মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার কাওয়াদীঘি হাওরে জলাবদ্ধতার কারণে চলতি মৌসুমে সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে পানিতে তলিয়ে আছে আউশ ধান। হাওরের পানি সময়মতো নিষ্কাশন না হওয়ায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
কৃষকদের অভিযোগ, ফসল রক্ষায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মনু সেচ প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউস নিয়মিত ও প্রয়োজন অনুযায়ী চালানো হচ্ছে না। এতে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে আছে। পাম্প হাউস পরিচালনায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঘের ইজারাদারদের একটি অংশের যোগসাজশের অভিযোগও করেছেন তারা।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, গত বোরো মৌসুমেও জলাবদ্ধতার কারণে তারা আশানুরূপ ফলন ঘরে তুলতে পারেননি। এবার আউশ ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমনের বীজতলার চারার বয়স পেরিয়ে গেলেও জমি প্রস্তুত করা সম্ভব হচ্ছে না।
কাওয়াদীঘি হাওরপারের কান্দিগাঁও গ্রামের কৃষক শেখ আহবাবুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, “বিভিন্ন অজুহাতে হাওরের পানি নিষ্কাশন না করে ঘের ইজারাদারদের স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে। হাওরে ইজারাদাররা পোনা মাছ ছাড়ায় সেগুলো বড় হওয়ার জন্য পাম্প চালানো হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।”
কৃষক কামাল হোসেন ও ফজলুর রহমান বলেন, “আউশ ধান এখন কোমরসমান পানির নিচে। পাম্পগুলো নিয়মিত চালানো হলে পানি কমত এবং ফসল রক্ষা করা সম্ভব হতো।”
তাদের ভাষ্য, পানি দুই থেকে আড়াই ফুট কমানো গেলে সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা সম্ভব হতো। এতে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাওরের পানি নিয়ন্ত্রণে পাম্প হাউসের কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালিত না হওয়ায় প্রতিবছরই জলাবদ্ধতা ও ফসলহানির শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতির কারণে সহস্রাধিক কৃষক পরিবার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন।
কাওয়াদীঘি হাওর মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গঠিত জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চল। জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সদর ও রাজনগর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রায় সাড়ে ২২ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে হাওরটি বিস্তৃত। এর জলাবদ্ধতা নিরসন ও কৃষি রক্ষায় মনু প্রকল্পের আওতায় রাজনগরের কাশিমপুরে আটটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প নিয়ে পাম্প হাউস স্থাপন করা হয়।
প্রকল্পের আওতায় বর্ষাকালে হাওরের অতিরিক্ত পানি পাম্পের মাধ্যমে কুশিয়ারা নদীতে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজের জন্য পানির ব্যবস্থাপনাও করা হয়। তবে চলতি মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিরসনে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে পাম্প হাউসের কার্যকারিতা নিয়ে।
হাওর রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব খছরু চৌধুরীর অভিযোগ, হাওরের পানির স্তর পরিমাপের মিটারস্কেল ২০০৪ সালে সরিয়ে পাম্প হাউসের কাছের একটি গভীর ক্যানেলে স্থাপন করা হয়। এতে পানি নিয়ন্ত্রণে অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, “সরেজমিনে আউশের ক্ষেত পানিতে তলিয়ে থাকার চিত্র দেখা গেছে। দ্রুত পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করে পানি নিষ্কাশন এবং আমন চাষের উপযোগী পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলিদ বলেন, “বর্তমানে হাওরে পানির উচ্চতা ৮ দশমিক ৬০ মিটার। এটি সাড়ে আট মিটারের মধ্যে থাকার কথা। মিটারস্কেল সরানোর বিষয়ে তার জানা নেই। বর্তমান পাম্প হাউসের সক্ষমতা অনুযায়ী বৃষ্টিহীন অবস্থায়ও দুই ফুট পানি কমাতে অন্তত ৪০ দিন সময় লাগবে। এ জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন।”
এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসন ও কাশিমপুর পাম্প হাউস সচলের দাবিতে সম্প্রতি হাওরপারের কৃষকেরা মৌলভীবাজার শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। পরে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দেন তারা।
কেকে/সাশ