দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে গত কয়েক বছর ছিল অস্থিরতা, পরিবর্তন এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের সময়। শ্রীলঙ্কায় গণআন্দোলন, বাংলাদেশে ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান, নেপালে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে জেনজি-ভিত্তিক রাজনৈতিক সাফল্য এবং ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় আসা সিজেপি বা ‘ককরোচ জনতা পাটি’ এই চারটি ঘটনাকে অনেক বিশ্লেষক একই ধারার অংশ হিসেবে দেখার চেষ্টা করছেন।
তাদের মতে, এ অঞ্চলে প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তির প্রতি জনগণের ক্রমবর্ধমান অনাস্থা এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির অনুসন্ধানই এসব ঘটনার অভিন্ন ভিত্তি। যদিও শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল এবং ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক নয়, তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট যে, তরুণ ভোটার, সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমনির্ভর জনমত এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি হতাশা সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এই সমীকরণের প্রথম বড় উদাহরণ দেখা যায় ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায়।
কোভিড পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শূন্যে নেমে আসা, জ্বালানি ও খাদ্যের তীব্র সংকট, দীর্ঘ লোডশেডিং এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতির কারণে দেশটিতে জনঅসন্তোষ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, তরুণ পেশাজীবী এবং নাগরিক সমাজের সদস্যরা দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ‘আরাগালায়া’ (সংগ্রাম) নামে পরিচিত এক গণআন্দোলনের সূচনা করেন। এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর বিকেন্দ্রীভূত নেতৃত্ব। কোনো একক রাজনৈতিক দল নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত তরুণরাই আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
আন্দোলনের চাপের মুখে ২০২২ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান এবং পরে পদত্যাগ করেন। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি ছিল জনচাপের মুখে ক্ষমতাসীন নেতৃত্বের পতনের এক ঐতিহাসিক ঘটনা। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান ছিল মূলত দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, গনতন্ত্রহীনতা, বিরোধী দল ও মত দমনের নিমিত্তে নিপীড়ন, নির্যাতন এবং সর্বোপরি একদলীয় রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা প্রশ্নে তরুণ সমাজের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এখানেও আন্দোলনের অন্যতম শক্তি ছিল মূলত তরুণ প্রজন্ম, যারা দলীয় পরিচয়ের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে জবাবদিহিতা, অংশগ্রহণমূলক শাসন এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নকে; যদিও পরে এই প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বশীল জাতীয় নাগরিক পার্টি নামক একটি রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। একইভাবে নেপালে সাম্প্রতিক জেনজি মুভমেন্টও প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অসন্তুষ্ট তরুণদের নতুন রাজনৈতিক আকাক্সক্ষার প্রতিফলন।
রাজতন্ত্রের পতন, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক পরীক্ষার পরও নেপালের তরুণ সমাজ মনে করেছে যে, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সেখানে ২০২৫ সালে জেনারেশন জেড (এবহ-ত) বা তরুণদের নেতৃত্বে একটি দুর্নীতিবিরোধী গণঅভ্যুত্থান ও আন্দোলন হয়েছিল। এই গণআন্দোলনের ফলে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর তরুণ র্যাপার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র (বালেন) শাহ’র নেতৃত্বে নেপালে নতুন সরকার গঠিত হয়।
এই তিন দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যখন প্রচলিত রাজনৈতিক শক্তি জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হয়, তখন বিকল্প শক্তির জন্য একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। এই শূণ্যতা যারা পূরণ করতে পারে, তাদের হাতেই ক্ষমতাসীনদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে।
