বাংলার পথে-প্রান্তরে যে নামটি কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে আছে, তিনি আবুল কাসেম ফজলুল হক। মানুষ তাঁকে ডাকত ‘শেরে বাংলা’ নামে, আর স্থানীয় সমর্থকদের কাছে তিনি ছিলেন আপন ‘হকসাব’। বালক বয়সে বই ছিঁড়ে ফেলা কিংবা কুমিরভরা খরস্রোতা নদী সাঁতরে পার হওয়ার গল্প লোকমুখে এখনো প্রচলিত। কিন্তু এসব কিংবদন্তি আর অর্ধসত্য গল্পের আড়ালে তাঁর আসল পরিচয়টি প্রায়ই চাপা পড়ে যায়। সেই পরিচয় একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর, দক্ষ আইনজীবীর, কৃষকের স্বার্থে লড়াকু সংগঠকের এবং প্রায় পাঁচ দশক ধরে উপমহাদেশের রাজনীতিতে সক্রিয় এক রাষ্ট্রনায়কের।
ফজলুল হকের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানে যে, ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের মধ্য দিয়ে তিনি দেশভাগের তাত্ত্বিক ভিত রচনার সঙ্গে জড়িয়ে যান। অথচ ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের চূড়ান্ত মুহূর্তে রাজনীতির মূল মঞ্চে তাঁকে প্রায় দেখাই যায়নি। ইতিহাসবিদদের মতে ইতিহাস তাঁকে যে ভূমিকায় মনে রেখেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁকে শেষ পর্যন্ত সেই ভূমিকায় থাকতে দেয়নি। এই লেখায় আমরা তাঁর শিক্ষাজীবন, কৃষক-প্রজা রাজনীতি, মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, লাহোর প্রস্তাব এবং পরবর্তী জীবনের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তাঁকে বোঝার চেষ্টা করব।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
ফজলুল হকের জন্ম ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর, বরিশালের বাকেরগঞ্জ জেলার সাতুরিয়া গ্রামে। বরিশাল জিলা স্কুলে তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়। পরে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন, যা তখন অবিভক্ত বাংলার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি।
শিক্ষাজীবনে তাঁর কৃতিত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। ১৮৯৪ সালে তিনি একই বছরে রসায়ন, গণিত ও পদার্থবিদ্যা, এই তিন বিষয়েই অনার্সসহ স্নাতক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। সেই সময়ের জন্য এটি ছিল বিরল দৃষ্টান্ত। এরপর ইংরেজি ভাষায় এমএ পড়া শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত গণিতশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন ১৮৯৬ সালে। বিজ্ঞান ও গণিতের এই বিশ্লেষণী প্রশিক্ষণ পরবর্তী জীবনে তাঁর রাজনৈতিক যুক্তি ও আইনি দক্ষতায় ছাপ ফেলেছিল বলে ধরে নেওয়া যায়।
এর পর তিনি আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং কলকাতার খ্যাতনামা আইনজীবী স্যার আশুতোষ মুখার্জির অধীনে শিক্ষানবিশ হন। দুই বছরের শিক্ষানবিশির পর কলকাতা হাইকোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন। তবে এক বছরের মাথায় পিতার মৃত্যু হলে তিনি বরিশালে ফিরে যান এবং সেখানকার আদালতে যোগ দেন।
১৯০৬ সালে ফজলুল হক আইন ব্যবসা ছেড়ে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে তাঁর বনিবনা হয়নি। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদে থেকে ১৯১১ সালে তিনি পদত্যাগ করেন এবং আবার কলকাতা হাইকোর্টে আইনের পেশায় ফিরে যান। ঔপনিবেশিক প্রশাসনের ভেতরে থেকে আপস করে চলার চেয়ে স্বাধীন পেশাকে বেছে নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত তাঁর চরিত্রের একটি দিক প্রকাশ করে। কলকাতা হাইকোর্টে তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রায় চল্লিশ বছর আইন প্র্যাকটিস করেছেন।
