মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: একযোগে ১৭ ডেপুটি-সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ      বিকল লঞ্চ থেকে ৯৯৯-এ ফোন, ৮০ যাত্রী উদ্ধার      সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে: ডা. জাহেদ      সালমান শাহর লাশ উত্তোলনের আদেশ বাতিল      সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      
অর্থনীতি
চেইঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ৩২.৮২ বিলিয়ন ডলারের রোডম্যাপ উপস্থাপন
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ৩০ মার্চ, ২০২৬, ১১:০১ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

দেশের অর্থনীতিকে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্যের অস্থিরতা থেকে রক্ষা করতে ২০৪০ সালের মধ্যে জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে চেইঞ্জ ইনিশিয়েটিভ ৩২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের রোডম্যাপ তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বলছে, ‘গতানুগতিক বৈদেশিক অনুদানের অবদান আশঙ্কাজনক হারে কমছে, তাই অনুদানের প্রচেষ্টার পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, মিশ্র এবং বাজার-ভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে কমিউনিটিনির্ভর জ্বালানি নিশ্চিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সোমবার (৩০ মার্চ) ঢাকার সিরডাপের মিলনায়তনে ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’ থিঙ্ক-অ্যান্ড-ডু ট্যাঙ্ক কর্তৃক আয়োজিত ‘নির্ভরশীলতা থেকে সার্বভৌমত্ব: ন্যায়সংগত জ্বালানি রূপান্তরের লক্ষ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ রোডম্যাপ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

গবেষণার প্রধান গবেষক ছিলেন চেইঞ্জ ইনিশিয়েটিভের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এম. জাকির হোসেন খান এবং সহ-গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এম. মোফাজ্জল হোসেন, সামিরা বাশার রোজা ও কাজী কারিনা আরিফ।

গবেষণার মাধ্যমে আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাতের পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে ২০২৬ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে করপোরেট ও বিকেন্দ্রেীকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ কাঠামো উপস্থাপন করা হয়। 

গবেষণায় ২০৪০ সালের মধ্যে জ্বালানির চাহিদা তিনগুণ বেড়ে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৫০০ গিগাওয়াট ঘণ্টা হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে যে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা সময়মতো বাড়াতে ব্যর্থ হলে তা সমৃদ্ধ অর্থনীতি গঠনের সুযোগ নস্যাৎ হতে পারে। বাংলাদেশে প্রচলিত ‘কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল’ জ্বালানি মডেলটি তার আর্থিক এবং কারিগরি সক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছেছে। 

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে সম্পূর্ণ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য মোট ৩২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই বিনিয়োগ দুটি পর্যায়ে বিভক্ত হবে; ২০৩০ সালের মধ্যে ৮ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৩১-২০৪০ সময়কালে ২৪ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার।

গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় ১৭ ডলারের অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব। এর ফলে আগামী ১৫ বছরে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ৫৫৭ বিলিয়ন ডলারের সামগ্রিক সুফল যুক্ত হবে, যা বছরে প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলারের সমান।

রোডম্যাপে মোট ২১ হাজার ৫১৪ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পকারখানার ছাদ থেকে ১২ হাজার ৪৮ মেগাওয়াট, কৃষকদের জন্য সৌরভিত্তিক সেচ থেকে ৩ হাজার ৪৪২ মেগাওয়াট এবং নদী ও জলাশয়ে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১ হাজা র৭২১ মেগাওয়াট।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই পরিকল্পনায় কোনো কৃষিজমি ব্যবহার করা হবে না। শিল্প ভবনের বিদ্যমান ছাদ এবং জলাধার ব্যবহার করে প্রায় ৬০ হাজার একর উর্বর জমি রক্ষা করা সম্ভব, যা খাদ্য নিরাপত্তার সাথে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে না।

গ্রিড স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেমের জন্য ৭ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে দিনের বেলা উৎপন্ন সৌরবিদ্যুৎ সন্ধ্যার পিক আওয়ারের সময় ব্যবহার করা যাবে।

গবেষকরা আরও জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর বার্ষিক ২০ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি ব্যয় রোধে সাহায্য করবে। পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানি চুক্তিতে প্রয়োজনীয় বার্ষিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকির চাপও কমানো যাবে। 