এবার আসি ভারতের কথায়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক এই দেশে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিজেপি একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে দলটি কেবল টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচনি সাফল্যই অর্জন করেনি, বরং জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিজেদের অবস্থান সুসংহতও করে নিয়েছে। তবে এত কিছুর পরও দলটির বিরুদ্ধে রয়েছে এন্তার অভিযোগ। এর মধ্যে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করণের অভিপ্রায়ে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বিরোধী দলগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা, সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেই বিরোধী দলীয় নেতাদের অন্যায়ভাবে জেলে দেওয়া এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে দেশের সাধারণ জনগণের মাঝে বিভাজন, অস্থিরতা ও দাঙ্গার মতো ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে আরও বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে ভারতীয়দের মধ্যে বিজেপি সরকারবিরোধী ক্ষোভ ও অভিযোগ ধীরে ধীরে ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার মতো জনরোষে পরিণত হচ্ছে। সেই অভিযোগ ও ক্ষোভের কারণ হিসেবে রয়েছে শিক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ব্যর্থতা, ক্রমবর্ধমান যুব বেকারত্ব এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না করা, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ বৃদ্ধি, বিরোধী মত ও আন্দোলনের প্রতি প্রশাসনিক দমন-পীড়ন ইত্যাদি।
রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, কোনো দেশে কোনো সরকারই দমন-পীড়ন করে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি। তাই বিজেপির ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন উঠছে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তাদের ক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করতে পারে, এমনকি নিকট ভবিষ্যতে অব্যর্থ আন্দোলনের মাধ্যমে তাদেরকে ক্ষমতাচ্যুতও করতে পারে এমন বিকল্প শক্তি কি তৈরি হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আলোচনায় আসছে সিজেপি। সিজেপি বা ককরোচ জনতা পার্টিকে অনেকেই একটি প্রতীকী রাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। ‘ককরোচ’ শব্দটিকে এখানে টিকে থাকার ক্ষমতা, প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও অস্তিত্ব বজায় রাখার মানসিকতা এবং সাধারণ মানুষের সংগ্রামী চেতনার রূপক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
যদিও সিজেপির জনপ্রিয়তা বা সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে এখনই চূড়ান্ত কোনো মূল্যায়ন করা কঠিন, তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়, দলটি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বয়ানের বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, হতাশা এবং বিকল্প রাজনীতির আকাক্সক্ষাকে সামনে আনার চেষ্টা করছে। ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের শুরু হয়েছিল ছোট ও উপহাসের পাত্র হিসেবে বিবেচিত আন্দোলন থেকে। শুরুতে যেসব উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, পরবর্তীতে সেগুলোই জনমতের শক্তিশালী বাহন হয়ে উঠেছে। অনেকে মনে করেন, বিজেপির প্রধান প্রতিপক্ষ কংগ্রেস বা আঞ্চলিক দলগুলো হলেও বাস্তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ক্লান্তি। ক্লান্তি থেকে জনরোষ। আর এই জনরোষ থেকেই হালে সৃষ্টি হয়েছে তরুণদের ককরোচ জনতা পার্টি। এমনিতেই দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে যে কোনো সরকারের বিরুদ্ধে কিছু স্বাভাবিক অসন্তোষ তৈরি হয়। তার ওপর বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ- এসব প্রশ্ন যদি আরও তীব্র হয়, তাহলে তা বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপালের অভিজ্ঞতা সেটিই বলে। এই তিন দেশে বিদ্যমান শক্তিশালী রাজনৈতিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে মূলত জনগণের জমে থাকা অসন্তোষ। সুতরাং ভারতে যদি একই ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে অবশ্যই সিজেপির মতো কোনো নতুন রাজনৈতিক শক্তি সেই অসন্তোষের প্রতিনিধিত্ব করবে। তাহলে কি আমরা বলতে পারি, সিজেপির উত্থানে বিজেপির পতনঘণ্টা বেজে গেছে?
না, সিজেপির উত্থানকে বিজেপির পতনের সূচনা বলা এখন অতিরঞ্জিত হবে। কারণ ভারতের মতো বিশাল ও বহুমাত্রিক গণতন্ত্রে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করতে দীর্ঘ সময়, শক্তিশালী সংগঠন এবং ধারাবাহিক জনসমর্থনের প্রয়োজন হয়। তবে এটাও সত্য যে, ইতিহাসে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের আগে প্রায়ই ছোট ছোট সংকেত দেখা যায়। জনগণের মধ্যে বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তার বিস্তার, তরুণদের নতুন নেতৃত্বের সন্ধান এবং প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি হতাশা- এসবই ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের পূর্বাভাস হতে পারে। সেই অর্থে সিজেপি হয়তো এখনই বিজেপির সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তার বাহক। সেই বার্তাটি হলো, জনগণ সবসময় বিকল্প খোঁজে, আর গণতন্ত্রে কোনো রাজনৈতিক শক্তিই চিরস্থায়ী নয়।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/এজে