গতকাল ছিল ১৩ সেপ্টেম্বর। বাংলা সাহিত্যের এক অননুকরণীয় কণ্ঠস্বর সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মবার্ষিকী। ১৯০৪ সালের এই দিনে জন্ম নেওয়া এই মানুষটিকে আমরা সাধারণত চিনি রম্যরচয়িতা, ভ্রমণকাহিনিকার আর অসাধারণ রসবোধের অধিকারী এক পণ্ডিত হিসেবে। কিন্তু তার হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক দীর্ঘ, বন্ধুর ও বহুবার আহত হওয়া জীবনের গল্প— যে গল্পে জড়িয়ে আছে অপবাদ, অনিশ্চয়তা আর বারবার নতুন করে দাঁড়ানোর সংগ্রাম।
কমলালেবুর ঘ্রাণ থেকে শান্তিনিকেতন
১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত ভারতের সিলেট জেলার করিমগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ মুজতবা আলী। তার বাবা সৈয়দ সিকান্দার আলী ছিলেন খান বাহাদুর উপাধিপ্রাপ্ত একজন সাবরেজিস্ট্রার, আর বাবার বদলির চাকরির সুবাদে ছোটবেলা থেকেই একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে পড়াশোনা করতে হয়েছিল তাকে। সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। পরিবারের লোকজন তাকে আদর করে ডাকতেন সিতারা, সংক্ষেপে সিতু।
শৈশবেই তার মধ্যে যে অসাধারণ কৌতূহল ও সাহস ছিল, তার প্রমাণ মেলে ১৯১৯ সালের একটি ঘটনায়। সিলেট সফরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্থানীয় ছাত্রদের সামনে ‘আকাঙ্ক্ষা’ বিষয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। কিশোর মুজতবা তখনই বিশ্বকবিকে চিঠি লিখে জানতে চান, আকাঙ্ক্ষাকে উচ্চ করে তুলতে হলে ঠিক কী করণীয়। কয়েক দিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথের হাতে লেখা জবাব এসে পৌঁছায়—স্বার্থচিন্তার ঊর্ধ্বে গিয়ে দেশ ও জনকল্যাণের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহই মানুষকে প্রকৃত মহত্ত্বের পথে নিয়ে যায়, এমনই ছিল তার বার্তার মর্মকথা। এই পত্র-যোগাযোগই যেন এক ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বীজ বুনে দিয়েছিল।
১৯২১ সালে মাত্র সতেরো বছর বয়সে মুজতবা আলী শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং হয়ে ওঠেন প্রতিষ্ঠানটির একেবারে প্রথম দিককার ছাত্রদের একজন। কথিত আছে, প্রথম সাক্ষাতেই তার বাচনভঙ্গি শুনে রবীন্দ্রনাথ অনুমান করেছিলেন যে ছেলেটি পূর্ববঙ্গের সিলেটের বাসিন্দা, কারণ তার কথায় নাকি কমলালেবুর একটা ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছিল। শান্তিনিকেতনে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় মুসলিম ছাত্র। সেখানে ইংরেজি ও বাংলা ক্লাসে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য পেয়েছেন তিনি, যিনি তাদের পড়াতেন শেলি, কিটস ও নিজের ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থ।
এ ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষকের কাছে তিনি রপ্ত করেন জার্মান, ফরাসি, হিন্দি, উর্দু, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, রুশ ও ইতালীয় ভাষা। মোট পনেরোটি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করে ১৯২৬ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথের রচনার প্রতি তার অনুরাগ ছিল এমনই গভীর যে কবির প্রায় পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ কবিতা এবং পঁচিশ থেকে ত্রিশ শতাংশ প্রবন্ধ তার মুখস্থ ছিল বলে জানা যায়। শান্তিনিকেতনের এই বর্ণময় দিনগুলোর বিস্তারিত বিবরণ তিনি নিজেই লিপিবদ্ধ করে গেছেন ‘গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন’ গ্রন্থে।
