দক্ষিণ আটলান্টিকের প্রত্যন্ত একটি পাথুরে দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরে চার দশক ধরে চলা পুরনো সার্বভৌমত্ব বিরোধ ২০২৬ সালে নতুন করে আবারও আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাজ্যের অধীনে থাকা ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আর্জেন্টিনার দাবি নতুন কিছু নয়, কিন্তু এবারের বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত পররাষ্ট্রনীতি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা।
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, দুটি প্রধান দ্বীপ ও প্রায় ৮০০টি ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত এই ভূখণ্ড আয়তনে যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট রাজ্যের সমান। এখানে বাস করেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ, যাদের অধিকাংশই ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত এবং রাজধানী স্ট্যানলি শহরকে কেন্দ্র করে বসবাস করেন। দ্বীপে কখনও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল না, আর ১৯৮২ সালের যুদ্ধের পর থেকে এখানে যুক্তরাজ্যের উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।
দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধের ইতিহাস আঠারো শতক পর্যন্ত গড়ায়। ব্রিটিশরা প্রথম ১৬৯০ সালে দ্বীপে অবতরণ করে, এরপর ফরাসি ও স্প্যানিশরাও পালাক্রমে দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেয়। স্পেন থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর ১৮১৬ সালে আর্জেন্টিনার পূর্বসূরি সরকার দ্বীপের সার্বভৌমত্ব দাবি করে, যা ১৮২০ সালে আনুষ্ঠানিক রূপ নেয়।
কিন্তু ১৮৩৩ সালে ব্রিটিশরা ফিরে এসে আর্জেন্টিনীয়দের বিতাড়িত করে এবং তখন থেকে দ্বীপ শাসন করে আসছে। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত এক গণভোটে দ্বীপবাসীদের ৯৯.৮ শতাংশ ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকার পক্ষে ভোট দেন।
১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা, যা তখন ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার জন্য পরিচিত “ডার্টি ওয়ার”-এর নেতৃত্বে ছিল, জনসমর্থন হারানোর মুখে দ্বীপ দখলের সিদ্ধান্ত নেয়। ২ এপ্রিল আর্জেন্টাইন বাহিনী দ্বীপে হামলা চালায়, আর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার তিন দিনের মধ্যে নৌবহর পাঠান। যুক্তরাষ্ট্র শুরুতে নিরপেক্ষ থেকে দুই পক্ষকে দ্বীপ ভাগাভাগি করার পরামর্শ দেয়, পরে অস্ত্র সরবরাহ ও রসদ সহায়তা দিয়ে ব্রিটেনের পক্ষ নেয়।
৭৪ দিনের যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন, ২৫৫ জন ব্রিটিশ এবং তিনজন দ্বীপবাসী নিহত হন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে আর্জেন্টাইন যুদ্ধজাহাজ জেনারেল বেলগ্রানো ডুবে যাওয়ায়, যা ব্রিটিশ সাবমেরিন নির্ধারিত সামরিক নিষেধাজ্ঞা অঞ্চলের বাইরে থাকা সত্ত্বেও ডুবিয়ে দেয়—একে অনেক আর্জেন্টাইন বিশ্লেষক যুদ্ধাপরাধ বলে অভিহিত করেন।
যুদ্ধের ফল আর্জেন্টিনায় জান্তার পতন ঘটায়, আর যুক্তরাজ্যে থ্যাচারকে পরের বছর পুনর্র্নিবাচনে সহায়তা করে। আর্জেন্টিনার সংবিধানে ১৯৯৪ সালে দ্বীপের সার্বভৌমত্বের দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়, এবং দেশটি দক্ষিণ জর্জিয়া ও দক্ষিণ স্যান্ডউইচ দ্বীপপুঞ্জের ওপরও দাবি জানিয়ে আসছে।
তেল, নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলি সংযোগ
তবে জ্বালানি সংকটের এই সময়ে এই দ্বীপটি নিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে দ্বীপের চারপাশের জলসীমায় আবিষ্কৃত বিশাল তেলক্ষেত্র, যার নাম “সি লায়ন”। ২০১০ সালে যুক্তরাজ্য একটি ব্রিটিশ-ইসরায়েলি জোটকে এই গভীর সমুদ্রের তেলক্ষেত্র উত্তোলনের অধিকার দেয়।
