সৈয়দ সামসুল হক ষাট দশকেরও বেশি সময়জুড়ে বিস্তৃত তার সৃজনশীল যাত্রায় তিনি কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, কাব্যনাট্য, চলচ্চিত্র, চিত্রনাট্য, গান ও কলামের প্রতিটি ক্ষেত্রে রেখে গেছেন গভীর ও অমর স্বাক্ষর। মাত্র এগারো বছর বয়সে কবিতার প্রথম পঙ্ক্তি রচনার মধ্য দিয়ে সূচিত তার এই সাহিত্যসংগ্রাম প্রথাগত শিক্ষার সীমানা ছাড়িয়ে এক অনবদ্য শিল্পযাত্রায় রূপ নেয়।
‘পরানের গহীন ভিতর’-এর আঞ্চলিক কাব্যভাষা থেকে শুরু করে ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ ও ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’-এর মতো কালজয়ী কাব্যনাট্য কিংবা ‘খেলারাম খেলে যা’ ও ‘নিষিদ্ধ লোবান’-এর মতো মনস্তাত্ত্বিক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস— সবখানেই তিনি বাঙালি চেতনা ও মানব অস্তিত্বের জটিলতাকে অসাধারণ মুন্সিয়ানায় ফুটিয়ে তুলেছেন। সৃজনশীলতার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘সব্যসাচী লেখক’ উপাধিতে ভূষিত এই মহান সাহিত্যিক তার শাণিত ভাষা ও অনবদ্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের ভুবনে চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন।
শিকড় ও শৈশব
সৈয়দ হকের বাবা ছিলেন পেশায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক, আর দশজন বাবার মতোই তারও স্বপ্ন ছিল বড় ছেলেকে ডাক্তার বানানোর। এই স্বপ্নটা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না— নিজে যে পেশায় আছেন, সন্তানকেও সেই পথেই দেখতে চাওয়া অনেক বাবারই সাধারণ চাওয়া। কিন্তু শুধু সাধ থাকলেই তো হয় না, সাধ্যও থাকা চাই। চাইলেই যে কেউ ডাক্তার হতে পারে না, তার জন্য প্রয়োজন হয় মেধা ও যোগ্যতা। আর সেই যোগ্যতা এই কিশোরের মধ্যে যে ছিল না, তা নয়।
১৯৫০ সালে কুড়িগ্রাম হাই ইংলিশ স্কুল থেকে গণিতে লেটার মার্কসহ ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি— যা প্রমাণ করে দেয়, চাইলে ডাক্তারি পড়ার মেধা তার মধ্যে ছিলই। কিন্তু ভাগ্যের নিয়মেই হয়তো, এই সন্তানের ভবিতব্য লেখা হয়েছিল অন্য খাতায়। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পরপরই, যখন তার সমবয়সী ছাত্র-ছাত্রীরা ব্যস্ত পরবর্তী পড়াশোনার পরিকল্পনায়, তখন এই কিশোর নিজের ব্যক্তিগত খাতায় লিখে ফেলেন প্রায় দুইশত কবিতা। এই বিপুল সৃজনশীলতা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না— এর বীজ বোনা হয়েছিল আরও আগে, মাত্র এগারো-বারো বছর বয়সেই।
সেই ছেলেবেলার একটি বিশেষ স্মৃতি আজও সাহিত্যপ্রেমীদের মুখে মুখে ফেরে। টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা এক অসুস্থ কিশোর জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখছিল রান্নাঘরের পাশের সজনে গাছে বসা একটি টুকটুকে লাল পাখি। জ্বরে কাতর সেই শরীরের ভেতরেও যেন সৃজনশীলতার এক আশ্চর্য জাগরণ ঘটে গিয়েছিল— সেই দৃশ্য থেকেই জন্ম নেয় তার জীবনের প্রথম কবিতার পঙ্ক্তি, দুই লাইনের এক সরল অথচ গভীর রচনা। শিশুসুলভ সারল্যে লেখা এই পঙ্ক্তিদ্বয় আজ ইতিহাসের অংশ, কারণ এটিই ছিল ভবিষ্যতের এক মহৎ কাব্যযাত্রার সূচনাবিন্দু।
প্রায় একই সময়ে ফজলে লোহানি সম্পাদিত ‘অগত্যা’ নামের একটি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় তার লেখা একটি ছোটগল্প। বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিক পরিণত এই সাহিত্যকর্ম সম্ভবত তাকে নিজের ভেতরেই বুঝিয়ে দিয়েছিল, সাহিত্যচর্চাই তার প্রকৃত আশ্রয় এবং আনন্দের জায়গা। ডাক্তারি পড়ার প্রতি অনীহা থেকে হোক বা পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ থেকে মুক্তির তীব্র তাগিদে, ১৯৫১ সালে কিশোর সৈয়দ হক ঘর ছেড়ে পালিয়ে যান বহুদূরের শহর বোম্বেতে। এ ছিল এক দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত— কিশোর বয়সে পরিবার, পরিচিত পরিবেশ, সব কিছু ছেড়ে অজানার পথে পা বাড়ানো। সেখানে গিয়ে তিনি একটি