স্নাতক শেষ করার পর মুজতবা আলীর শিক্ষাজীবন থেমে থাকেনি। তিনি ভারতের আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন, এরপর দর্শনশাস্ত্র নিয়ে পড়ার জন্য বৃত্তি নিয়ে পাড়ি জমান জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা করে ১৯৩২ সালে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৩৪-৩৫ সালে মিশরে গিয়ে কায়রোর প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করেন তিনি। এভাবে একাধিক দেশে, একাধিক ভাষা ও সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে তার বিশ্বনাগরিক সত্তা—যে পরিচয় পরবর্তী জীবনে তার লেখায় এবং আচরণে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, তিনি নিজেকে কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ে বাঁধতে চাননি; বরং নিজেকে ভাবতেন গোটা বিশ্বের নাগরিক হিসেবে।
তার কৈশোরের কৌতূহল যে কতা প্রখর ছিল, তার আরেকটি প্রমাণ মেলে—মাত্র তেরো বছর বয়সে তিনি লুসাই ভাষা শেখার চেষ্টা করেছিলেন, আর সেই চেষ্টার সূত্র ধরেই আবিষ্কার করেছিলেন যে বাংলার বহু শব্দের কোনো প্রতিশব্দই লুসাই ভাষায় নেই। পনেরো বছর বয়সে আবার নিজের মেজ ভাই সৈয়দ মুর্তজা আলীর সঙ্গে মিলে তিনি বের করেছিলেন ‘কুইনিন’ নামের একটি হাতে লেখা পত্রিকা। রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ ও দার্শনিক আবু সয়ীদ আইয়ুব ছিলেন সিলেটে সপ্তম শ্রেণিতে তার সহপাঠী—এই বন্ধুত্বও পরবর্তী জীবনে বহুদূর গড়িয়েছিল। শান্তিনিকেতনে ভর্তির দিন প্রথম সাক্ষাতে রবীন্দ্রনাথ তরুণ মুজতবাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কী পড়তে চান তিনি; জবাবে মুজতবা বলেছিলেন যে তা তার ঠিক জানা নেই, তবে একটি বিষয় খুব ভালোভাবে শিখতে চান। রবীন্দ্রনাথ তখন বলেছিলেন, নানা বিষয় শেখায় আপত্তির কিছু নেই।
শিক্ষাজীবনের এই দীর্ঘ ও বিচিত্র পর্বই আসলে তৈরি করে দেয় সেই ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে সৈয়দ মুজতবা আলী হয়ে উঠবেন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কণ্ঠস্বর। একদিকে সিলেটের আঞ্চলিক শিকড়, অন্যদিকে ইউরোপ-এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত পাণ্ডিত্য—এই দুইয়ের মিশেলেই পরে তৈরি হবে তার অননুকরণীয় রচনাশৈলী। দেখতে তিনি ছিলেন অসামান্য সুদর্শন, গায়ের রং এমনই ফরসা যে অনেকে ভুল করে তাকে বিদেশি বলে ভেবে বসতেন, আর কথাবার্তাতেও ছিলেন সমান আকর্ষণীয়—এই দুইয়ের মিশেলেই তিনি যেখানেই যেতেন, নজর কাড়তেন সহজে।
কর্মজীবনের বাঁকে বাঁকে—প্রাপ্তি, সংকট ও অপমান
