ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব, নতুন পোশাক আর প্রিয়জনদের সঙ্গে সুখ ভাগাভাগির সময়। বছরের অন্য সময় যত অভাব-অনটনই থাকুক না কেন, ঈদকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মনে থাকে একটুখানি স্বপ্ন আর আনন্দের প্রত্যাশা। কিন্তু এবার সেই আনন্দ যেন হারিয়ে গেছে কিশোরগঞ্জের হাওরপাড়ের হাজারো কৃষক পরিবারের জীবন থেকে। ঘরে নেই উৎসবের প্রস্তুতি, নেই নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য, নেই শিশুদের মুখে স্বাভাবিক হাসি। টানা অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে চলতি বোরো মৌসুমে ভয়াবহ ফসলহানির কারণে জেলার কৃষকদের জীবনে নেমে এসেছে চরম হতাশা, অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকট।
হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা পুরোপুরি নির্ভর করে বোরো ধানের ওপর। বছরের এই একটি ফসলকে কেন্দ্র করেই চলে তাদের সংসারের পুরো হিসাব-নিকাশ। ধান বিক্রির টাকায় সংসার চালানো, এনজিও বা মহাজনের ঋণ শোধ, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, চিকিৎসা ব্যয়, এমনকি ঈদসহ বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজনের খরচও মেটানো হয়। কিন্তু মৌসুমের শেষদিকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই পানিতে ভেসে গেছে।
কোথাও আধাপাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে, কোথাও আবার কেটে রাখা ধান প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। অনেকে শেষ চেষ্টা হিসেবে ধান ঘরে তুললেও রোদ না থাকায় তা শুকাতে পারেননি। ফলে ভেজা ধান কালচে হয়ে গেছে, যা বাজারে ন্যায্য দামে বিক্রি করাও সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পাইকার এসব ধান কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে কৃষকদের লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়ে গেছে।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা। অনেকেই এনজিও, সমিতি কিংবা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। কেউ গরু বিক্রি করে, কেউ জমি বন্ধক রেখে ধান চাষ করেছিলেন ভালো ফলনের আশায়। কিন্তু ফসলহানির কারণে এখন তারা চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানোই যেখানে কঠিন হয়ে পড়েছে, সেখানে ঈদের আনন্দ তাদের কাছে এখন বিলাসিতা মাত্র।
বিশেষ করে জেলার মিঠামইন, ইটনা, অষ্টগ্রাম, নিকলী, করিমগঞ্জ ও তাড়াইলসহ বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ দুর্দশা। হাওরের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, এবার ঈদকে ঘিরে নেই আগের মতো কোনো আমেজ। বাজারে মানুষের ভিড় কম, কাপড়ের দোকানে নেই কেনাকাটার চাপ। বরং চারদিকে বিরাজ করছে হতাশা আর অনিশ্চয়তার ছাপ। অনেক কৃষক বলছেন, জীবনে বহু দুর্যোগ দেখেছেন, কিন্তু এমন অসহায় পরিস্থিতির মুখোমুখি তারা আগে কখনো হননি।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর ধান রোপণের খরচের তুলনায় ধান কাটা ও ঘরে তুলতে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি খরচ করতে হয়েছে। বৈরী আবহাওয়া ও শ্রমিক সংকটের কারণে বাড়তি মজুরি গুনতে হয়েছে। এরপরও শেষ রক্ষা হয়নি। কেউ কেটে রাখা ধান রাতের বৃষ্টিতে হারিয়েছেন, কেউ আবার ধার করে শ্রমিক এনে ধান কাটলেও তা শুকাতে না পেরে লোকসানের মুখে পড়েছেন।
কাস্তুল গ্রামের কৃষক আবুল হাসান বলেন, “সারা বছর এই একটা ফসলের আশায় থাকি। এই ধান বিক্রি করেই সংসার চলে, ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ দেই, ঋণ শোধ করি। এবার টানা বৃষ্টি আর ঢলের পানিতে সব শেষ হয়ে গেছে। অনেক কষ্ট করে কিছু ধান তুলছিলাম, কিন্তু শুকাতে না পেরে সেগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে। বাজারে নিয়ে গেলে কেউ ঠিকমতো দাম দিতে চায় না। সামনে ঈদ, কিন্তু ঘরে চাল কেনার টাকাও নেই। বাচ্চারা নতুন জামা চায়, কিন্তু তাদের মুখের দিকে তাকানো ছাড়া কিছুই করার নেই।”
ইটনার ধনপুর এলাকার কৃষক আব্দুল করিম বলেন, “এবার ধান কাটতে গিয়ে আমাদের অনেক বেশি খরচ হয়েছে। শ্রমিক সংকটের কারণে দ্বিগুণ টাকা দিয়ে ধান কাটতে হয়েছে। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। কাটা ধান খলায় রেখে দিয়েছিলাম, রাতের বৃষ্টিতে সব পানির নিচে চলে গেছে। এখন এনজিওর কিস্তি কীভাবে দেবো, সংসার কীভাবে চলবে—সেই চিন্তায় ঘুম আসে না। ঈদ সামনে, অথচ ঘরে কোনো আনন্দ নেই। ছোট ছেলে নতুন জুতা কিনে দেওয়ার জন্য কাঁদছে, কিন্তু আমার পকেটে একটা টাকাও নেই।”