কলকাতার আইনপাড়ার এই খ্যাতিমান আইনজীবী রাজনীতিতেও দ্রুত রপ্ত হয়ে ওঠেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে কলকাতা ছিল বাংলার তো বটেই, সর্বভারতীয় রাজনীতিরও কেন্দ্রবিন্দু।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকার নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ বাহাদুর মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্স’ আহ্বান করেন। ঢাকার আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলন থেকেই জন্ম নেয় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। ফজলুল হক এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন এবং পরে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। একটি বর্ণনা অনুযায়ী ১৯১৬ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের শীর্ষ দায়িত্বেও ছিলেন। একই সঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল।
১৯১৬ সালে লখনৌতে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে যে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, তা ‘লখনৌ চুক্তি’ নামে পরিচিত। এই চুক্তির অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন ফজলুল হক। ওই অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীও। অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টার সঙ্গে ফজলুল হক গোড়া থেকেই যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী কালে তাঁর ওপর দ্বিজাতিতত্ত্বের কাণ্ডারি হওয়ার যে অভিযোগ বা কৃতিত্ব আরোপ করা হয়েছে, তাকে এই পটভূমির আলোকে দেখা জরুরি।
১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। এই পদে তিনিই ছিলেন প্রথম বাঙালি মুসলমান। এভাবে ধীরে ধীরে তিনি ভারতবর্ষের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হন।
রাজনীতির পথে
সর্বভারতীয় রাজনীতির মঞ্চে সক্রিয় থাকলেও ফজলুল হক ক্রমশ উপলব্ধি করছিলেন যে গ্রামবাংলার মানুষের মুক্তি কলকাতায় বসে সভা-সেমিনারে বক্তৃতার আগুন ঝরালে আসবে না। কৃষিভিত্তিক বাংলার প্রাণ ছিলেন সেই কৃষকেরা, যাঁরা রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলাতেন। অথচ তাঁদের প্রতিনিয়ত শোষণ করে ফুলে-ফেঁপে উঠছিল একদল জমিদার ও মহাজন। মুসলিম লীগের প্রথম সারির অনেক নেতা নিজেরাই জমিদারির ধারক ছিলেন। কাজেই তাঁরা জমিদারি উচ্ছেদ করে প্রজাদের মুক্তি দেবেন, এমন আশা করা ছিল কঠিন। ফজলুল হক বুঝলেন, এই লড়াইয়ে তাঁকে আলাদাভাবেই নামতে হবে।
বিভিন্ন জেলায় তখন প্রজাদের আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিচ্ছিন্ন সেই আন্দোলনগুলোকে সংগঠিত করে পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপনের কাজে হাত দিলেন তিনি। পূর্ব বাংলার অন্য নেতাদের থেকে তাঁর রাজনীতির মৌলিক পার্থক্য এখান থেকেই শুরু হয়।
১৯২১ সালে গৌরনদীতে প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকে সফল ও সংগঠিত করতে ফজলুল হক এক জেলা থেকে আরেক জেলায় ছুটে বেড়াতে থাকেন। ১৯২৬ সালে ঢাকার অদূরে মানিকগঞ্জে দেনার দায়ে কৃষকদের জমি কেড়ে নেন জমিদার ও মহাজনেরা। এমন ঘটনা তখনকার মানুষের কাছে নতুন ছিল না। কিন্তু দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ এবার বিক্ষোভের রূপ নেয়। এই অসন্তোষকে নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদের খাতে বইয়ে দিতে প্রজা সম্মেলন ডাকা হয়।
মানিকগঞ্জ মহকুমার ঘিওর হাটের সেই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় ফজলুল হককে। সেখান থেকেই তিনি অত্যাচারী মহাজনদের বিরুদ্ধে প্রকারান্তরে অসহযোগের ডাক দেন। তাঁর ব্যঙ্গাত্মক আহ্বান ছিল, জমি যখন কর্তারা নিয়েই নিয়েছেন, তখন তাঁরাই মাঠে নেমে লাঙল চষুন, ফসল বুনুন, ফসল ফলান ও ফসল কাটুন।