শিক্ষাজীবন শেষ করে সৈয়দ মুজতবা আলী কর্মজীবনেও পা রাখেন একই রকম বিচিত্র পথ ধরে। ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি কাবুলের শিক্ষা দপ্তরে ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কলকাতা থেকে কাবুল যাত্রার এই অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তীকালে জন্ম নেয় তার বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি ‘দেশে বিদেশে’, যেখানে আফগানিস্তানের দৈনন্দিন জীবন ও তৎকালীন আর্থসামাজিক বাস্তবতা তিনি তুলে ধরেছিলেন সূক্ষ্ম রসবোধের মোড়কে। ১৯৪৯ সালে বইটি প্রকাশের সময় প্রকাশকের সঙ্গে তার যে বিরোধ বাধে, তা গড়ায় আদালত পর্যন্ত।
১৯৩৫ সালে বরোদার মহারাজার আমন্ত্রণে তিনি বরোদা কলেজে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং সেখানে কাটান প্রায় আট বছর। এরপর তিনি যুক্ত হন দিল্লির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। দেশভাগের পরবর্তী সময়ে, ১৯৪৯ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বগুড়ার আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন, পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি স্টাডিজ বিভাগে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবেও যুক্ত ছিলেন।
এই পুরো সময়জুড়ে তিনি সত্যপীর, ওমর খৈয়াম, টেকচাঁদ, প্রিয়দর্শী প্রভৃতি ছদ্মনামে দেশ, আনন্দবাজার, বসুমতী, সত্যযুগ ও মোহাম্মদীর মতো পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। একাধিক ছদ্মনামে লেখার এই অভ্যাস থেকেই বোঝা যায়, তিনি নিজের পরিচয়কে কোনো একটিমাত্র রূপে বেঁধে রাখতে চাননি—বরং প্রতিটি ছদ্মনামের আড়ালে তিনি যেন ভিন্ন ভিন্ন কণ্ঠে কথা বলার স্বাধীনতা নিতেন।
উল্লেখযোগ্য একটি অধ্যায় হলো ১৯৪৭ সালের ৩০ নভেম্বর সিলেট মুসলিম সাহিত্য সমাজের আয়োজনে এক আলোচনা সভায় তার বক্তব্য প্রদান। তখন তিনি দিল্লিতে কর্মরত থাকা অবস্থাতেই যুক্তিনিষ্ঠ ও তথ্যসমৃদ্ধভাবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অবস্থান নেন। এই সাহসী বক্তব্যের কারণে তাকে এবং তার পরিবারকে নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল—ভাষার প্রশ্নে তার এই আগাম অবস্থান আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।
পঞ্চাশের দশকে সৈয়দ মুজতবা আলী যোগ দেন আকাশবাণী তথা অল ইন্ডিয়া রেডিওতে, যেখানে তিনি সহকারী স্টেশন পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু ১৯৫৭ সালে এই মোটামুটি স্থিতিশীল চাকরিও তিনি ছেড়ে দেন এবং ফিরে আসেন কলকাতায়। তার আশা ছিল কোনো বড় সংবাদপত্রে সম্মানজনক বেতনে যোগ দেবেন—বন্ধু অন্নদাশঙ্কর রায়ের ভাষ্যমতে, তিনি বিশেষভাবে আনন্দবাজার পত্রিকায় চাকরির আশা করেছিলেন। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি; বড় পত্রিকাগুলো কেবল তার কাছে লেখা চাইত, সম্মানীর বিনিময়ে, যা তার পছন্দ ছিল না।
কিছতা অভিমান নিয়ে তিনি কলকাতা ছেড়ে শান্তিনিকেতনে ফিরে যান, এই আশায় যে বাকি জীবন সেখানেই কাটাবেন। কিন্তু সেখানে গিয়েও শান্তি মেলেনি তার। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর শান্তিনিকেতনের সেই প্রাণবন্ত পরিবেশ অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছিল, আর চারপাশে ঈর্ষা ও হীনমন্যতার প্রকাশ তাকে পীড়িত করত। আর্থিক অনটনও ছিল তীব্র—নিজের ব্যক্তিগত মোটরগাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করে সংসার চালাতে হয়েছিল তাকে।
