মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: হামে প্রাণ গেল আরও তিন শিশুর, মোট মৃত্যু ৬৮৬      একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      
স্বাস্থ্য
নীতিগত অগ্রাধিকার পেলে আয়ুর্বেদ হতে পারে জাতীয় সম্পদ
মেঘনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:৫৭ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হলেই আমরা আধুনিক চিকিৎসার প্রসঙ্গ তুলতে অভ্যস্ত। কিন্তু হাজার বছরের অভিজ্ঞতা, প্রকৃতিনির্ভর জ্ঞান ও মানবদেহের সামগ্রিক ভারসাম্যকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা, যার দেশের মাটিতেই দীর্ঘ ঐতিহ্য, তা আজও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভারতীয় উপমহাদেশে আয়ুর্বেদের বিকাশ ঘটেছিল সুসংগঠিত শাস্ত্রীয় ভিত্তির ওপর। প্রাচীন ঋষি চরক ও সুশ্রুত তাদের সংকলনে যে চিকিৎসা দর্শন তুলে ধরেছেন, তা কেবল রোগ নিরাময়ের কৌশল নয়; বরং জীবনযাপনের একটি বিজ্ঞান।

‘আয়ুর্বেদ’ শব্দের অর্থই হলো জীবন সম্পর্কে জ্ঞান। এখানে রোগকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হয় না; দেহ, মন ও পরিবেশ—এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট হলেই রোগের উৎপত্তি হয়। তাই প্রতিরোধই আয়ুর্বেদের মূল শক্তি। ভেষজ উদ্ভিদ, খনিজ ও প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন চিকিৎসা দেওয়ার দাবি রাখে, এমন বিশ্বাস গ্রামীণ জনপদে এখনো দৃঢ়ভাবে বিদ্যমান। আধুনিক গবেষণাও বহু ক্ষেত্রে ভেষজ উপাদানের কার্যকারিতা স্বীকার করছে। বিশ্বজুড়ে ‘হোলিস্টিক মেডিসিন’ বা সমন্বিত চিকিৎসা দর্শনের যে পুনর্জাগরণ দেখা যাচ্ছে, তা আয়ুর্বেদের মৌলিক দর্শনের সঙ্গেই সাযুজ্যপূর্ণ।

বাংলাদেশে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার সম্ভাবনা অপরিসীম। দেশের জলবায়ু ও মাটির গুণাগুণ শতাধিক ঔষধি গাছ চাষের জন্য অনুকূল। অথচ আমরা এখনো ভেষজ কাঁচামালের (রো-মেটেরিয়ালস) জন্য অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। যদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ঔষধি গাছের চাষ সম্প্রসারণ করা যেত, তাহলে একদিকে যেমন কাঁচামালের ঘাটতি দূর হতো, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার উন্মুক্ত হতো। কৃষকরা ধান-গমের পাশাপাশি তুলসী, অশ্বগন্ধা, কালমেঘ, শতাবরী বা নিমের মতো গাছ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করলে তা একটি টেকসই ভেষজ শিল্পের ভিত্তি গড়ে তুলতে পারত। এতে দেশের ভেতরেই গড়ে উঠত একটি শক্তিশালী ফার্মাসিউটিক্যাল চেইন, যা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাকে শতভাগ এগিয়ে নিতে সহায়ক হতো।

কিন্তু সম্ভাবনার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধানও কম নয়। সারা দেশে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে আয়ুর্বেদিক মেডিকেল অফিসার থাকার কথা থাকলেও দীর্ঘদিন তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সরকারি পর্যায়ে আয়ুর্বেদিক সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একটি স্বীকৃত ও প্রাচীন চিকিৎসাব্যবস্থা যদি কাঠামোগত অবহেলার শিকার হয়, তবে তার প্রসার ব্যাহত হওয়াই স্বাভাবিক। স্বাস্থ্যব্যবস্থার বহুমাত্রিকতায় আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাকে সমান্তরাল শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রয়োজন জনবল নিয়োগ, গবেষণা তহবিল এবং নীতিগত অগ্রাধিকার।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের মধ্যে নতুন আশাবাদ দেখা যাচ্ছে। তারা প্রত্যাশা করছেন, আগামী সরকার উপজেলা পর্যায়ে শূন্যপদ পূরণ, ভেষজ চাষে প্রণোদনা এবং মানসম্মত ওষুধ উৎপাদনে নীতিগত সহায়তা দেবে। এই প্রত্যাশা অমূলক নয়; কারণ উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা মানে কেবল আধুনিক হাসপাতাল নয়, বরং বিকল্প ও পরিপূরক চিকিৎসার সমন্বিত বিকাশ।

আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাকে উন্নত ও কার্যকর প্রমাণ করতে হলে আবেগের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক গবেষণা, মাননিয়ন্ত্রণ ও আধুনিক পরীক্ষাগারভিত্তিক যাচাই জরুরি। প্রাকৃতিক চিকিৎসা মানেই অনিয়ন্ত্রিত নয়; বরং সঠিক মানদণ্ডে প্রস্তুত ও প্রয়োগ করলে এটি হতে পারে নিরাপদ ও টেকসই সমাধান। বিশ্ব যখন কেমিক্যাল নির্ভরতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে নতুন করে ভাবছে, তখন বাংলাদেশের উচিত তার ঐতিহ্যগত সম্পদকে আধুনিক কাঠামোয় পুনর্গঠন করা।

স্বাস্থ্য খাতে টেকসই উন্নয়ন চাইলে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাকে প্রান্তিক পর্যায় থেকে মূলধারায় আনার এখনই সময়। ভেষজ সম্পদের বাণিজ্যিক চাষ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পূর্ণাঙ্গ পদায়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং জনসচেতনতাসহ এই চার স্তম্ভে দাঁড়িয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি শক্তিশালী আয়ুর্বেদিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের যে দর্শন আয়ুর্বেদ ধারণ করে, তা কেবল চিকিৎসা নয়—একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণেরও ভিত্তি হতে পারে।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  আয়ুর্বেদ   জাতীয় সম্পদ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

স্বাস্থ্য- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close