আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তামাক নিয়ন্ত্রণ জোরদার ও রাজস্ব বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ নীতিগত প্রস্তাব দিয়েছে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)।
রোববার (১৯ এপ্রিল) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট সংবাদ সম্মেলন : জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে তামাক কর নীতি’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
প্রস্তাবে বলা হয়, ‘বর্তমানে বিদ্যমান সিগারেটের নিম্ন ও মধ্যম মূল্যস্তর একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করা উচিত।’
পাশাপাশি সব ধরনের সিগারেটের ওপর সমভাবে প্রযোজ্য প্রতি ১০ শলাকায় ৪ টাকা নির্দিষ্ট আবগারি শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়।
এই প্রস্তাবটি যৌথভাবে তৈরি করেছে ইকোনমিক্স ফর হেলথ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিক্স (আইএইচই)।
অনুষ্ঠানে বক্তারা জানান, এই কর কাঠামো বাস্তবায়িত হলে তামাক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিক্সের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন এন. শিমুল।
তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবিত কর ব্যবস্থা কার্যকর হলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবেন। একই সঙ্গে প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার তরুণ নতুন করে তামাক ব্যবহার শুরু করা থেকে বিরত থাকবে।’
শাফিউন এন. শিমুল আরও বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক ও সমসংখ্যক তরুণের অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।’
এতে তামাক ব্যবহারের হার প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট কমে আসবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
‘রাজস্বের ক্ষেত্রে বছরে মোট আদায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা বেশি।’
অনুষ্ঠানে ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন বলেন, ‘তামাকজনিত রোগের কারণে যে স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়, তা তামাক থেকে অর্জিত রাজস্বের তুলনায় অনেক বেশি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আয় বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে তামাকের ওপর কর কাঠামো হালনাগাদ করা জরুরি।’
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘তামাক নিয়ন্ত্রণে করনীতি ও আইন প্রয়োগ সবচেয়ে কার্যকর উপায়।’
তার মতে, তামাকের দাম বাড়ালে রাজস্ব কমে যাবে—এ ধরনের ধারণার কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। বরং দাম বাড়ানো তরুণদের ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত রাখতে সহায়তা করে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করে।
হোসেন জিল্লুর রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘সম্প্রতি পাস হওয়া তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশে ই-সিগারেটের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে, যার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।’
এতে তরুণদের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে সরকারের আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
সমাপনী বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘কর ও আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যশিক্ষা জোরদার করে তরুণদের তামাকের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।’
অন্য বক্তারা বলেন, ‘দেশের বর্তমান রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তামাক কর সংস্কার এখন সময়ের দাবি।’
তাদের মতে, কার্যকর তামাক করনীতি একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব বাড়াতে সক্ষম, অন্যদিকে তামাক ব্যবহার কমিয়ে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কেকে/এমএ