হাস্যময়। তবে অন্তরে ছিল তীব্র এক অভিমান। কথার ফাঁকে কৌতুক করা ছিল তার সহজাত অভ্যাস। স্বভাবে অনেকটা নির্জনপ্রিয় হলেও আড্ডার প্রতি ছিল তার গভীর ভালোবাসা, তবে পড়াশোনা ও লেখালেখির ব্যাপারে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও ছাড় দিতেন না।

জীবনের শেষদিকে দুইবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তার জীবনীশক্তি অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল এবং তার অস্তিত্বে জড়িয়ে গিয়েছিল এক অনপনেয় বিষণ্নতা। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তিনি নিজের জীবনদর্শনের পুনর্মূল্যায়ন করে বলেছিলেন যে দ্বিতীয়বার হৃদরোগের পর দীর্ঘকাল শয্যাশায়ী থেকে তিনি তার চারপাশের সাধারণ মানুষদের পাড়ার মানুষ, বাজারের লোকজন- নতুন করে চিনতে পেরেছিলেন এবং উপলব্ধি করেছিলেন যে যাদের ওপর নির্ভর করে তার জীবন চলেছে, তাদের জন্য তিনি বিশেষ কিছু করেননি। এই আত্মজিজ্ঞাসা তার মানবিক গভীরতারই পরিচায়ক। 

দীর্ঘদিন ধরে আবদুল মান্নান সৈয়দ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে ভুগছিলেন। ২০১০ সালের ২৭ আগস্ট চ্যানেল আই টেলিভিশনে আয়োজিত একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং নিকটস্থ ঢাকা মেট্রোপলিটন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এরপর থেকে তিনি বাসাতেই অবস্থান করছিলেন। অবশেষে ২০১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইফতারির কিছু আগে ঘুমের মধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বাসার কাছেই ল্যাবএইড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসকরা তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

তার মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষণ করা হয়। পরদিন তার বাসস্থানের কাছেই গ্রিন রোড মসজিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তার লাশ বাংলা একাডেমিতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নজরুল মঞ্চে রাখা হয়, যেখানে দেশের কবি-সাহিত্যিকসহ সর্বস্তরের মানুষ তাকে শ্রদ্ধা জানান। বাংলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। বাংলা একাডেমিতে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন কবি সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সৈয়দ আনোয়ারা হক, বেলাল চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, রবিউল হুসাইন, হাসান হাফিজ, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, রেজাউদ্দিন স্টালিন, রামেন্দু মজুমদার, আতাউর রহমানসহ অসংখ্য গুণীজন। তৃতীয় ও সর্বশেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জোহরের নামাজের পরপরই। এরপর তার মরদেহ আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

তার মৃত্যুতে সমকালীন বাংলা সাহিত্য এক অপূরণীয় শূন্যতায় নিমজ্জিত হয় বলে সাহিত্যমহল মনে করে এমন একটি সংকট যা দীর্ঘকাল ধরে অনুভূত হবে।

আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহিত্যজীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত সব্যসাচী লেখক—কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, সমালোচনা, জীবনী, অনুবাদ এবং সম্পাদনা সাহিত্যের প্রতিটি শাখাতেই তার অবদান স্মরণীয়। জীবনানন্দ দাশ ও কাজী নজরুল ইসলামের ওপর তার গবেষণাকর্ম বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী গুরুত্ব বহন করবে। 

পরাবাস্তববাদী কবি হিসেবে বাংলা কবিতায় তিনি যে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিলেন, তা ষাটের দশকের কবিতার ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হয়ে আছে। যদিও জীবদ্দশায় তার প্রতিভার পূর্ণ স্বীকৃতি সবসময় মেলেনি, মৃত্যুর পরও তার রচনাসম্ভার বাংলা সাহিত্যের পাঠক ও গবেষকদের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক এবং অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে আছে। আবদুল মান্নান সৈয়দ ছিলেন প্রকৃত অর্থেই ‘আপাদমস্তক একজন কবি, সাহিত্যকর্মী’ যার সৃষ্টিশীলতা ও সাধনা আগামী প্রজন্মের কাছেও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close