পুলিশ কনস্টেবল মো. কামরুজ্জামান শিহাব ও তার স্ত্রী হেনা জামানের বিরুদ্ধে গার্মেন্টস ব্যবসায়ের আড়ালে কোটি টাকা আত্মসাৎ, প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মিথ্যা মামলা দেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে।
বুধবার (২১ মে) ঢাকায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এসব অভিযোগ তুলে ধরে তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, অভিযুক্ত দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুর, আশুলিয়া ও খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিত্যক্ত বা অচল গার্মেন্টস কারখানার ফ্লোর ও টিনশেড ভাড়া নিয়ে সেগুলো সচল শিল্পপ্রতিষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করতেন। পরে বিভিন্ন ব্যক্তিকে অংশীদার, শেয়ারহোল্ডার কিংবা বিনিয়োগকারী বানানোর প্রলোভন দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেন। বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের চেক দেওয়া হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই চেক ডিজঅনার হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, টাকা নেওয়ার পর ব্যবসায়ে লোকসান, করোনা মহামারি, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকট কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হতো। পরবর্তী পাওনাদাররা টাকা চাইলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা, ভয়ভীতি ও হয়রানির আশ্রয় নেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মো. শামছুল ওয়াহেদ খন্দকার জানান, তিনি বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার বাসিন্দা। ২০২২ সাল থেকে চারটি চেকের বিপরীতে চার ধাপে তিনি মোট ৫৫ লাখ টাকা হেনা জামানকে দেন। তাকে একটি গার্মেন্টস কারখানার অংশীদার ও চেয়ারম্যান করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী তিনি প্রতারণার শিকার হন।
গাজীপুরের ভিমবাজার এলাকায় একটি পরিত্যক্ত গার্মেন্টস কারখানা নিজেদের মালিকানাধীন দাবি করে নেত্রকোনার পূর্বধলার ব্যবসায়ী শোয়াইব আহমেদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়। প্রকৃত মালিক না হয়েও কারখানাটির মূল্য চার কোটি টাকা দেখিয়ে দুই কোটি টাকা নেওয়া হয়। পরে তদন্তে প্রকৃত মালিক হিসেবে ইব্রাহীম নামের ব্যক্তির তথ্য উঠে আসে।
আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় প্রায় ২০ লাখ টাকায় কেনা একটি টিনশেড কারখানার মূল্য ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা দেখিয়ে শোয়াইব আহমেদের কাছ থেকে ৯০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়। ওই কারখানার নাম পরিবর্তন করে “নিউ বিডি নিট গার্মেন্টস” রাখা হয়। পরে আর্থিক অসঙ্গতি ও অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে ভুয়া ভাউচার তৈরির অভিযোগে অংশীদারদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
শোয়াইব আহমেদ অভিযোগ করেন, কারখানার প্রকৃত মূল্য গোপন রেখে তার কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কম মূল্যের মেশিন বেশি দামে কেনা দেখিয়ে ভুয়া ভাউচার তৈরি করা হয়।
ভুক্তভোগী বেবী নাজনীন ময়না অভিযোগ করেন, হেনা জামান তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা নিয়ে আত্মগোপনে চলে যান। এ ঘটনায় তিনি ঢাকার আদালতে চেক ডিজঅনার মামলা দায়ের করেছেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, কামরুজ্জামান শিহাব নিজেকে অনেক সময় “ডিবি পুলিশের এসআই” পরিচয় দিতেন। যদিও তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন কনস্টেবল ও দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন গোয়েন্দা পুলিশে (ডিবি) কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত আছেন।
অভিযোগকারীরা জানান, অভিযুক্ত দম্পতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে একাধিক চেক ডিজঅনার, প্রতারণা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও অর্থ আত্মসাতের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৩০ লাখ, ৪০ লাখ, এক কোটি ৫০ লাখ ও পাঁচ লাখ টাকার চেক ডিজঅনার মামলা ছাড়াও প্রতারণা ও চাঁদাবাজির একাধিক মামলা রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, যারা টাকা ফেরত চাইতেন তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই উল্টো মিথ্যা মামলা দেওয়া হতো। পুলিশি প্রভাব খাটানোর ভয় দেখানো, জাল কাগজপত্র তৈরি ও মিথ্যা সাক্ষী দাঁড় করানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী সোহাগের প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়। তার কাছ থেকেও প্রায় ২৪ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে তাকে ও তার স্ত্রীকে বিভিন্ন হলফনামা ও মামলায় সাক্ষী হতে বাধ্য করা হয়।
ভুক্তভোগীরা বলেন, গত দুই বছর ধরে অভিযুক্তদের দৃশ্যমান কোনো ব্যবসায় না থাকলেও তাদের বিপুল সম্পদের তথ্য সামনে এসেছে। ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন এলাকায় জমি, বহুতল ভবনে ফ্ল্যাট, উত্তরা এলাকায় বাসা ও অভিজাত জীবনযাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
একজন কনস্টেবল হিসেবে চাকরিরত অবস্থায় এত সম্পদের উৎস তদন্তের দাবি জানান তারা।
সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানানো হয়।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে এ ধরনের বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বের নামে প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান ভুক্তভোগীরা।
কেকে/এমএ