এই কঠিন সময়েই ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে তার ‘শবনম’ উপন্যাস, আর একের পর এক পত্রিকার জন্য হালকা রচনা লিখে যেতে হয় তাকে জীবিকার তাগিদে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি বড় কাজ করার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা তার এই লেখালেখির চাপে বাস্তবায়িত হতে পারেনি। ১৯৬১ সাল পর্যন্ত লেখা থেকে পাওয়া সম্মানিই ছিল তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
এই পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি আসে যখন বিশ্বভারতীর নতুন উপাচার্য, বিচারপতি সুধীরঞ্জন দাস, তাকে ইসলামের ইতিহাস ও জার্মান ভাষা বিভাগে রিডার পদে নিয়োগ দেন, মাসিক এগারোশ টাকা বেতনে। কিন্তু এখানেও স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। একটি পক্ষ রটাতে শুরু করে যে তিনি ঠিকমতো ক্লাস নেন না বা গবেষণা করেন না, আর তাকে রিডার পদে নিয়োগ দেওয়াটাই ছিল ভুল।
১৯৬৪ সালে কলকাতার কিছু পত্রিকায় তার বিরুদ্ধে আরও একদফা অপপ্রচার চলে—এক পুরোনো বেতার ভাষণ পুনর্মুদ্রণ উপলক্ষে অভিযোগ ওঠে যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে হিন্দুধর্মের প্রতি অসম্মান দেখিয়েছেন, যদিও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু পরিমল গোস্বামী এর যথাযথ জবাব দেন। পরিহাসের বিষয়, তখন ঢাকার একাংশ আবার মনে করত, কলকাতায় থাকতে থাকতে তিনি বুঝি হিন্দু হয়েই গেছেন। এই দ্বিমুখী সন্দেহের শিকার হওয়াটাই ছিল তার জীবনের এক গভীর বিড়ম্বনা।
১৯৬৫ সালের ৩০ জুন, ষাট বছর পূর্ণ হওয়ার আট মাস পরই, বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ তাকে অব্যাহতি দেয়। এরপর তিনি শান্তিনিকেতন ছেড়ে বোলপুরে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। কিন্তু কুৎসা রটনাকারীরা তখনও পিছু ছাড়েনি। এই সময়েই শুরু হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, আর রটনা ছড়ায় যে তিনি আসলে পাকিস্তানের চর, কারণ তার স্ত্রী তখন পাকিস্তান সরকারের চাকুরে। স্থানীয় পুলিশ এই ভিত্তিহীন অভিযোগে বিশ্বাস করে তার বাসভবনে অভিযান চালিয়ে পাসপোর্ট জব্দ করে বসে। বিষয়টি জানার পর তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ক্ষুব্ধ হয়ে পাসপোর্ট ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তীকালে ‘দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ মন্তব্য করেছিলেন, যারা এমন রটনা ছড়িয়েছিল তারা মানুষটিকে ভালোভাবে চিনতই না। আর অন্নদাশঙ্কর রায়ের প্রতিক্রিয়া ছিল, এটি আসলে গোটা সমাজেরই লজ্জার বিষয়।
এই দুর্ভাগ্যজনক পর্বটি বুঝতে হলে তার ব্যক্তিগত জীবনের একটি তথ্যও মনে রাখা জরুরি। ১৯৫১ সালে তিনি বিয়ে করেন রাবেয়া খাতুনকে, যিনি কর্মসূত্রে যুক্ত ছিলেন পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে। ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার সেই উত্তপ্ত সময়ে ভারতের নাগরিক মুজতবা আলীর সঙ্গে পাকিস্তানের নাগরিক তার স্ত্রীর এই সম্পর্কটিকেই কাজে লাগিয়েছিল গুজবের ফেরিওয়ালারা, যদিও বাস্তবে এর পেছনে কোনো সারবত্তা ছিল না। কী পরিমাণ আর্থিক অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে তাকে যেতে হয়েছিল, তা বোঝা যায় তার নিজেরই একটি উক্তি থেকে—লেখালেখির প্রতি তার অনীহার কথা বলতে গিয়ে তিনি একবার মন্তব্য করেছিলেন, হাঁড়িতে ভাত থাকলে যেমন সাঁওতাল কাজে যায় না, ড্রয়ারে টাকা থাকলে তিনিও লেখেন না। অথচ বাস্তবতা ছিল ঠিক উল্টো—জীবনের বড় অংশজুড়েই লেখাই ছিল তার পেটের ভাতের একমাত্র সংস্থান।