এই আন্দোলন প্রায় এক বছর চলে। এতে প্রান্তিক কৃষকেরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে হয় জমিদার ও মহাজনদেরই। তাঁরা জমি ফেরত দিয়ে কৃষকদের সঙ্গে মিটমাট করেন। এই সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ফজলুল হক আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার কথা ভাবতে শুরু করেন। ১৯২৭ সালে ‘নিখিল বঙ্গ কৃষক প্রজা সমিতি’ নামে সংগঠনের যাত্রা শুরু হয় এবং তিনি এর সভাপতি হন। পরে ১৯২৯ সালে প্রজাস্বার্থে তিনি কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও বাগ্মিতার জোরেই দলটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কৃষক প্রজা পার্টি গড়ার পরেও ফজলুল হক মুসলিম লীগে নিজের স্থান ধরে রেখেছিলেন। মুসলিম লীগের মধ্য দিয়ে তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতির দরজা খোলা রাখতে চেয়েছিলেন। তবে এই দলের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ ছিল সর্বদা, যে এটি ‘নাইট-নবাবদের’ দল। ইংরেজদের ঘনিষ্ঠ প্রতিপত্তিশালী বনেদি মুসলমান পরিবারগুলোই ছিল লীগের শক্ত ঘাঁটি, আর সমাজের তৃণমূল থেকে উঠে আসা নেতা সেখানে ছিলেন খুবই কম। ফজলুল হকের হিসাব ছিল, এই প্রভাবশালী দলটিকে যদি সারা ভারতের সাধারণ মুসলমানের জন্য কার্যকর সংগঠনে রূপ দেওয়া যায়, তাহলে লাভ মুসলমানদেরই হবে। এই ভাবনা থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে লীগের সঙ্গে ছিলেন।
কিন্তু এই দুই নৌকায় পা রাখার ফলে বাংলার রাজনীতিতে এক অদ্ভুত জটিলতা তৈরি হয়। মুসলিম লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টি, উভয়েরই কর্মী-সমর্থকদের বড় অংশ ছিল মুসলমান তরুণ সমাজ। ফলে নির্বাচনে মুসলমান ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তা ছাড়া বাংলার অনেক প্রভাবশালী লীগ নেতার নিজেদেরই জমিদারি-জোতদারি ছিল, আর কৃষক প্রজা পার্টির কর্মসূচি সরাসরি সেই স্বার্থে আঘাত হানছিল। এই অবস্থায় জিন্নাহ ও ফজলুল হকের মধ্যে লীগের অভ্যন্তরীণ উত্তাপ বাড়তে থাকে।
১৯৩৭-এর নির্বাচন ও প্রথম মন্ত্রিসভা
সেই উত্তাপের ফলেই ১৯৩৬ সালের নির্বাচনি প্রস্তুতিতে লীগ ও কৃষক প্রজা পার্টির মধ্যে সমঝোতা হয়নি। এক পাশে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি, অন্য পাশে জিন্নাহর নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ। বরিশালের পটুয়াখালী আসনে ঢাকার নবাব বংশের প্রভাবশালী লীগ নেতা খাজা নাজিমুদ্দীনের জমিদারি ছিল। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে সেখানেই ফজলুল হক ও নাজিমুদ্দীন মুখোমুখি হন এবং নাজিমুদ্দীন বড় ব্যবধানে পরাজিত হন। জমিদারি উচ্ছেদ এবং জোতদার-মহাজনদের অত্যাচার কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতিই ছিল ফজলুল হক ও তাঁর দলের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।
নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও কৃষক প্রজা পার্টি ৩৬টি আসন জিতে তখনকার রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বদলে দেয়। দলটি সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসে। প্রথমে তারা কংগ্রেসের সঙ্গে কোয়ালিশনের চেষ্টা করে, কিন্তু অল্পের জন্য তা ভেস্তে যায়। বাধ্য হয়েই ফজলুল হক মুসলিম লীগের সঙ্গে আলোচনায় বসেন এবং শেষ পর্যন্ত লীগের সঙ্গেই কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। অনেকে এই ঘটনার দায় চাপান বাংলার কংগ্রেস নেতাদের ওপর। তাঁদের মতে কংগ্রেস সহযোগিতার সুযোগ দিলে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে ভিন্ন হাওয়া বইত।
এই সমঝোতার মূল্য ফজলুল হককে দিতে হয়। মন্ত্রিসভায় জায়গা পান লীগের প্রভাবশালী নাইট-নবাবেরা। ইংরেজ শাসকদের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠতার কারণে কৃষক প্রজা পার্টির নিজস্ব ইশতেহার বাস্তবায়নের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসে। জমিদারি উচ্ছেদ থেকে শুরু করে মহাজন-জোতদার শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন হয়ে পড়ে। নির্বাচনের সময় ব্যাপক আলোড়ন তুললেও মন্ত্রিসভা গঠনের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে কৃষক প্রজা পার্টির সমর্থন কমতে থাকে।