এম. জাকির হোসেন খান বলেন, ‘বাংলাদেশে জ্বালানি রূপান্তর কোনো অর্থায়নের সমস্যা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা, যা জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক দুর্নীতির উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। চলমান সংকটে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ভর করে আস্থা, বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনী অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে যা মানুষ এবং প্রকৃতি উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে সৌরশক্তি কেবল একটি জলবায়ু প্রশমন সরঞ্জাম নয়, বরং জলবায়ু সহনশীলতার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা এবং প্রাণ ও প্রকৃতির ক্ষয়-ক্ষতি হ্রাসের প্রধান ভিত্তি। তাই ঝুঁকিপূর্ণ উপকূল, পাহাড়ি, হাওর ও বাওর অঞ্চলগুলোর মানুষের জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিতে অন্তত ৫০ শতাংশ অনুদান-ভিত্তিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা কোনো দান নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায়সংগত দায়িত্ব। ৩২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে ঋণ-ভিত্তিক অর্থায়ন থেকে সরে অনুদান, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বাজার আস্থার পাশাপাশি জনহিতকর অর্থায়ন ভিত্তিক মডেল দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। জ্বালানি সার্বভৌমত্ব ঋণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে পারে না। বিদ্যমান উচ্চ ব্যয়কে পূর্ণ উৎপাদনশীলতায় রূপান্তর করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতে প্রাকৃতিক অধিকারকেন্দ্রিক শাসন কাঠামো গ্রহণ করতে হবে।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. একে এনামুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তরকে আশাবাদ থেকে বাস্তববাদে নিয়ে যেতে হবে। বর্তমানে দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণ, খণ্ডিত শাসন ব্যবস্থা এবং নিম্ন দক্ষতার কারণে স্থাপিত সক্ষমতা প্রকৃত উৎপাদনে রূপান্তরিত হচ্ছে না। প্রকৃত সার্বভৌমত্ব অর্জনের জন্য আমাদের একটি কেন্দ্রীয় মডেল থেকে গ্রাম-পর্যায়ের বিকেন্দ্রেীকৃত সৌরবিদ্যুতের দিকে যেতে হবে, নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজের ওভারল্যাপ দূর করতে হবে এবং কেবল প্রযুক্তি গ্রহণের চেয়ে কঠোর জবাবদিহিতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।’

ইউএনডিপির কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজার ওয়েইস পারায়ে বলেন, ‘বাংলাদেশে জ্বালানি রূপান্তর কেবল বিদ্যুতের বিষয় নয়; এটি একটি সবুজ শিল্প বিপ্লব। সফল হতে হলে আমাদের অবশ্যই অর্থায়নযোগ্য পাইপলাইন এবং আর্থিক উদ্ভাবন তৈরি করতে হবে যা মিলিয়নকে বিলিয়নে উন্নীত করতে পারে এবং এমন একটি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে যা জ্বালানি-সার্বভৌম এবং অর্থনৈতিকভাবে স্থিতিস্থাপক। এ রোডম্যাপ বাস্তবায়নে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের পরিচালক দিদারুল আলম মন্তব্য করেন, ‘আমদানিকৃত গ্যাস ও কয়লার ওপর আমাদের নির্ভরতা আমাদের বৈশ্বিক বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিচ্ছে। প্রকৃত জ্বালানি সার্বভৌমত্বের জন্য কেবল নীতির চেয়ে বেশি কিছু প্রয়োজন; এটি দেশীয় সম্পদ সংগ্রহ এবং মাল্টি-বায়ার মার্কেটের দিকে একটি পূর্ণ পরিবর্তনের দাবি রাখে। এই রূপান্তর ছাড়া বাংলাদেশ টেকসই পরিবর্তনের সুস্পষ্ট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পরনির্ভরশীলতার চক্রে আটকে থাকবে।’

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লাহ বলেন, ‘জ্বালানি সার্বভৌমত্বের পথে বাংলাদেশের যাত্রা আর কোনো সম্ভাবনা নয়, এটি এখন একটি জরুরি অনিবার্যতা। সৌর ও বায়ুবিদ্যুতে যে গতি সঞ্চার হয়েছে, তা বজায় রাখতে আমাদের ফোকাস এখন কাগুজে লক্ষ্যমাত্রা থেকে বাস্তবায়নের দিকে সরাতে হবে। আমরা প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এবং মাঠ পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালক আবু আলম বলেন, ‘০.৭৩ শতাংশ খেলাপি হারের মাধ্যমে আমাদের সবুজ অর্থায়নের ভিত্তি অত্যন্ত সুদৃঢ়। লক্ষ্যমাত্রা থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বাস্তব সক্ষমতায় পৌঁছাতে আমাদের এখন কাঠামোগত এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে হবে যা আমাদের পরিধিকে সীমিত করে। সোলার সেচ একটি প্রমাণিত সুযোগ যা এখন বড় আকারে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।’

দেশীয় পুঁজি সংগ্রহের বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ইডকলের নির্বাহী পরিচালক ও সিইও আলমগীর মোর্শেদ বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখন একটি বাণিজ্যিক নিশ্চয়তা, তবুও বিশাল এবং অব্যবহৃত সুযোগের তুলনায় সামগ্রিক বিনিয়োগ এখনও অনেক কম। আমাদের সামনের পথে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং মুদ্রার ঝুঁকি কমাতে দেশিয় পুঁজি বাজারকে কাজে লাগানো প্রয়োজন। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং বাজার-ভিত্তিক অর্থায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমরা নীতিগত লক্ষ্যমাত্রা থেকে দেশব্যাপী একটি সম্প্রসারিত জ্বালানি বাস্তবতায় পৌঁছাতে পারি।’

কেকে/এমএ 


আরও সংবাদ   বিষয়:  চেইঞ্জ ইনিশিয়েটিভ   রোডম্যাপ উপস্থাপন  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

অর্থনীতি- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close