চলচ্চিত্র প্রোডাকশন হাউজে সহকারী হিসেবে চাকরি নেন এবং প্রায় বছরখানেক সেখানে কাজ করেন। তবে সৃজনশীল ও অস্থির মনের পক্ষে বাঁধাধরা চাকরিতে দীর্ঘদিন স্থির থাকা কঠিন ব্যাপার। ১৯৫২ সালে তিনি আবার দেশে ফিরে আসেন এবং জগন্নাথ কলেজে মানবিক শাখায় ভর্তি হন। সেখান থেকে পাস করে ১৯৫৪ সালে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সময়টাই ছিল তার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের কাল। এখান থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় তার লেখালেখির যাত্রা— প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’ (১৯৫৯)। সাহিত্যের প্রতি এই টান এতাই প্রবল ছিল যে, একপর্যায়ে তিনি প্রথাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনাই ছেড়ে দেন। এই সিদ্ধান্তও তার জীবনের আরেকটি সাহসী পদক্ষেপ ছিল— নিশ্চিত ডিগ্রি ও ভবিষ্যতের চেয়ে সাহিত্যের অনিশ্চিত কিন্তু ভালোবাসার পথকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন।
তবে জীবন কখনো সরলরেখায় চলে না। বাবার মৃত্যুর পর সৈয়দ হক পড়েন তীব্র অর্থকষ্টে। পরিবারের দায়িত্ব আর নিজের জীবিকার প্রশ্ন— দুটোই তখন তার সামনে বড় হয়ে দাঁড়ায়। এই কঠিন বাস্তবতা মোকাবিলা করতেই তিনি হাত দেন চিত্রনাট্য রচনায়, যা তার কাছে ছিল অপেক্ষাকৃত দ্রুত আয়ের একটি পথ। ১৯৫৯ সালে ‘মাটির পাহাড়’ চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য দিয়ে শুরু হয় সেই অধ্যায়, যা পরবর্তী সময়ে তাকে এনে দেয় জাতীয় পুরস্কারসহ ব্যাপক পরিচিতি ও আর্থিক স্বচ্ছলতা। এভাবেই এক কুড়িগ্রামের কিশোর, যার ডাক্তার হওয়ার কথা ছিল, ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য বহুমুখী কারিগর— যার হাতের ছোঁয়ায় সমৃদ্ধ হয়েছে কবিতা, গদ্য, নাটক, চলচ্চিত্র ও সাংবাদিকতা।
কবিতা— নিশ্বাসের মতো স্বাভাবিক
সৈয়দ শামসুল হক নিজেই একবার বলেছিলেন, কবিতা তার কাছে নিশ্বাসের মতো স্বাভাবিক, আর গদ্য তার পরিশ্রমের ফসল। এই উক্তিটিই বলে দেয়, সাহিত্যের সব শাখায় সমান দক্ষতা দেখালেও কবিতার প্রতি তার অন্তরের টান ছিল সবচেয়ে গভীর ও সহজাত। তার নিজের ভাষায়, আরেকটি জীবন পেলে তিনি শুধু কবিতাই লিখতেন— এই একটি বাক্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়, বাকি সব শাখায় সাফল্য অর্জন করলেও তার হৃদয়ের প্রকৃত আবাসস্থল ছিল কবিতাই।
তার আত্মস্বীকৃত প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একদা এক রাজা’ (কোথাও কোথাও ‘একদা এক রাজ্যে’ নামেও উল্লেখ পাওয়া যায়) প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে, যদিও এর আগে ১৯৫৭ সালে ‘বুনোবৃষ্টির গান’ নামে আরেকটি কাব্য সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশের কালানুক্রম বিবেচনা করলে দেখা যায়, সমকালীন অনেক প্রবীণ কবির চেয়েও তিনি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশে এগিয়ে ছিলেন।
এরপর একে একে প্রকাশিত হতে থাকে তার একের পর এক কাব্যগ্রন্থ— ‘বিরতিহীন উৎসব’ (১৯৬৯), ‘বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা’ (১৯৭০), ‘প্রতিধ্বনিগণ’ (১৯৭৩), ‘অপর পুরুষ’ (১৯৭৮), ‘পরানের গহীন ভিতর’ (১৯৮০), ‘রজ্জুপথে চলেছি’ (১৯৮৮), ‘বেজান শহরের জন্য কোরাস’ (১৯৮৯), ‘এক আশ্চর্য সংগমের স্মৃতি’ (১৯৮৯), ‘অগ্নি ও জলের কবিতা’ (১৯৮৯), ‘কাননে কাননে তোমারই সন্ধানে’ (১৯৯০), ‘আমি জন্মগ্রহণ করিনি’ (১৯৯০), ‘তোরাপের ভাই’ (১৯৯০), ‘নাভিমূলে ভস্মাধার’ (১৯৯০) —এভাবে অর্ধশতাধিক কাব্যগ্রন্থে সমৃদ্ধ হয়েছে তার কাব্যভান্ডার। এই বিপুল কাব্যসম্ভার বলে দেয়, একজন কবি হিসেবে তার সৃজনশীলতা কখনো স্তিমিত হয়নি, বরং প্রতিটি দশকেই তা নতুন নতুন রূপে বিকশিত হয়েছে।
