চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নিজস্ব মূল্যায়ন বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুমোদিত ২৯ হাজার ৭০০টি ভবনের প্রায় ৯৯ শতাংশই অনুমোদিত নকশা মেনে তৈরি হয়নি। এই একটি পরিসংখ্যানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি শহরের পরিকল্পনাহীনতার পুরো ইতিহাস যেখানে ছয়তলার অনুমতি নিয়ে দশ-বারো তলা উঠে যায়, পার্কিংয়ের জায়গা হয়ে যায় দোকান, খালের ওপর দাঁড়িয়ে যায় দালান, আর পুকুর-জলাধার ভরাট হয়ে জন্ম নেয় নতুন আবাসিক প্রকল্প।
একটি ভবন রাতারাতি নিয়মভঙ্গ করে গড়ে ওঠে না। ভিত্তি থেকে ছাদ পর্যন্ত পৌঁছাতে মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর সময় লাগে। আইন অনুযায়ী এই পুরো সময় সিডিএর হাতে পরিদর্শনের, অনিয়ম শনাক্তের এবং প্রয়োজনে নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা থাকে। তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক একটি ছয়তলা ভবন যখন সপ্তম, অষ্টম বা নবম তলায় পা রাখছিল, তখন কি কেউ দেখেননি? দেখলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন, আর না দেখে থাকলে তদারকি ব্যবস্থাটাই বা কী কাজে লাগল? উনত্রিশ হাজার ভবনের অনিয়ম একদিনে জমা হয়নি; এটি বছরের পর বছর ধরে চলা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সঞ্চিত ফল। শুধু ভবনমালিকের ওপর দায় চাপিয়ে দিলে এ বাস্তবতাকে খাটো করে দেখা হবে অনুমোদন ও তদারকি ব্যবস্থার দায়ও এড়ানোর সুযোগ নেই।
নগরায়ণের চাপে চট্টগ্রামের বহু পুকুর, খাল ও জলাধার হারিয়ে গেছে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও জলাধারকে সমতল ভূমি দেখিয়ে নকশা অনুমোদনের অভিযোগও উঠেছে, যার সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করা কঠিন। একইসঙ্গে বহু ভবনের নিচতলার নির্ধারিত পার্কিং এখন দোকান, ব্যাংক বা গুদাম ফলে গাড়ি নামে সড়কে, আর যানজট বাড়ে। বৃষ্টির পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ খাল, ড্রেন, খোলা জায়গা সংকুচিত হওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা। এ সবকিছুর সুতো গিয়ে মেশে একই জায়গায়—নকশাবহির্ভূত নির্মাণ। আর দুর্যোগের সময়, আগুন লাগলে বা ভূমিকম্প হলে, ভবনের চারপাশে প্রয়োজনীয় ফাঁকা জায়গা না থাকায় উদ্ধার কাজ পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থাৎ নকশা লঙ্ঘন কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, এটি সরাসরি জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
সিডিএর নতুন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন নকশাবহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন এবং বলেছেন, নিয়ম অমান্যকারী ভবনে গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানির সংযোগ দেওয়া হবে না। কয়েকটি ভবন ও হাসপাতালকে অবৈধ অংশ অপসারণের নোটিসও দেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগ স্বাগত জানানোর মতো। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় যে ২৯ হাজার ভবন ইতোমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে, তাদের কী হবে? কতগুলোর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কতগুলোর অবৈধ অংশ ভাঙা হয়েছে, আর দায়িত্বে অবহেলার জন্য কতজন কর্মকর্তা জবাবদিহির মুখোমুখি হয়েছেন এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর ছাড়া নতুন কঠোরতার ঘোষণা শুধু কাগুজে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অনুমোদিত ২৯ হাজার ৭০০ ভবনের প্রতিটির বিপরীতে নির্মাণকালীন পরিদর্শন নথি প্রকাশ্যে যাচাই করতে হবে; কোথায় তদারকি হয়নি, তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। খাল, পুকুর ও জলাধারসংশ্লিষ্ট বিতর্কিত নকশা অনুমোদনগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অডিট করতে হবে, প্রয়োজনে সরকারি তদন্ত কমিটি গঠন করে। নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই শুধু সমাপ্তির পরে নয় নিয়মিত ও যথাসময়ে পরিদর্শন বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে নিয়মভঙ্গ শুরুতেই ধরা পড়ে ও থামানো যায়।
নিচতলার বাধ্যতামূলক পার্কিং জায়গা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার বন্ধে সুনির্দিষ্ট সময়সীমাসহ অভিযান পরিচালনা করতে হবে এবং লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ইউটিলিটি-সংযোগ স্থগিতের মতো ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে বজায় রাখতে হবে। ইতোমধ্যে দাঁড়িয়ে যাওয়া নকশাবহির্ভূত ভবনগুলোর জন্য স্বচ্ছ ও সময়াবদ্ধ সমাধান-কাঠামো তৈরি করতে হবে যেখানে জননিরাপত্তার সঙ্গে আপসহীন থেকেও বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
চট্টগ্রামের এ সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় এটি পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রশ্নে সারা দেশের জন্যই একটি সতর্কবার্তা। নকশা অনুমোদন যদি শুধু কাগুজে অনুষ্ঠান হয়ে থাকে, আর বাস্তব নির্মাণ চলে তার বাইরে, তাহলে উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
কেকে/ এমএস