এই ঘটনায় সৈয়দ মুজতবা আলী মানসিকভাবে গভীরভাবে আঘাত পান। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, ঘুমের ওষুধ ছাড়া রাতে ঘুমাতে পারতেন না, এমনকি একাধিকবার হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছিল তাকে। কিছতা সুস্থ হয়ে ওঠার পর ১৯৬৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি বোলপুরের বাসা ছেড়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। এরপর প্রায় ছয় বছর জীবিত ছিলেন তিনি। ১৯৭৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ‘দেশে বিদেশে’র এই স্রষ্টা। তার কর্মজীবনের এই পুরো চিত্র থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যে মানুষটি পাঠকের কাছে কেবল হাসি আর রসিকতার প্রতিমূর্তি হয়ে আছেন, তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল সংকট, অপমান আর অনিশ্চয়তায় ভরা।
রসবোধ, আড্ডা ও ‘চাচা কাহিনী’র জাদুকর
সৈয়দ মুজতবা আলীর পরিচয় যতা না তার জীবনী দিয়ে, তার চেয়ে ঢের বেশি তার রসবোধ দিয়ে তৈরি। হিউমার আর ভাঁড়ামির মধ্যে যে সূক্ষ্ম রেখা টানা যায়, মুজতবা আলী ছিলেন ঠিক সেই সূক্ষ্ম রেখার এপারের বাসিন্দা—কখনো তার রসিকতা স্থূলতায় নামেনি, বরং তা সবসময় একধরনের বুদ্ধিদীপ্ত কমনীয়তা বজায় রেখেছে। তার নিজের জীবনেই ঘটে যাওয়া নানা মজার ঘটনা এর প্রমাণ। জার্মানিতে এক জাহাজযাত্রার সময় স্কুলছাত্রীদের একটি বনভোজন দলের এক কিশোরী তার দিকে বারবার তাকাচ্ছিল বলে বিব্রত বোধ করেছিলেন তিনি; শেষ পর্যন্ত দেখা গেল মেয়েটির কৌতূহল ছিল নিতান্তই নিরীহ, তার চুলের রং নিয়ে। উপস্থিত বুদ্ধিতে নিজের জামার বোতাম খুলে বুকের লোম দেখিয়ে সেই কিশোরীকে বিশ্বাস করিয়েছিলেন যে তার চুল প্রাকৃতিকভাবেই কালো—এমন খুঁটিনাটি ও আপাত-তুচ্ছ ঘটনাতেও তার সহজাত কৌতুকপ্রিয়তার পরিচয় স্পষ্ট।
তার এই রসবোধ কেবল লেখাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বাস্তব জীবনেও প্রতিমুহূর্তে প্রকাশ পেত। প্রখ্যাত সরোদবাদক বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত তার আত্মজীবনীতে এমনই একটি ঘটনার কথা লিখেছেন। দিল্লিতে অর্থনীতিবিদ সমর সেনের বাড়িতে গিয়ে সেখানে অবস্থানরত মুজতবা আলীর সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়। একদিন সন্ধ্যায় বুদ্ধদেবের গুরুজি মালকোষ রাগ পরিবেশন করছিলেন, আর সমর সেন কৌতুক করে জিজ্ঞেস করছিলেন, মালকোষ বাজালে নাকি প্রয়াত ওস্তাদদের আত্মা নেমে আসে, তা কি সত্যি। গুরুজি যতই বাজাচ্ছিলেন, ততই প্রশ্ন উঠছিল, ভূত-প্রেতের সাড়া মিলছে না কেন। ঠিক তখনই অন্ধকার লনের এক কোণ থেকে হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন মুজতবা আলী নিজেই—ঘোষণা দিলেন যে ভূত এসে গেছে, আর সেটা তিনিই। এই আকস্মিক, স্বতঃস্ফূর্ত রসিকতাই তাকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে রাখত।