তার কবিতার জগৎ ছিল বিচিত্র বিষয়ে ভরপুর এক গহন অরণ্যের মতো। নাগরিক মনস্তত্ত্ব থেকে গ্রাম্য লোকজ ঐতিহ্য, রাজনীতি-সচেতনতা থেকে প্রেম-প্রকৃতি, ব্যক্তিমানুষের নিঃসঙ্গতা থেকে সামষ্টিক সংগ্রাম— সবকিছুই তার কলমে জায়গা পেয়েছে অনায়াসে। তিনি আধুনিক কবিতার সেই ধারাকে ধারণ করেছিলেন, যেখানে ব্যক্তিমানুষের হাহাকার সামষ্টিক যন্ত্রণার সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। শব্দের শরীর নিয়ে তিনি যেভাবে নিপুণভাবে খেলতে জানতেন, তার প্রমাণ মেলে তার প্রায় প্রতিটি কাব্যগ্রন্থেই।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘পরানের গহীন ভিতর’ কাব্যগ্রন্থ, যেখানে তিনি কুড়িগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রচনা করেন একগুচ্ছ সনেট। এই সাহসী সাহিত্যিক পরীক্ষা প্রমাণ করে দেয়, ভাষার শুদ্ধতা কেবল প্রমিত রূপের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং আবেগের সততার ওপরই তা প্রকৃতপক্ষে দাঁড়িয়ে থাকে। আঞ্চলিক শব্দভাণ্ডারকে আধুনিক কাব্যকাঠামোয়, এমনকি সনেটের মতো কঠোর ফর্মের ভেতরেও স্থাপন করার এই প্রচেষ্টা বাংলা সাহিত্যে একধরনের বৈপ্লবিক দিগন্ত উন্মোচন করে। পরবর্তী সময়ে অনেক কবি তার এই পথ অনুসরণ করে নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষাকে কবিতায় স্থান দেওয়ার সাহস পেয়েছেন।
১৯৭০ সালে ‘বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা’র জন্য তিনি লাভ করেন আদমজী পুরস্কার। উল্লেখযোগ্য বিষয়, বৈশাখ ছিল তার সবচেয়ে প্রিয় মাস এবং গ্রীষ্ম ছিল প্রিয় ঋতু— এই ভালোবাসারই ফসল এই দীর্ঘ কবিতা, যা নিজেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশের প্রকৃতি ও ঋতুবৈচিত্র্য তার কবিতার এক বড় প্রেরণাসূত্র ছিল, যা তার রচনায় বারবার নতুন নতুন রূপকল্পের জন্ম দিয়েছে।
কবি হিসেবে তার একটি বড় স্বাতন্ত্র্য ছিল— তিনি সচেতনভাবে পাশ্চাত্য প্রভাব এড়িয়ে নিজস্ব একটি কাব্যজগৎ গড়ে তুলেছিলেন। তিনি নিজেই বলেছিলেন, কবিতার উপাদান সংগ্রহের জন্য তিনি ইউরোপের দ্বারস্থ হননি। সমষ্টি ও ব্যক্তিচৈতন্যের দ্বন্দ্ব-সমন্বয়ই ছিল তার কবিতার মূল সুর। তার কাব্যযাত্রার প্রারম্ভিককালে বাংলাদেশের নগর ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি কেবল উদীয়মান, কৃষিই তখন জনমানুষের উপার্জনের প্রধান অবলম্বন— এই সামাজিক বাস্তবতা তার কাব্যশিল্প গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
উপন্যাস, নাটক ও গদ্যের ভুবন
কবিতার পাশাপাশি উপন্যাসের বিশাল ক্যানভাসেও সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন সমান দক্ষ ও সাহসী। তার মোট উপন্যাসের সংখ্যা ৩৮টি— যা যে কোনো বিচারে বিপুল এক সৃষ্টিসম্ভার। ‘দেয়ালের দেশ’ দিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রায় তিনি বারবার প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন, জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটেননি, আবার নিছক অতি-গম্ভীর সাহিত্যচর্চাতেও নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরির চেষ্টা করেছিলেন তিনি, যেখানে জনপ্রিয়তা ও শিল্পমান একসঙ্গে পথ চলতে পারে।
ষাটের দশকে ‘পূর্বাণী’ ঈদ সংখ্যায় নিয়মিত প্রকাশিত হতো তার উপন্যাস, আর ‘এক মহিলার ছবি’, ‘অনুপম দিন’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’র মতো রচনা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে সাধারণ পাঠকমহলে। এই উপন্যাসগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি পাঠকের হৃদয়ে এক বিশেষ আসন তৈরি করে নিয়েছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে তার আরও গভীর ও জটিল রচনাগুলোর জন্য পাঠকপ্রস্তুতির কাজ করেছিল বলা যায়।
