বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ এখন সবচেয়ে বেশি বিস্তৃত রোগগুলোর মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই অর্থায়নের অভাব এবং পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ না থাকায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগ পুরোপুরি সফল হচ্ছে না। তাই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
বুধবার (১৩ মে) বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বিএমএ ভবনে আয়োজিত ‘উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ দাবি ওঠে।
গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহযোগিতায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রতি বছর ১৭ মে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘কন্ট্রোলিং হাইপারটেনশন টুগেদার’।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’ অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ। সভায় জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে ঘটে এবং এর অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মারা গেছেন ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষ। এর মধ্যে ৫২ শতাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল উচ্চ রক্তচাপ। এছাড়া বিশ্বে প্রতিবছর ১ কোটিরও বেশি মানুষ উচ্চ রক্তচাপের কারণে মারা যান।
বক্তারা বলেন, সরকার তৃণমূল পর্যায়ে বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ কার্যক্রম শুরু করলেও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় দেশের সব কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক বলেন, ‘উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে শুধু বাজেট বাড়ানো নয়, বরাদ্দের সঠিক বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে।’
কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘সরকার কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে কাজ করছে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগ ও মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।’
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ডা. মলয় কান্তি মৃধা গবেষণাভিত্তিক প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
চ্যানেল ২৪-এর নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম বলেন, ‘উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নীতিনির্ধারকদের সক্রিয় করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল বলেন, ‘উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়নকে কার্যকর বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।’
সভায় আরও বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল অফিসার ডা. গীতা রানী দেবী, বারডেম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ এবং প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চ্যানেল আইয়ের চিফ নিউজ এডিটর মীর মাশরুর জামান রনি। সভাপতিত্ব করেন জিএইচএআই বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস।
কেকে/ এমএস