লেখায় তার হাস্যরসের সবচেয়ে বড় কীর্তি সম্ভবত ‘চাচা কাহিনী’ বইয়ের চাচা চরিত্রটি। একটিমাত্র চরিত্রকে কেন্দ্র করে পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো করে গল্পের একের পর এক স্তর উন্মোচন করার যে কৌশল তিনি রপ্ত করেছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণভাবে তার নিজস্ব। নিজে যে কথাগুলো সরাসরি বলতে পারতেন, সেগুলোই তিনি বলিয়ে নিতেন চাচার মুখ দিয়ে, আর তাতে কথাগুলো পেত এক ভিন্ন মাত্রা ও ব্যঞ্জনা। একইভাবে ‘বই কেনা’ প্রবন্ধে বই না কেনার প্রবণতাকে তিনি কটাক্ষ করেছেন এমন এক সরস ভঙ্গিতে, যা আজও প্রাসঙ্গিক। ‘কাইরো’ রচনায় নিজের অলসতা ও দীর্ঘসূত্রতাকে তিনি অকপটে হাস্যরসের বিষয় বানিয়েছেন, নিজেকে হালকা করে দেখানোর কোনো দ্বিধা ছাড়াই।
তবে তার রসিকতাকে নিছক লঘুচালে দেখাটা ভুল হবে। তার হাস্যরসের নিচে প্রায়শই লুকিয়ে থাকত গভীর পর্যবেক্ষণ ও সমাজভাষাতাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি। যেমন সিলেটি ভাষারীতির একটি বিশেষ প্রবাদ ব্যবহার করে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের ভাষা পরস্পরকে প্রভাবিত করে—কোথাও ভাষার ‘জমা’ হয়, কোথাও আবার হয় ‘খরচ’। এই ধরনের রচনায় হাসতে হাসতেই পাঠক ভাষাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য আত্মস্থ করে ফেলেন, টেরও পান না কখন রসিকতা ছাপিয়ে আলোচনাটি গভীর তাত্ত্বিক জায়গায় পৌঁছে গেছে।
তার লেখা পড়তে পড়তে মনে হয়, যেন কোনো এক জমজমাট আড্ডায় বসে আছেন পাঠক—আর সেই আড্ডার ভাষাতেই মিশে থাকে হিউমার ও শ্লেষের এক অনন্য মিশ্রণ। এই জন্যই বলা হয়, মুজতবা আলীর লেখা মূলত আড্ডারই লিখিত রূপ। বিষয় যা-ই হোক না কেন, পাঠক তাতে আনন্দ পান, মুগ্ধ হন, আর তার বলার ভঙ্গিটাই দীর্ঘদিন মনে গেঁথে থাকে।
তার ‘ন্যাকামো’ প্রবন্ধের একটি পাদটীকায় তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, তার প্রতি সহৃদয় পাঠকেরা মূলত আশপাশের গল্পগুজব শুনতেই ভালোবাসেন। এই আত্মসচেতনতাই ছিল তার রচনাশৈলীর একটি বড় শক্তি। মূল বিষয় থেকে সরে গিয়ে উপমা বা প্রসঙ্গান্তরে মজে থাকা, তারপর আবার হঠাৎ মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসা—এই কৌশলেই তিনি এমন সব অনুচ্ছেদ তৈরি করতেন, যা পাঠকের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে যেত, প্রায়শই মূল বিষয়বস্তুর চেয়েও বেশি।
‘ত্রাহি বিশ্বকর্মা’ প্রবন্ধে আবার তিনি শিল্পের যথাযথ আকার ও পরিমাণ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে যুক্তি দিয়েছিলেন, মহাভারত যেমন মহাকাব্য হিসেবেই সার্থক, মেঘদূত তেমনই সার্থক তার সংক্ষিপ্ত পরিসরে—একটিকে অন্যটির আকারে ফেললে দুটোরই সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাবে। রসিকতার মোড়কে এভাবেই তিনি হাজির করতেন শিল্পতত্ত্বের গুরুগম্ভীর প্রশ্ন।
পাণ্ডিত্য, ভাষা ও উত্তরাধিকার
সৈয়দ মুজতবা আলীকে শুধু রম্যরচয়িতা বলে আখ্যায়িত করলে তার প্রতি অবিচারই করা হয়। পনেরোটি ভাষায় দক্ষতা অর্জনকারী এই মানুষটি ছিলেন একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ভ্রমণকাহিনি রচয়িতা। বিভিন্ন ভাষার শ্লোক ও রূপকের যথাযথ প্রয়োগ, আর হাস্যরসের আড়ালে গভীর জীবনবোধ প্রকাশের ক্ষমতাই তাকে বাংলা সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র আসন এনে দিয়েছে।