তবে তার সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত উপন্যাস নিঃসন্দেহে ‘খেলারাম খেলে যা’ (১৯৭৩)। প্রথমে গাজী শাহাবুদ্দিন সম্পাদিত ‘সচিত্র সন্ধানী’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার সময়ই এটি বিপুল আলোড়ন তোলে— মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পত্রিকাটির সব কপি বিক্রি হয়ে যায়, যা তখনকার সাহিত্যপত্রিকার জগতে ছিল এক বিরল ঘটনা। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে বই আকারে প্রকাশের পরও এর চাহিদা অক্ষুণ্ন থাকে, এবং প্রায় অর্ধশতাব্দী পরেও বইটির পুনর্মুদ্রণ অব্যাহত আছে— এই দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তাই প্রমাণ করে, উপন্যাসটি কেবল সাময়িক চাঞ্চল্য তৈরির জন্য লেখা হয়নি, বরং এর মধ্যে ছিল এক গভীর সাহিত্যিক মূল্য।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র বাবর আলীর মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন আধুনিক মানুষের ভেতরের এক গভীর শূন্যতা— অবদমিত কাম, লালসা আর অস্তিত্বের সংকটের নিপুণ ব্যবচ্ছেদ, যে শূন্যতা গ্রাস করে নিতে চায় চারপাশের সবকিছুকে। প্রকাশের সময় অশ্লীলতার অভিযোগ উঠলেও পরবর্তীকালে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
লেখক নিজে পরবর্তীতে এই বিতর্ক নিয়ে বলেছিলেন, এই উপন্যাসের জন্য তাকে অন্যান্য রচনার তুলনায় অনেক বেশি জবাবদিহি করতে হয়েছে, এমনকি রচনার প্রায় কুড়ি বছর পরেও। তিনি নিজে কখনো এ নিয়ে লজ্জিত হননি— বরং তার ভাষায়, তিনি লজ্জিত ছিলেন তাদের জন্য যারা উপন্যাসের নেপথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, বাবর আলীর বোনকে সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে কেবল উপরিতলের চাঞ্চল্যকর অংশটুকু নিয়েই ব্যস্ত থেকেছেন।
সমালোচক ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মূল্যায়নে, সৈয়দ হকের গদ্য ছিল ধারালো ছুরির মতো, যা এক আঘাতেই সত্যের গভীরে পৌঁছে যেত। তিনি ভাষাকে মেদহীন করেছিলেন এবং প্রতিটি বাক্যে সৃষ্টি করেছিলেন এক অন্তর্নিহিত গতিশীলতা, যা পাঠককে টেনে নিয়ে যেত গল্পের গভীরে। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে আছে ‘আয়না বিবির পালা’, ‘কালধর্ম’, ‘দূরত্ব’, ‘না যেয়ো না’, ‘এক মুঠো জন্মভূমি’, ‘নারীরা’, ‘গল্প কারো নয়’, ‘ক্ষুধাবৃত্তান্ত’ ইত্যাদি— প্রতিটি রচনাতেই ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক ও মানসিক বাস্তবতার এক নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে।
ছোটগল্পের ক্ষেত্রেও তার বিষয়বৈচিত্র্য ছিল বিস্ময়কর। ‘তাস’, ‘শীতলক্ষ্যা’, ‘রক্তগোলাপ’— এসব গল্পে মধ্যবিত্ত সমাজের ভণ্ডামি আর নিম্নবিত্তের জীবনসংগ্রাম জীবন্ত হয়ে উঠেছে। শুধু গল্প বলাই ছিল না তার উদ্দেশ্য, বরং গল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সময়ের নিষ্ঠুর হাসিটাকেও তিনি ফ্রেমবন্দী করতে চেয়েছেন। তার সাহিত্যে কুড়িগ্রামের আঞ্চলিক পটভূমি বারবার ফিরে এসেছে, যা তার রচনাকে একধরনের মাটির ঘ্রাণে সিক্ত রেখেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, বিশ্বজনীন হতে হলে নিজের শিকড়কে অস্বীকার করতে হয় না, বরং শিকড়ের গভীরে গিয়েই আকাশের বিশালতাকে স্পর্শ করা যায়।
নাট্যকার হিসেবেও সৈয়দ হক ছিলেন অনবদ্য, বলা যায় বাংলা মঞ্চনাটকের ইতিহাসে তিনি একাই একটি প্রতিষ্ঠান। বিশেষত কাব্যনাট্যের যে ধারা তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, রবীন্দ্রনাথের পর তা আর কেউ এত সার্থকভাবে করতে পারেননি বলে মনে করেন সমালোচকেরা। নাটক লেখার হাতেখড়ি হয়েছিল লন্ডনের বিবিসি বাংলায়, যেখানে তিনি প্রায় সাত বছর কাজ করেন— এই দীর্ঘ প্রবাসজীবন তার নাট্যভাষা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
তার দুটি নাটক— ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ (১৯৭৬) ও ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ (১৯৮২) বাংলা নাট্যসাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। প্রথমটিতে তিনি ধর্মীয় বিষয়ে মানুষের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারকে তুলে ধরেছেন, যুদ্ধের শেষ লগ্নে একটি গ্রামের মানুষের মনের দ্বিধা, ভয় এবং অবশেষে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে কাব্যিক সংলাপে বেঁধেছেন— যা আজও দর্শককে গভীরভাবে স্পর্শ করে।