ইসরায়েলের নাভিটাস পেট্রোলিয়ামের একটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক শাখা এবং ব্রিটেনের রকহপার এক্সপ্লোরেশন যৌথভাবে এই প্রকল্প পরিচালনা করছে, যেখান থেকে আনুমানিক ১৭০ কোটি ব্যারেল তেল মজুত থাকার ধারণা করা হয় এবং ২০২৮ সাল থেকে উত্তোলন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এই তেল প্রকল্পই ইসরায়েল-আর্জেন্টিনা সম্পর্কে জটিলতা তৈরি করেছে। জানুয়ারিতে আর্জেন্টিনা তার দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের বিতর্কিত প্রতিশ্রুতি স্থগিত করে, মূলত এই তেল বিরোধকে কেন্দ্র করে। তা সত্ত্বেও গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের—যাতে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন—পুরো সময়জুড়ে মিলেই ও নেতানিয়াহুর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ ছিল।
বিশ্বকাপ ফুটবলে আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে সেমিফাইনালে হারানোর পর নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন জানান, আর কট্টর-ডানপন্থি ইসরায়েলি মন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ও ইতামার বেন গাভির (যাদের উভয়কেই ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্য নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল) ইংল্যান্ডকে নিয়ে বিদ্রুপ করেন। এমনকি নেতানিয়াহুর ছেলে ইয়াইর নেতানিয়াহুও মন্তব্য করেন যে দ্বীপগুলো আর্জেন্টিনার হওয়া উচিত, কারণ তার ভাষায় “ব্রিটেন বর্তমানে একটি শত্রুভাবাপন্ন দেশ, আর আর্জেন্টিনা বন্ধুরাষ্ট্র।”
ইসরায়েল-আর্জেন্টিনা সম্পর্কের এই ঘনিষ্ঠতার শিকড় আশির দশকে। তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিনের সরকার লন্ডনের প্রতিবাদ সত্ত্বেও যুদ্ধের সময় ও পরে আর্জেন্টিনার কাছে অস্ত্র বিক্রি করেছিল, যার মধ্যে ছিল ব্রিটিশ সেনা ও জাহাজে হামলায় ব্যবহৃত সামরিক বিমানও। ফাঁস হওয়া ইসরায়েলি সরকারি নথি অনুযায়ী, বেগিন এই অস্ত্র বিক্রিকে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে দর কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন, যাতে ইসরায়েলের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন আরব দেশগুলোর কাছে ব্রিটিশ অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করা যায়।
ট্রাম্প কেন এই বিরোধে জড়ালেন
যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে ফকল্যান্ড প্রশ্নে “নিরপেক্ষ” অবস্থান নিয়ে এসেছে—যুক্তরাজ্যের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করলেও তার বেশি এগোয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি “প্রতিটি অবস্থানই পর্যালোচনা করেন,” এবং ফকল্যান্ড নিয়ে মার্কিন নীতিও তার ব্যতিক্রম নয়। ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম জিবি নিউজের সাক্ষাৎকারে ফকল্যান্ড নিয়ে আরেকটি সংঘাত হলে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনের পাশে দাঁড়াবে কি না—এই প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে যান তিনি।
তিনি বলেন, প্রথম যুদ্ধের সময় তিনি বিষয়টি খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করেছিলেন এবং ব্রিটেন তখন শক্তভাবে দ্বীপ পুনরুদ্ধার করেছিল, কিন্তু জায়গাটি অনেক দূরে বলেও মন্তব্য করেন। এই দোদুল্যমান অবস্থানের পেছনে রয়েছে যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপড়েন। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে যুক্তরাজ্যের সমর্থন না দেওয়া নিয়ে ওয়াশিংটন ও লন্ডনের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এছাড়া ট্রাম্প ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে এসেছেন, এবং ব্রিটেন তা না করলে ফকল্যান্ড নিয়ে অবস্থান পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিতও দিয়েছেন আগে। ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছেন মিলেই, যিনি নিজেকে লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের ভাবাদর্শগত মিত্র হিসেবে তুলে ধরেন।
গত ৩ সেপ্টেম্বর এক জাতীয় ভাষণে মিলেই ঘোষণা করেন, তিনি সি লায়ন তেলক্ষেত্রে জড়িত কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন এবং দ্বীপ অঞ্চলে আর্জেন্টিনার অনুমোদন ছাড়া তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান ও তাদের সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের জন্য কংগ্রেসে বিল পাঠাবেন।