অষ্টগ্রামের এক কৃষক বলেন, হাওরের মানুষ সারা বছর এই বোরো ধানের ওপর নির্ভর করে বাঁচে। এই ধান না হলে আমাদের কিছুই থাকে না। এবার যে ক্ষতি হয়েছে, তা সামাল দেওয়া খুব কঠিন। ঘরে খাবার কমে গেছে, বাজারে ধারও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন সরকারের সহায়তার অপেক্ষায় আছি। দ্রুত সাহায্য না পেলে অনেক পরিবার না খেয়ে থাকার অবস্থায় পড়বে।
তাড়াইল উপজেলার কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, “পানি থেকে ধান তুলে এনে রাস্তায়, উঠানে, যেখানে পারছি শুকানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু রোদ নেই। ধান কালো হয়ে গেছে। পাইকাররা এসে বলে এই ধান নষ্ট, কম দামে ছাড়া কিনবে না। আমরা তো শেষ হয়ে গেলাম। সারা বছরের স্বপ্ন পানিতে ভেসে গেছে। এবার ঈদ আমাদের কাছে আনন্দের না, কষ্টের ঈদ।”
নিকলীর কৃষক রহিম মিয়া বলেন, “ঈদ আসতেছে শুনে আগের বছরগুলোতে বাচ্চারা অনেক খুশি থাকত। এবার তারা কিছু চায়ও না, কারণ বুঝে গেছে ঘরে টাকা নাই। একজন বাবার জন্য এর চেয়ে কষ্টের কিছু হতে পারে না। সারাদিন হাওরে পরিশ্রম করেও এবার খালি হাতে ঘরে ফিরতে হয়েছে।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, অতিবৃষ্টি ও ঢলের পানিতে কিশোরগঞ্জে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৫২ হাজার ৫৯৫ জন কৃষক। জেলায় মোট ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
অন্যদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৪৩ হাজার ৮৩২ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৪৭৩ জন কৃষকের জন্য প্রণোদনার অনুমোদন পাওয়া গেছে। অনুমোদিত কৃষকদের প্রত্যেককে ১৫ কেজি চাল ও ৩ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। তবে মোট ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এখনো প্রায় ২৩ হাজারের বেশি কৃষক সরকারি সহায়তার বাইরে রয়েছেন। ঈদের আগে এই কৃষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তা।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন পুরোপুরি কৃষিনির্ভর হওয়ায় এমন দুর্যোগে দ্রুত সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে তাদের আর্থিক সংকট আরও গভীর হবে। বিশেষ করে ঈদের আগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
তারা বলছেন, শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, ভবিষ্যতে আগাম দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থায়ী উদ্যোগও নিতে হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, দ্রুত প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সরকারি প্রণোদনা, খাদ্য সহায়তা ও সহজ শর্তে কৃষিঋণ পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা করা হোক।
পাশাপাশি ভবিষ্যতে হাওরাঞ্চলকে রক্ষায় টেকসই বাঁধ নির্মাণ, আগাম বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার এবং ফসল সুরক্ষায় কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
হাওরের কৃষকরা এখন সরকারের সহায়তার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। এবারের ঈদ হয়তো তাদের জন্য আনন্দহীন হয়ে উঠবে। তারপরও তারা চান—আগামী দিনে যেন আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পান, সন্তানদের মুখে আবার হাসি ফুটুক, আর হাওরের মাঠ আবার সোনালি ধানে ভরে উঠুক।
কিশোরগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. বদরুদ্দোজা বলেন, “কৃষি বিভাগের তথ্যের ভিত্তিতে ৪৩ হাজার ৮৩২ জন কৃষকের তালিকা পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ২৯ হাজার ৪৭৩ জনের প্রণোদনা অনুমোদন হয়েছে। প্রত্যেক কৃষককে ১৫ কেজি চাল ও ৩ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে। বরাদ্দ পেলেই ঈদের আগে বিতরণের চেষ্টা করা হবে।”
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, “অতিবৃষ্টিতে প্রায় ৫২ হাজার ৫৯৫ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২৬০ কোটি টাকা।”
কেকে/এমএ