আর দ্বিতীয়টিতে ১৭৮৩ সালের রংপুর অঞ্চলের কৃষক বিদ্রোহের নায়ক নূরলদীনকে ইতিহাসের ধূলিমলিন পাতা থেকে তুলে এনে সমকালীন আয়নায় দাঁড় করিয়েছেন। এই নাটক তৎকালীন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এক নতুন প্রেরণার সঞ্চার করেছিল। নাগরিক নাট্যদলের মঞ্চায়নে এই নাটকের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রখ্যাত অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর, যিনি সৈয়দ হকের নাট্যভাষা ও কাব্যময়তা সম্পর্কে অত্যন্ত উচ্চ প্রশংসা করেছেন— তার মতে, শব্দের ব্যবহার, রূপকল্প ও কাব্যময়তার সঙ্গে নাটকের দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে একসূত্রে গাঁথার যে কৃতিত্ব সৈয়দ হক দেখিয়েছেন, বাংলা নাটকে তা আর কেউ ঘটাতে পেরেছেন বলে তিনি মনে করেন না।
নাট্যকার আবদুল্লাহ আল মামুনের মতেও, সৈয়দ হকের নাটকের ছন্দ ও যতি অভিনেতাদের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ, কিন্তু সার্থকভাবে উতরে গেলে তা শিল্পের এক শিখর স্পর্শ করে। এ ছাড়া ‘ঈর্ষা’, ‘ম্যাকবেথ’-এর অনুবাদসহ আরও একাধিক নাটক তার কলম থেকে বেরিয়েছে।
চলচ্চিত্রের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। ‘বড় ভালো লোক ছিল’, ‘পুরস্কার’, ‘তোমার আমার’, ‘কাঁচ কাটা হীরে’সহ একাধিক ছবির চিত্রনাট্য, কাহিনি ও সংলাপ লিখেছেন তিনি। মজার বিষয় হলো, অনেক ছবিতেই তিনি একসঙ্গে চিত্রনাট্যকার, কাহিনিকার ও সংলাপ রচয়িতা— এই তিনটি ভূমিকাই পালন করেছেন। ‘বড় ভালো লোক ছিল’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার বিভাগে এবং ‘পুরস্কার’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচয়িতা বিভাগে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নেন।
গীতিকার হিসেবেও তিনি লিখেছেন অল্প কিছু গান, কিন্তু যা লিখেছেন তার অনেকগুলোই কালজয়ী হয়ে উঠেছে। ‘বড় ভালো লোক ছিল’ সিনেমায় অ্যান্ড্রু কিশোরের গাওয়া ‘হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস দম ফুরাইলেই ঠুস’ গানটা এতটাই জনপ্রিয় যে বাংলাদেশের কোনো প্রজন্মের মানুষেরই এই গানটি না শোনার কথা নয়। এ ছাড়া আশীর্বাদ সিনেমার ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’ গানটিকে বিবেচনা করা হয় দেশীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা রোমান্টিক গান হিসেবে।
এ ছাড়াও ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ সিনেমার ‘যার ছায়া পড়েছে’ কিংবা ‘এমন মজা হয় না, গায়ে শোনার গয়না’ শীর্ষক অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা তিনি। একটিমাত্র গানের চরণের মধ্য দিয়েই তিনি জীবনের নশ্বরতার দার্শনিক সত্যকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন, যা কোনো গম্ভীর প্রবন্ধের চেয়ে কম শক্তিশালী নয়।
কলাম লেখক হিসেবেও তিনি ছিলেন সুপ্রতিষ্ঠিত। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ‘মার্জিনে মন্তব্য’ শিরোনামে তিনি লেখালেখির কৌশল নিয়ে লিখতেন— বিদেশে এ ধরনের রচনা প্রচুর পাওয়া গেলেও বাংলাদেশে সেটাই ছিল প্রথম, এবং পরবর্তী প্রজন্মের বহু লেখক এ থেকে উপকৃত হয়েছেন। এ ছাড়া বিচিত্রায় তিনি ‘গল্পের কলকব্জা’ শিরোনামেও একটি কলাম লিখতেন। এই কলামগুলো পরবর্তীতে ২০১৪ সালে নান্দনিক প্রকাশনী থেকে ‘হৃৎকলমের টানে’ শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
এইভাবে কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, চলচ্চিত্র, গান ও কলাম—সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় সমান দক্ষতা ও দাপটের সঙ্গে বিচরণ করার কারণেই সৈয়দ শামসুল হককে অভিহিত করা হয় ‘সব্যসাচী লেখক’ হিসেবে। এই উপাধি মূলত মহাভারতের অর্জুনের দুই হাতে সমান দক্ষতার প্রতীক থেকে উৎসারিত, যা পরবর্তীতে হয়ে ওঠে যেকোনো ক্ষেত্রে সর্বাত্মক দক্ষতার সমার্থক শব্দ। ক্রিকেটে যেমন একজন ব্যাটসম্যান শুধু ব্যাটিং করেন আর বোলার শুধু বোলিং, কিন্তু যিনি দুটোই সমান দক্ষতায় করতে পারেন তাকে বলা হয় সব্যসাচী— তেমনি সাহিত্যের একাধিক শাখায় সমান পারদর্শিতা দেখানো সৈয়দ হককেও তাই বলা সংগত।