তবু অনেক বাধা-বিপত্তির মধ্যেও ফজলুল হকের সরকারের কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন ছিল। কৃষকদের ঋণের বোঝা লাঘব করতে ১৯৩৮ সালে গঠিত হয় ‘ঋণ সালিশি বোর্ড’। ১৯৩৯ সালে প্রজাস্বত্ব আইন এবং ১৯৪০ সালে মহাজনী আইন পাস হয়। তাঁর উদ্যোগে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারও শুরু হয়। মুসলিমপ্রধান এলাকায় স্কুল-কলেজের সংস্কার ও হোস্টেল নির্মাণের কাজ এগোয়। প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার বিল পাস হয়। কলকাতা কর্পোরেশনের আইন সংশোধন করে আলাদা নির্বাচনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং মাধ্যমিক শিক্ষা বিল নিয়েও কাজ শুরু হয়।
এই কাজগুলো দেখায়, সীমাবদ্ধ ক্ষমতা ও জোটের চাপের মধ্যেও তিনি গ্রামীণ বাংলার কৃষক ও শিক্ষাবঞ্চিত মুসলমান সমাজের জন্য কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। অধ্যাপক ডঃ সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের মতে, ফজলুল হকের রাজনীতির লক্ষ্যই ছিল অনগ্রসর মুসলমান সমাজের উন্নতি। একই সঙ্গে তিনি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতেই বিশ্বাসী ছিলেন।
লাহোর প্রস্তাব: ইতিহাসের বাঁক
১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের সাতাশতম বার্ষিক অধিবেশন শুরু হয় জিন্নাহর সভাপতিত্বে। জিন্নাহ প্রথমে তাঁর দ্বিজাতিতত্ত্বের বিভিন্ন দিক ব্যাখ্যা করেন এবং কেন মুসলমানদের আলাদা আবাসভূমি প্রয়োজন, তা বোঝান। বিকেলে ফজলুল হক তাঁর ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য মঞ্চে এলে উপস্থিত সবাই উঠে দাঁড়িয়ে ‘শের-ই-বাঙ্গাল’ বলে তাঁকে অভিবাদন জানান।
তখনকার অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক প্রস্তাব করেন যে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মতো যেসব অঞ্চলে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেগুলো একত্র হয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ গঠন করতে পারে, এবং গঠনকারী প্রতিটি ইউনিট হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম। প্রস্তাবটি পরদিন পাস হয়। লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, লীগের ওয়ার্কিং কমিটির ২৩-২৪ মার্চের বৈঠকে পূর্ববঙ্গের সার্বভৌম অবস্থানের একটি রূপকল্পের সন্ধান মেলে। সেখানে তিনটি সার্বভৌম অঞ্চল নিয়ে একটি সর্বভারতীয় কনফেডারেশনের প্রস্তাব ছিল, যা স্যার জাফরুল্লাহ খানের লেখা এবং ফজলুল হক পাঠ করেছিলেন। তাঁর মতে, এই প্রস্তাবের সূত্র ধরেই সাত বছরের মাথায় পাকিস্তান তৈরি হয়।
এখানে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রথমত, ঐতিহাসিক আনোয়ার হোসেন উল্লেখ করেছেন, লাহোর প্রস্তাবে ফজলুল হক ‘পাকিস্তান’ শব্দটিই উচ্চারণ করেননি। তিনি বলেছিলেন মুসলিম এলাকাগুলো নিয়ে একাধিক রাষ্ট্রের কথা। দ্বিতীয়ত, গবেষক আহমদ রফিক তাঁর ‘দেশবিভাগ: ফিরে দেখা’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ইতিহাসে এটি লাহোর প্রস্তাব নামে উল্লিখিত হলেও রাজনৈতিক আলোচনায় তা ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ হয়ে ওঠে। তৃতীয়ত, ১৯৪৬ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লিতে লীগের নির্বাচিত আইনসভা সদস্যদের কনভেনশনে জিন্নাহর পরামর্শে তখনকার বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী লাহোর প্রস্তাবের কয়েকটি শব্দ বদলে এক পাকিস্তানের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। অর্থাৎ বহু রাষ্ট্রের যে ধারণা ফজলুল হক পেশ করেছিলেন, তা বদলে এককেন্দ্রিক পাকিস্তানের ধারণায় রূপ নেয়, আর সেই পরিবর্তনে তাঁর নিজের ভূমিকা ছিল না।