তিনি বলেন, “মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জের ওপর যেকোনো অগ্রসরতা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হবে” এবং আর্জেন্টিনা “চুপচাপ বসে থাকবে না।” একই সঙ্গে তিনি টিয়েরা দেল ফুয়েগো প্রদেশে একটি নৌঘাঁটির জন্য নতুন তহবিলের ঘোষণা দেন, যাতে দ্বীপের কাছে আর্জেন্টিনার সামরিক উপস্থিতি জোরদার করা যায়।
মিলেই তার ভাষণে ট্রাম্পের প্রশংসা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই অবস্থান পরিবর্তনের কথা ভাবছে কারণ তারা জানে আর্জেন্টিনা একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার, পশ্চিমা মূল্যবোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা একটি দেশ, যে আগামী দশকগুলোতে মূল্যবান মিত্র হতে পারে। তবে আর্জেন্টিনার বিরোধী দলীয় রাজনীতিকরা এই অবস্থানের সমালোচনা করেছেন।
বামপন্থী আইনপ্রণেতা নিকোলাস দেল কানিও অভিযোগ করেন, মিলেই নির্বাচনি বছরের আগে জনসমর্থন বাড়াতে এবং ব্রিটেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধে ওয়াশিংটনের স্বার্থ রক্ষায় মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জের বৈধ সার্বভৌমত্ব দাবিকে ব্যবহার করছেন।
অপরদিকে লন্ডন তার অবস্থানে অনড় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের মুখপাত্র টম ওয়েলস সম্প্রতি একটি বক্তব্যে বলেছেন, সার্বভৌমত্ব যুক্তরাজ্যের হাতেই থাকবে এবং দ্বীপবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, একই সঙ্গে তিনি ২০১৩ সালের গণভোটের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে প্রায় চার হাজার দ্বীপবাসী ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
এবার একটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিকারঅর্থে আর্জেন্টিনার দাবির প্রতি সমর্থন জানায়, তবে তা লন্ডনের জন্য কূটনৈতিক বিপর্যয় হবে এবং যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী “বিশেষ সম্পর্ক”-এর জন্য হবে একটি বড় ধাক্কা । প্রশ্ন উঠতে পারে, যুক্তরাজ্য ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও আরেকটি আর্জেন্টাইন আক্রমণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্যে এগিয়ে আসবে কি না, যদিও জোটের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তা করার কথা। কিন্তু এবার যদি সেরকম কিছু ঘটবে বলে মনে হচ্ছে না। ১৯৮২ সালে যে শক্তি নিয়ে যুক্তরাজ্য আর্জেন্টিনার আক্রমণ প্রতিহত করেছিল, সেই তুলনায় বর্তমানে তাদের সামরিক সক্ষমতা অনেকখানি দুর্বল।
ট্রাম্প প্রশাসন অতীতেও মিত্র দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব দাবিকে কূটনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। তার প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্ব স্বীকৃতি দেয়—জাতিসংঘ যে অঞ্চলকে মরক্কো-অধিকৃত বলে বিবেচনা করে—আব্রাহাম চুক্তির অংশ হিসেবে, যার বিনিময়ে রাবাত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। এই বিরোধ জাতিসংঘের মঞ্চেও গড়াতে পারে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাবেক প্রধান রাফায়েল গ্রোসি, যিনি মিলেই সরকারের সমর্থনে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদের প্রার্থী, অক্টোবরে নির্বাচিত হলে সংস্থার মধ্যে দ্বীপ প্রশ্নে আর্জেন্টিনার অবস্থান আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারেন বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।
জুন মাসেই আর্জেন্টিনা জাতিসংঘে দ্বীপ প্রশ্নে আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছিল। সব মিলিয়ে, প্রায় চার দশক আগে শেষ হওয়া একটি যুদ্ধের রেশ এখনও দক্ষিণ আটলান্টিকের একটি ছোট দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরে বিশ্ব রাজনীতির তিনটি ভিন্ন কেন্দ্র—লন্ডন, ওয়াশিংটন ও জেরুজালেম—কে একসূত্রে বেঁধে ফেলেছে। তেলের মজুত, নির্বাচনী রাজনীতি এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থের জটিল মিশ্রণে ফকল্যান্ড বিরোধ আগামী দিনগুলোতে আবারও আলোচনায় থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেকে/সাশ