মুক্তিযুদ্ধ ও রাজনৈতিক চেতনা
সৈয়দ শামসুল হকের সাহিত্যিক সত্তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঊনিশশো একাত্তর সাল বাঙালির জীবনের একমাত্র মহাকাব্য। এই দৃঢ় বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেছে তার অসংখ্য রচনায়—কবিতা, উপন্যাস, নাটক প্রতিটি মাধ্যমেই তিনি বারবার ফিরে গেছেন এই একটি বছরের ঘটনাপ্রবাহে।
ষাটের দশকে বাঙালির রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম-সংঘবদ্ধতার অন্যতম কারণ ছিল সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অবস্থান। তাদের অংশগ্রহণের কারণেই ছয়দফার ভিত্তিতে বাঙালির অস্তিত্বের লড়াই হয়েছে এবং ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন সফল হয়েছে। কৃষক-শ্রমিক শ্রেণিকে বাদ দিয়ে এসব আন্দোলনের কথা কল্পনাই করা যেত না। সৈয়দ হক এই সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন, এবং তার কবিতায় এই জাগরণী চেতনার প্রতিফলন স্পষ্ট।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে-পরের টালমাটাল সময়ে তিনি ছিলেন ঢাকার বাসিন্দা। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস ছিল বাঙালির জন্য এক ঘোর সংকটকাল। পাকিস্তানিদের শোষণ ও অত্যাচার থেকে মুক্তির খোঁজে তখন উত্তাল গোটা দেশ, মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত রাজপথ। কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীরা তখন নিজ নিজ কলম দিয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করার কাজে ব্যস্ত। এই সময়েই তিনি লিখে ফেলেন ‘পহেলা মার্চ ১৯৭১’ কবিতা, যেখানে দেশমাতা আর স্বাধীনতার পতাকা কোটি কোটি প্রাণের জোয়ার হয়ে অভিন্নরূপে উদ্ভাসিত হয়। এই কবিতায় তিনি নিজের নিরস্ত্র অবস্থানকেও এক গভীর শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন— তার কাছে জীবনই সবচেয়ে বড় অস্ত্র, আর মায়ের মুখই সবচেয়ে সত্যিকারের পতাকা।
পঁচিশে মার্চের ভয়াল কালরাত্রির তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী—ঘুমন্ত মানুষের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের সেই ভয়াবহতা পরবর্তীতে তার কবিতায় গভীর বেদনা ও ক্ষোভ নিয়ে ফিরে এসেছে। ‘একাত্তরের পঁচিশে মার্চের অসমাপ্ত কবিতা’, ‘দুপুরে হঠাৎ কারফিউ’, ‘প্রেস রিপোর্টারকে’— এসব কবিতায় সেই রাতের বীভৎসতা এক চিত্ররূপময়তায় ভাস্বর হয়ে আছে। এই কবিতাগুলোতে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন— একটি মায়ের একটি সন্তান হারানো কি যথেষ্ট নয় মানুষের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য? সংখ্যার হিসাবে নয়, বরং একটি একটি মানুষের ক্ষতির মধ্য দিয়েই তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতাকে উপলব্ধি করাতে চেয়েছেন পাঠককে।
যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি প্রবাসে, বিলেতে অবস্থান করলেও দেশের সংকট তাকে কখনো ছেড়ে যায়নি, বরং দূরত্ব যেন তার উদ্বেগ ও যন্ত্রণাকে আরও তীব্র করে তুলেছিল। শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের যন্ত্রণা, বিশেষত প্রান্তিক কৃষকশ্রেণির দুর্দশা তাকে নিয়ত তাড়িত করেছে। এই সময়ের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি থেকেই রচিত হয় ‘প্রতিধ্বনিগণ’ কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতা, যেখানে সংকট ও সম্ভাবনার এক দ্বৈরথ ফুটে উঠেছে। এই কাব্যগ্রন্থে তিনি স্বদেশের ধানখেত থেকে প্রবাসের অমাবস্যার আগুনঘেরা বসতির দিকে যাত্রার এক প্রতীকী চিত্র এঁকেছেন— যা তার নিজের জীবনের প্রবাসযাপনের অভিজ্ঞতা এবং স্বদেশের প্রতি অবিচ্ছিন্ন টানের এক নিখুঁত রূপক।