অনেক সমালোচকের মতে, ১৯৫০ থেকে ৬০-এর দশকে তিনিই ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। এই জনপ্রিয়তার পেছনে একটিমাত্র কারণ ছিল না—পাঠক তার কাছে পেতেন একইসঙ্গে বিনোদন ও জ্ঞান, হাসি ও চিন্তার খোরাক, যা একসঙ্গে খুব কম লেখকের রচনায় মেলে। বাংলা রম্যসাহিত্যের ধারায় শিবরাম চক্রবর্তীর মতো লেখকদের পাশাপাশি তার নামও উচ্চারিত হয় সবচেয়ে বেশি, যদিও দুজনের রসিকতার ধরন ছিল একেবারেই ভিন্ন।
তার পাণ্ডিত্যের গভীরতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার ভাষাবিষয়ক রচনাগুলোতে। ‘পঞ্চতন্ত্র’-এর ‘ভাষা’ নামের রচনায় তিনি বিশ্লেষণ করেছেন কীভাবে একই অর্থবহ দুটি শব্দ জোড়া লেগে তৈরি হয় নতুন শব্দবন্ধ, আর কীভাবে সেখানে অপরিচিত শব্দটি সবসময় বসে পরিচিত শব্দের পরে—যেমন দেশ-মুল্লুক কিংবা উকিল-ব্যারিস্টারের মতো শব্দজোড়ে। নিছক ব্যাকরণের পাঠ না হয়েও এই রচনাগুলো ভাষা পরিবর্তনের একটি গভীর সমাজভাষাতাত্ত্বিক নিয়মকে সহজবোধ্য করে তুলেছে, যা বহু প্রথাগত ব্যাকরণ বইও পারেনি।
তার রচনার বৈচিত্র্যও ছিল বিস্ময়কর। যাঁরা তাকে কেবল হাস্যরসাত্মক ও পণ্ডিত লেখকের ছাঁচে ফেলে দেখেন, তাদের নজর এড়িয়ে যায় তার এমন অনেক রচনা, যা এই দুই বৈশিষ্ট্যের বাইরেও বিস্তৃত। রুশ সাহিত্যিক তলস্তয়কে নিয়ে লেখা তার একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য রচনায় তিনি তলস্তয়ের সাহিত্যিক খ্যাতি থেকে শুরু করে উনবিংশ শতকের ইউরোপীয় সভ্যতার ভণ্ডামির বিরুদ্ধে তার দার্শনিক বিদ্রোহ পর্যন্ত পুরো পরিক্রমাটি অল্প কথায় তুলে ধরেছেন, আর তার ভাষা এখানে অনেকটাই গম্ভীর ও চিন্তাশীল।
একইভাবে দিল্লির নিজাম উদ-দীন আউলিয়ার ওরস উপলক্ষে লেখা এক রচনায় তিনি এই সুফি সাধকের অসাম্প্রদায়িক অবস্থান ও শান্তির বার্তা তুলে ধরেছেন, যা তার নিজের বিশ্বনাগরিক মানসিকতারই প্রতিফলন। শিল্পের আকার ও পরিমাণ নিয়ে লেখা তার একটি রচনায় আবার তিনি দিল্লিতে প্রস্তাবিত এক দানবাকৃতি গান্ধীমূর্তি নির্মাণ-পরিকল্পনার প্রসঙ্গ টেনে সার্থক শিল্পের সংজ্ঞা নিয়ে গভীর আলোচনা করেছেন, মহাভারত ও মেঘদূতের তুলনা টেনে।
তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে ওঠা এক মানসিকতা। কথিত আছে, একবার এক হিন্দু পরিবারে পুরোহিতের অভাবে সরস্বতী পূজার আচার সম্পন্ন করতে অনুরোধ করা হয়েছিল তাকে, আর বিশুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ করে তিনি তা সম্পন্নও করেছিলেন—পরিবারটি জানতেই পারেনি যে তিনি মুসলমান। এই ঘটনা তার ধর্মীয় উদারতা ও ভাষাগত দক্ষতা উভয়েরই একটি প্রতীকী দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
সাহিত্যিক হিসেবে তার বহুমুখিতাও লক্ষণীয়। রম্যরচনা ও ভ্রমণকাহিনির পাশাপাশি তিনি লিখেছেন ‘শবনম’-এর মতো পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস, লিখেছেন অসংখ্য ছোটগল্প, আর বিভিন্ন ভাষা থেকে অনুবাদও করেছেন। শান্তিনিকেতনে পড়ার সময় হাতে লেখা ‘বিশ্বভারতী’ পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করে পরবর্তী জীবনে তিনি একাধিক ছদ্মনামে বাংলার প্রায় সব প্রধান পত্রিকায় লিখেছেন, যা তাকে সমসাময়িক পাঠকসমাজের কাছে অসম্ভব পরিচিত করে তুলেছিল।
