শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোনো দলীয় কার্যালয় নয়। অথচ বছরের পর বছর ধরে আমরা দেখে আসছি, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণও হাতবদল হয়। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন হয়ে ওঠে ক্যাম্পাসের ‘অলিখিত শাসক’ আবাসিক হলে সিট বণ্টন, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, এমনকি ভর্তি-পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস পর্যন্ত এই নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
এবারের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন বিরোধী দলের ছাত্র সংগঠনের দখলে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদগুলো। ফলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে পারছে না। যার ফলে একটু দেরিতে হলেও সেই পুরোনো দখলদারিত্বের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে দুই সংগঠনই। বিশ্লেষকদের মতে যতদিন ক্যাম্পাসে জাতীয় রাজনীতির ‘লেজুড়বৃত্তিক’ ছাত্র সংগঠন থাকবে, ততদিন এই ধরনের সহিংসতা বন্ধ হবে না। কারণ এই সংগঠনগুলোকে প্রশ্রয় দেয় তাদের মূল দল নিজেই।
লক্ষণীয়, এসব সংঘর্ষের নেপথ্যে নিছক আদর্শিক বিরোধ নয়, বরং হকার-খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়সহ আর্থিক স্বার্থের প্রশ্নও জড়িত বলে বিশ্লেষকেরা ইঙ্গিত দিয়েছেন। অর্থাৎ ক্যাম্পাস দখলের লড়াই কেবল রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রশ্ন নয়, তার সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এই বাস্তবতা আরও বেশি উদ্বেগজনক, কারণ তা প্রমাণ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সহিংসতার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত, নিছক প্রশাসনিক তৎপরতায় তা উপড়ে ফেলা কঠিন।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয়, ছাত্র রাজনীতির এই সহিংস চর্চা যখন হাসপাতালের ভেতরেও ঢুকে পড়ে, চিকিৎসাধীন আহতদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তখন তা কেবল দুই সংগঠনের বিরোধ থাকে না তা পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। জুলাই অভ্যুত্থানের যে চেতনা বৈষম্যহীন, সহিংসতামুক্ত একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার তারই দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ক্যাম্পাসে রক্তপাতের এই পুনরাবৃত্তি সেই চেতনার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমরা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা বলতে চাই দলীয় ছাত্র সংগঠনের ক্যাম্পাস-রাজনীতি থেকে লেজুড়বৃত্তি নিরসনে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত ও স্বাধীনভাবে অনুষ্ঠিত করতে হবে, যাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত না হয়ে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিটি সংঘর্ষের ঘটনায় প্রশাসনকে অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করে প্রকৃত উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে কোনো পক্ষকে দল দেখে ছাড় দেওয়া চলবে না।
ক্যাম্পাসে অস্ত্র, রড, রামদা বহন ও বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত ও স্থায়ী নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। হলের সিট বণ্টন, টেন্ডার, চাঁদাবাজির মতো অর্থনৈতিক স্বার্থের রাজনীতিকরণ বন্ধে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আর্থিক লোভ সহিংসতার জ্বালানি না হতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজ নিজ সহযোগী ছাত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে সহিংসতায় জড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
ছাত্র রাজনীতি কোনো অভিশাপ নয়; বরং তা হতে পারে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব তৈরির সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু যখন তা দলীয় লেজুড়বৃত্তি আর ক্ষমতা দখলের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন শিক্ষাঙ্গন হয়ে ওঠে রণক্ষেত্র, আর শিক্ষার্থীরা হয় বলির পাঁঠা।
জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আমরা প্রত্যাশা করি, রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সবাই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করবে যে, ক্যাম্পাসে সহিংসতার এই চক্র ভাঙতে না পারলে অভ্যুত্থানের যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম, তা অধরাই থেকে যাবে। এখনই সময়, ক্যাম্পাসকে রাজনৈতিক দখলদারির মঞ্চ নয়, জ্ঞানচর্চা ও গণতান্ত্রিক বিকাশের অভয়ারণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার।
কেকে/ এমএস