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক তার উপন্যাসগুলোও বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ‘নিষিদ্ধ লোবান’ (১৯৮১) মুক্তিযুদ্ধকালীন এক কিশোরী ও তার চারপাশের বিভীষিকার অসামান্য আখ্যান, যেখানে যুদ্ধের নৃশংসতার পাশাপাশি রক্তের সম্পর্কের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক সম্পর্কের জয়গানও উচ্চারিত হয়েছে। এই উপন্যাসের বিলকিস চরিত্রটি বাংলা সাহিত্যের এক অমর নারীচরিত্র হিসেবে বিবেচিত, যে পরিস্থিতির চাপে নিজের অস্তিত্ব রক্ষার চেয়ে বড় এক সত্যকে বেছে নেয়। ২০১১ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয় আলোচিত চলচ্চিত্র ‘গেরিলা’, যা নতুন প্রজন্মের কাছে সৈয়দ হকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যকে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলে। এ ছাড়া ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’, ‘নীল দংশন’, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’র মতো উপন্যাসেও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন তিনি— কোথাও সমাজ ও রাজনীতির জটিল সমীকরণ, কোথাও ব্যক্তিমানুষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব।
তবে সৈয়দ হকের রাজনৈতিক চেতনা কোনো নির্দিষ্ট দলীয় গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না— তা ছিল মূলত মানবতা ও অধিকার আদায়ের রাজনীতি। তার সাহিত্যে রাজনীতির ছোঁয়া তাত্ত্বিক তর্কে আটকে না থেকে হয়ে উঠেছে রক্ত-মাংসের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ। নূরলদীন, বিলকিস কিংবা বাবর আলীর মতো তার সৃষ্ট চরিত্ররা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অথবা নিজের অন্তর্গত এক অমোঘ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামরত। এই নিরন্তর লড়াই তার সাহিত্যকে দিয়েছে এক বিশেষ উচ্চতা ও প্রাসঙ্গিকতা, যা আজও বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় সমান প্রযোজ্য। তিনি মনে করতেন, লেখকের দায়বদ্ধতা কেবল শিল্পের কাছে নয়, বরং ইতিহাসের কাছেও। আর সেই দায় থেকেই তিনি একের পর এক সৃষ্টি করেছেন এমন সব সাহিত্যকর্ম, যা আজ আমাদের জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য দলিল হয়ে আছে।
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তার সম্পর্কের একটি বিশেষ স্মরণীয় অধ্যায় হলো বিবিসি বাংলায় সংবাদ পাঠকের ভূমিকা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক খবরটি তিনি নিজেই পাঠ করেছিলেন— এই মুহূর্তটিকেই তিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় কাজ হিসেবে বিবেচনা করতেন, সাহিত্যের এত বিপুল কীর্তির মধ্যেও। এই একটি স্বীকারোক্তিই বলে দেয়, একজন শিল্পী হিসেবে যত বড় অর্জনই তার থাকুক না কেন, একজন বাঙালি হিসেবে দেশের স্বাধীনতার সঙ্গে নিজের প্রত্যক্ষ সংযোগকেই তিনি সবচেয়ে মূল্যবান বলে মনে করতেন।
শেষ জীবন
সৈয়দ শামসুল হকের ব্যক্তিগত জীবনও ছিল সাহিত্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। তিনি বিয়ে করেন প্রথিতযশা লেখিকা ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সৈয়দা আনোয়ারা হককে। এই দম্পতির সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে ছিল। স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হক নিজেও ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক, যা তাদের দাম্পত্য জীবনকে এক বিশেষ সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক মাত্রা দিয়েছিল। জীবনের একেবারে শেষ পর্বে, রোগশয্যায় থেকেও, যতক্ষণ বাকশক্তি সচল ছিল, স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হকের সহযোগিতায় তিনি লিখে গেছেন কবিতা— যা প্রমাণ করে, সাহিত্যের প্রতি তার নিবেদন ছিল আক্ষরিক অর্থেই আমৃত্যু। এই দৃশ্য— মৃত্যুপথযাত্রী এক কবি তার জীবনসঙ্গীর সহায়তায় শেষ পঙক্তিগুলো রচনা করছেন— বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক গভীর মানবিক ও হৃদয়স্পর্শী অধ্যায় হয়ে থাকবে।