শেরে বাংলা বাংলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব খুব ভালো করে বুঝতেন। তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি ছিল, বাংলার রাজনীতি আসলে বাংলার অর্থনীতিই। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁর গোটা রাজনীতির মর্মকথা।
মন্ত্রিসভার পতন ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা
লাহোর প্রস্তাবের পর জিন্নাহর সঙ্গে ফজলুল হকের দূরত্ব বাড়তে থাকে। ১৯৪১ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে তাঁর মন্ত্রিসভার পতন ঘটে। এরপর মুসলিম লীগকে বাদ দিয়ে তিনি হিন্দু মহাসভা, কৃষক প্রজা পার্টি ও কংগ্রেসের সুভাষপন্থি অংশকে নিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। হিন্দু মহাসভার সঙ্গে জোটের কারণে রাজনীতিসচেতন মুসলমান তরুণদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। মুসলিম লীগ এই মন্ত্রিসভার নাম দেয় ‘শ্যামা-হক’ মন্ত্রিসভা, যদিও এতে হিন্দু মহাসভার মন্ত্রী ছিলেন একজনই, শ্যামাপ্রসাদ। লীগের লক্ষ্যই ছিল হক সাহেবকে রাজনীতির মূল মঞ্চ থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া। ১৯৪৩ সালের ২৮ মার্চ দ্বিতীয় হক মন্ত্রিসভার পতন ঘটে এবং বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন সোহরাওয়ার্দী ও নাজিমুদ্দীন। জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে না পড়লেও বয়সের দৌড়ে ফজলুল হক পিছিয়ে পড়েন।
এ সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ১৯৪২ সাল থেকে ফজলুল হক প্রবলভাবে দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতা শুরু করেন এবং মুসলিম লীগের প্রভাব কমানোর চেষ্টা চালান। কিন্তু সময়ের স্রোত তখন অন্যদিকে। ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১১৭টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ পায় ১১০টি, আর ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি পায় মাত্র চারটি। মুসলিম এলাকায় লীগের প্রার্থী এবং হিন্দু এলাকায় কংগ্রেসের প্রার্থীরা জয়ী হওয়ায় বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুসলমানরা দলে দলে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে আলাদা রাষ্ট্রের দাবিতেই লীগকে ভোট দেন। এই বাস্তবতায় ফজলুল হক ক্রমশ রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ওই বছর কলকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর শহরের অবস্থা দেখে তিনি দারুণভাবে মর্মাহত হন এবং সেপ্টেম্বরে মুসলিম লীগে যোগ দেন।
দেশভাগের সময়
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের নিয়ামক মুহূর্তে ফজলুল হকের তৎপরতা খুব একটা স্পষ্ট ছিল না। লর্ড মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সালের জুন মাসে ঘোষণা করেন যে ব্রিটিশ সরকার দেশবিভাগের নীতি মেনে নিয়েছে, এবং ১৪ আগস্ট ক্ষমতা হস্তান্তরের পর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয়। পাকিস্তানের ছিল দুটি অংশ, ভারতকে মাঝখানে রেখে পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান। পরের এক দশক ধরে পূর্ব পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক নাম ছিল পূর্ব বাংলা। আধুনিক বিশ্বে ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রথম রাষ্ট্র ছিল পাকিস্তান, আর দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত ইসরায়েল।
প্রশ্ন ওঠে, যাঁর হাতে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছিল, তিনি কেন এই চূড়ান্ত পর্বে সরব ছিলেন না? ইতিহাসবিদদের অনেকের ব্যাখ্যা, তিনি আসলে জিন্নাহর সঙ্গে রাজনীতিতে পেরে ওঠেননি। জিন্নাহও চাননি অনগ্রসর মুসলমানদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় কেউ রাজনীতিতে প্রবল প্রতাপ নিয়ে টিকে থাকুন। আহমদ রফিকের ভাষ্যে, জিন্নাহর কূটচালে ফজলুল হকের প্রজা-রাজনীতির অবসান ঘটে এবং দেশবিভাগের জটিল রাজনীতির অন্ধকার সময়ে তিনি প্রভাবহীন ও প্রান্তিক হয়ে পড়েন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জিন্নাহ ও সোহরাওয়ার্দীর তৎপরতায় এককেন্দ্রিক পাকিস্তানের ধারণা সামনে চলে আসা। সেই ধারণায় ফজলুল হকের বহু-সার্বভৌম কাঠামোর জায়গা ছিল না।