সরোদবাদক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, কলকাতার পার্ক সার্কাস এলাকার বাড়িতে তার বৈঠকখানায় নিয়মিত ভিড় জমাতেন সাহিত্যপ্রেমী ও উদীয়মান লেখকেরা, আর সেই আড্ডায় নানা প্রসঙ্গ থেকে উঠে আসা তার কথার ঝুলি থেকেই যদি সংগ্রহ করা যেত, তাহলে আরও একাধিক ‘চাচা কাহিনী’ রচিত হতে পারত বলে মনে করতেন বুদ্ধদেব। বিভিন্ন দেশের ভাষা ও সাহিত্যে তার ছিল অবাধ বিচরণ, আর সেখান থেকে মাঝেমধ্যেই তিনি তুলে আনতেন বিস্ময়কর সব তথ্য ও উপাখ্যান, যা তার শ্রোতা-পাঠকদের মুগ্ধ করে রাখত।
আজ, তার মৃত্যুর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পরে, সৈয়দ মুজতবা আলীকে আমরা প্রধানত মনে রাখি তার রসিকতা আর স্বতন্ত্র ভাষাভঙ্গির জন্য। কিন্তু এই স্মৃতিচারণার আড়ালে থেকে যায় তার বহুভাষিক পাণ্ডিত্য, তার সমাজভাষাতাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি, তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উদারতা, এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রথম দিকে বাংলার পক্ষে তার সাহসী অবস্থান।
জীবনভর সংকট, অপবাদ আর আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গিয়েও তিনি কখনো তার রসবোধ বা মননশীলতা হারাননি। সৈয়দ মুজতবা আলী তাই কেবল একজন রম্যরচয়িতা নন—তিনি বাংলা সাহিত্যের এক বিরল ব্যতিক্রম, যার রচনাবলির গভীরে ডুব দিলে আজও পাওয়া যায় নতুন নতুন মণিমুক্তা।
উপসংহার
চারটি পর্ব মিলিয়ে যে ছবিটি ফুটে ওঠে, তা একরৈখিক নয়। একদিকে সিলেটের এক কিশোরের কমলালেবুর ঘ্রাণমাখা কণ্ঠস্বর নিয়ে শান্তিনিকেতনে পা রাখা, অন্যদিকে জীবনের শেষভাগে অপবাদ আর অসুস্থতার মধ্য দিয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে পড়া এক মানুষ—এই দুইয়ের মাঝখানে বিস্তৃত সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবন। অথচ এই সমস্ত সংকট, অপমান আর আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গিয়েও তার কলম কখনো তিক্ততায় ডুবে যায়নি। বরং প্রতিটি সংকটের ভেতর থেকেই তিনি খুঁজে নিয়েছেন হাসির উপকরণ, খুঁজে নিয়েছেন এমন এক ভাষা, যা পাঠককে ক্লান্তিকর বাস্তবতা থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। এই কারণেই তাকে নিয়ে লিখতে বসে বারবার মনে হয়, দস্তয়েভস্কির মতো লেখকেরা যখন মানুষের মনকে ছুরি দিয়ে চিরে দেখান, তখন মুজতবা আলীরা তৈরি করেন নিশ্বাস নেওয়ার জায়গা—আর দুটি জগৎই মানুষের জীবনে সমান জরুরি।
আজ, তার ১২২তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে, সৈয়দ মুজতবা আলীকে নতুন করে পড়ার আহ্বান তাই আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ তার রচনায় মিশে আছে এমন এক পাণ্ডিত্য, এমন এক উদারতা আর এমন এক সাহস, যা কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়—আজকের বাংলাদেশ ও বাঙালি সমাজের জন্যও সমান তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা বহন করে।
কেকে/ এমএস