স্বীকৃতির দিক থেকে সৈয়দ হকের অর্জন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ব্যাপক। মাত্র ২৯ বছর বয়সে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন, যা আজও এই পুরস্কারপ্রাপ্ত সব সাহিত্যিকের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ বয়সে প্রাপ্তির রেকর্ড হিসেবে টিকে আছে। এই একটি তথ্যই বলে দেয়, কত অল্প বয়সেই তিনি নিজের প্রতিভার স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালে তিনি পান বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক, আর ২০০০ সালে পান স্বাধীনতা পুরস্কার।
এ ছাড়া বিভিন্ন চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য ও সংলাপের জন্য একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও তার ঝুলিতে যুক্ত হয়েছে। এই বিপুল স্বীকৃতির তালিকা প্রমাণ করে, রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েই তার অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করেছে, যদিও অনেক সমালোচকের মতে তার প্রকৃত সাহিত্যিক মূল্য এই পুরস্কারের সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি।
২০১৬ সালের ১৫ এপ্রিল ফুসফুসের সমস্যা নিয়ে তাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে ধরা পড়ে ফুসফুসে ক্যান্সার— একটি দুঃসংবাদ, যা তার অগণিত ভক্ত-পাঠককে গভীরভাবে মর্মাহত করেছিল।
কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি নেওয়ার পর ২ সেপ্টেম্বর তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়, যেন প্রিয় মাতৃভূমির মাটিতেই তিনি শেষ সময়টুকু কাটাতে পারেন। কিন্তু রোগের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়— ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মাত্র ৮১ বছরের জীবনে ৬২ বছর তিনি লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন— এক বিরল দীর্ঘ ও নিরবচ্ছিন্ন সাহিত্যযাত্রা, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে খুব কম লেখকের ভাগ্যেই জুটেছে।
মৃত্যুর পরও সৈয়দ শামসুল হকের প্রাসঙ্গিকতা কমেনি, বরং বহু ক্ষেত্রে তা বেড়েছে। বর্তমান সময়ের পরিচয়- সংকট ও অস্থিরতার মধ্যে দাঁড়িয়ে তার রচনা যেন এক ধরনের স্থিতধী পথনির্দেশক হয়ে ওঠে। ‘পরানের গহীন ভিতর’-এর কবিতাগুলো বিশ্বায়নের যুগেও আঞ্চলিকতাকে বিশ্বমানের শিল্পে রূপান্তরের পথ দেখায়, আর ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার প্রেরণা জোগায়। তার সৃষ্ট চরিত্ররা— নূরলদীন, বিলকিস, বাবর আলী— কেবল কাল্পনিক সত্তা নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি হয়ে চিরকালের জন্য বেঁচে থাকবে পাঠকের হৃদয়ে।
লেখক আনিসুল হক একবার মন্তব্য করেছিলেন, সৈয়দ হক যদি শুধু ‘পরানের গহীন ভিতর’ আর ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’— এই দুটি কাব্যগ্রন্থও লিখতেন, তাহলেই তা তাকে অমর করে রাখত। আবার শুধু ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ আর ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’— এই দুটি কাব্যনাট্যও যথেষ্ট ছিল বাংলা সাহিত্যে তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য। কিন্তু তার কবিতা, নাটক, উপন্যাস, গল্প, চিত্রনাট্য, গান ও কলাম— সবকিছু মিলিয়ে যে বিশাল ব্যক্তিত্ব দাঁড়িয়ে যায়, তা সত্যিকার অর্থেই তুলনারহিত।
সমালোচক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মূল্যায়নে, সৈয়দ হক এমন এক লেখক যিনি ভাষাকে বশ করতে জানতেন—তার লেখা যেমন সুশীল ও মার্জিত হতে পারত, তেমনি প্রয়োজনে হয়ে উঠত তীব্র ও ধারালো। কিন্তু পুরস্কারের চেয়ে বড় কথা হলো, তিনি সাধারণ পাঠকের হৃদয়ে যে স্থান করে নিয়েছেন, তা কোনো পদক বা সম্মাননা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। বিশেষ করে তরুণ লেখকদের কাছে তিনি ছিলেন এক অনুপ্রেরণার উৎস— তার ‘হৃৎকলমের টানে’ কলামটি কয়েক প্রজন্ম ধরে সৃজনশীল লেখকদের লেখার কৌশল ও শৈলী শিখিয়েছে।
কেকে/ এমএস