বাংলাদেশের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো আরও উন্নত আধুনিক ও শক্তিশালী করতে হলে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে হবে। অবাক লাগে দীর্ঘদিন ধরে শুধুমাত্র হামের টিকা ও সুচিকিৎসার অভাবে এ যাবত দেশের প্রায় দুই হাজার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর দায়-দায়িত্ব কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়? আরও শত শত শিশু এখনো হামের সুচিকিৎসার অভাবে হাসপাতালগুলোতে কাতরাচ্ছে। এবার বুঝুন দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ কত উদাসীন।
ইতোমধ্যে ডেঙ্গু চিকিৎসার সচেতনতার অভাবে দিন দিন ৮ থেকে ১০ জন করে রোগী মারা যেতে শুরু করছে। দেশের হাসপাতালগুলোকে ভঙ্গুর অবস্থা চিকিৎসার জন্য সিট পাওয়া দুস্কর। এভাবে দিন দিন যদি হামের চিকিৎসায় শিশু ও ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয় তাহলে সে দেশের চিকিৎসার ওপরে জনগণের কোনো আস্থা বা ভরসা থাকবে কি?
হাসপাতালে এম্বুলেন্স থেকে পর্যাপ্ত বা চাহিদা মোতাবেক নেই কোনো আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। বর্তমান যুগে রাজধানীর বাহিরের হাসপাতালগুলোর জন্য এ আই প্রযুক্তি সম্পন্ন পোর্টেবল হ্যান্ডহেন্ড এক্স-রে মেশিন চালু করা প্রয়োজন। অন্তত হালকা ও সহজে বহনযোগ্য এই মেশিনগুলোর সাহায্যে প্রত্যন্ত গ্রাম ও পাহাড়ী অঞ্চলের রোগীকে হাসপাতালে না এনেই ঘরে গিয়ে দ্রুত চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব। এতে রোগ নির্ণয় হবে অনেক বেশি নির্ভুল এবং দ্রুত। এ ছাড়াও দেশের হাসপাতালসমূহে ১.৫ টেসলা মেশিন স্থাপন করা হলে এই মেশিনের সাহায্যে নিখুঁতভাবে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গের ছবি তোলা সক্ষম। পাশাপাশি ডিজিটাল ম্যামোগ্রাফি টোমোসিন্থেসিস বসানো হলে নারীদের স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক স্তরেই শনাক্ত করার জন্য অত্যন্ত আধুনিক থ্রি-ডি ম্যামোগ্রাফি চালু সাধারণ জনগণ বিশেষ করে নারীরা যথেষ্ট উপকৃত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বলে রাখা ভাল দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা নাজুক। সরকারি হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোগত সংকট, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক-নার্সের অনুপুস্থিতি ও সংকট এবং অপ্রতুল চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রধান সমস্যা। এখনো বহু হাসপাতলে এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাম এবং প্যাথলজিক্যাল মেশিন নষ্ট হয়ে পরে আছে। এ সকল কারণে দেশে দিন দিন বহু অবৈধ হাসপাতাল-ক্লিনিং গড়ে উঠছে যার কোনো ভিত্তি নেই।
মনে রাখা দরকার, হাসপাতালগুলো হচ্ছে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনায় প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল বন্ধ করা সরকারের পক্ষে ঠিক নয়। ইহা হবে অমানবিক ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। দিনের পর দিন দেশে যে হারে ব্যক্তি মালিকানায় বা বেসরকারিভাবে পরিচালিত হাসপাতাল-ক্লিনিং বা ডায়গনেস্টিক সেন্টারগুলোতে সেবার মানসিকতার পরিবর্তে গড়ে উঠছে মূলত: ব্যবসায়িক মন মানষিকতা ও চিন্তা-ভাবনা।
যুগ যুগ ধরে মানুষ সুচিকিৎসার আশায় ভুটান, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে অনেকেই যান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে বাংলাদেশ অনেক পিছনে রয়েছে এবং ডাক্তারদের উদাসীনতার কারণে ভরসা না পেয়ে আজ অনেক বাংলাদেশি রোগীরা কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালের দিকে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য হয়েছে। এছাড়াও দিন দিন ডাক্তারদের ভিজিট-এর মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে জনগণ ক্ষুদ্ধ। অথচ এ ব্যাপারে সরকার নিরব-নির্বিকার।
দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে সেবার মান নিয়ে ভুরি ভুরি অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতিতে ভরপুর সরকারি হাসপাতালে খাবার মান খুবই নিম্নমানের। অনেক হাসপাতালে দক্ষ জনশক্তির অভাবে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও মেশিন অব্যবহৃত অবস্থায় দীর্ঘদিন যাবত পরে আছে। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত টেকনিশিয়ান বা জনশক্তি না থাকার কারণে দেশের সার্বিক চিকিৎসা সেবা তলানিতে পৌছেছে।
হাসপাতালগুলোতে দালাল ওয়ার্ড বয়দের দৌরাত্ম্য এবং তাদের দুর্ব্যবহার রোগী বা হাসপাতালে সেবা প্রাপ্তিরা অসহায় হয়ে পরে। যে কোনো অবস্থায় চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে সুচিকিৎসার নিশ্চিয়তা আনায়ন করা দরকার। স্বাস্থ্য খাতের দরবস্থা যথাযথ সংস্কার করা এবং এ সেবাকে সত্যিকার অর্থে জনগণের দোর-গোড়ায় পৌঁছে দিতে আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য সেবাকে জনগণের কল্যাণমুখী হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীতার প্রতি গুরুত্বরোপ করছি। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্ধ থাকলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ এর সম্পূর্ণ চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মানবসেবাবিষয়ক হওয়া সত্ত্বেও নানা করণে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের বেহাল অবস্থা। হাসপাতালগুলোতে চাহিদামত ওষুধ সংকট এখনো চলমান। কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও উদাসীনতার জন্য হাম, ডেঙ্গু, ক্যান্সার, কিডনি ও ডায়রিয়ার মতো বেশ কিছু সাধারণ রোগের দ্রুত চিকিৎসা না থাকার কারণে অনেককে মৃত্যু বরণ করতে হচ্ছে। জবাবদিহিতা না থাকার কারণে স্বাস্থ্য বিভাগ দিন দিন তার কার্যকারিতা হারাতে বসেছে। চিকিৎসা সেবার ওপর দেশের মানুষের আস্থা ও ভরসা বৃদ্ধি করতে হবে। তাই সরকারকে জনস্বার্থে স্বাস্থ্য সেবার ওপর সুদৃষ্টি দিতে হবে যার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী
কেকে/সাশ