অন্য একটি দিকও আছে। বাংলা ভাগ হওয়ার ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে পীড়িত করেছিল, যদিও তিনি সে কথা মুখে বলে বেড়াতেন না। যে শহরে তাঁর আইন ব্যবসা ও অগ্নিঝরা রাজনৈতিক দিনগুলো কেটেছে, সেই কলকাতা অন্য দেশের অংশ হয়ে গেল, এটা ভাবতেও হয়তো তাঁর কষ্ট হতো। তাঁর শিক্ষক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের একটি ভবিষ্যদ্বাণী এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়। তিনি বলেছিলেন, কংগ্রেসিদের ভারতীয় জাতীয়তা তিনি বোঝেন না, বোঝেন বাঙালির জাতীয়তা, আর সেই জাতীয়তা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন একমাত্র ফজলুল হক। তাঁর মতে খাঁটি বাঙালিত্ব ও খাঁটি মুসলমানত্বের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাঙালির জাতীয়তা, এবং ফজলুল হক সেই সমন্বয়ের প্রতীক। বাঙালি যদি তাঁকে মর্যাদা না দেয়, তবে তার বরাতে দুঃখ আছে, এই ছিল তাঁর সতর্কবাণী।
১৯৪৭ সালের পর ফজলুল হক ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং আইন ব্যবসা দেখাশোনা করতে থাকেন। এই সময় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেলের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তিনি রাজনীতিতে প্রায় নিষ্ক্রিয় ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর তিনি নতুন করে রাজনীতি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সময় তিনি ছিলেন সামনের সারিতে। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে জয়ী হয় এবং ফজলুল হক তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনবারই তাঁর দল তুলনামূলক কম আসন জিতেছিল, তবু সবাই দল-মত ছাপিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদটি তাঁকেই ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ থেকে তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পরিধি বোঝা যায়। তবে পাকিস্তান সরকারের নানা কৌশল ও চাপের মুখে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাও বেশিদিন টেকেনি।
এরপর পাকিস্তানের রাজনীতি ঘোলাটে হতে থাকে, যার অনেক কিছুই তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের ছিল না। রাজনীতি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করলেও রাজনীতি তাঁকে ছাড়েনি। ১৯৫৫ সালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয় তাঁকে, আর ১৯৫৬ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হন। সেই পদও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৯৫৮ সালে তাঁকে অপসারণ করা হয়, এবং সেই বছরের সামরিক অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তাঁকে গৃহবন্দিও করা হয়। বয়সের ভার ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে প্রায় সরিয়ে নেন।
১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়। প্রায় পাঁচ দশক ধরে উপমহাদেশের, বিশেষ করে বাংলার রাজনীতিতে দাপটের সঙ্গে বিচরণ করা এই নেতা যখন বিদায় নিলেন, তাঁর প্রস্তাবের খুঁটি ধরে দাঁড়ানো পাকিস্তান তখন সামরিক শাসকদের কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন। ঢাকায় তাঁর সমাধি অবস্থিত খাজা নাজিমুদ্দীন ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমাধির পাশেই, ‘তিন নেতার মাজার’ নামে পরিচিত স্থানে। সেখানে তাঁর পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ও সহযোদ্ধারা একই চত্বরে শায়িত, যা বাংলার রাজনীতির জটিল ইতিহাসের এক নীরব প্রতীক।
কেকে/ এমএস