মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও বিশেষায়িত সরকারি ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য রোগী এখানে আসেন, যাঁদের সিংহভাগই দরিদ্র বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত। তাঁদের ভরসা এই একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে তুলনামূলক কম খরচে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
খোলা কাগজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ছয় বছরের শিশু হাফসা কিংবা পঞ্চান্ন বছর বয়সী রোকেয়ার মতো রোগীদের অভিজ্ঞতা বলছে, সরকারি ভর্তুকির সুফল প্রকৃত রোগীর কাছে পৌঁছানোর আগেই তা মাঝপথে হাতিয়ে নিচ্ছে একটি অসাধু চক্র। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের আশপাশে সক্রিয় দালাল ও কিছু অসাধু কর্মকর্তার সিন্ডিকেট ভর্তুকিমূল্যের ওষুধ, গ্লাভস ও সিরিঞ্জের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রোগীদের বাধ্য করছে চড়া দামে তা বাইরে থেকে কিনতে। যে কেমোথেরাপি সরকারি মূল্যে সাত-আটশ টাকায় সম্পন্ন হওয়ার কথা, তার জন্য গুনতে হচ্ছে আট হাজার টাকা পর্যন্ত। এমন বাস্তবতায় একজন দিনমজুরের পক্ষে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেই এই সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব অস্বীকার করছে না; বরং জানিয়েছে, ইতোমধ্যে কয়েকজনকে বহিষ্কার ও বদলি করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ আশাব্যঞ্জক। তবে বিচ্ছিন্ন শাস্তির মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি নির্মূল হবে না।
সমস্যার মূলে রয়েছে সক্ষমতা ও বরাদ্দের বিশাল ফারাক। হাসপাতালটি তিনশ শয্যার জনবল নিয়ে সেবা দিচ্ছে সাতশ শয্যার রোগীকে। ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি, এমনকি রোগীদের রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি গ্যাস সরবরাহও মাসের পর মাস বন্ধ থাকার তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একটি বিশেষায়িত জাতীয় প্রতিষ্ঠানে এত মৌলিক সুবিধার অভাব প্রমাণ করে, ক্যানসার চিকিৎসাকে এখনো রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় প্রাপ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ কম থাকার বিষয়টিও এই সংকটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিভাগীয় পর্যায়ে নতুন ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণ কিংবা শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা কবে বাস্তবায়ন হবে, সেটির এখনো কোনো দিশা দেখা যাচ্ছে না। এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের রূপরেখা। কিন্তু আপৎকালীন স্বল্পমেয়াদে রোগীদের হয়রানি বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এ বিষয়ে আমরা মনে করি, কিছু পদক্ষেপ খুব জোরালোভাবে নেওয়া উচিত। ওষুধ, গ্লাভস ও সিরিঞ্জের সরবরাহ-শৃঙ্খলে দালাল ও অসাধু কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, বিচ্ছিন্ন বদলি বা বহিষ্কারে সীমাবদ্ধ না থেকে। ভর্তুকিমূল্যের ওষুধ ও কেমোথেরাপির প্রকৃত মূল্য রোগীর দৃশ্যমান স্থানে প্রকাশ্যে টাঙিয়ে রাখতে হবে, যাতে বাড়তি অর্থ আদায় সহজে চিহ্নিত করা যায়।
হাসপাতালের প্রকৃত রোগীর চাপ বিবেচনায় জরুরি ভিত্তিতে জনবল ও ওষুধ সরবরাহের বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং গ্যাসের মতো মৌলিক সুবিধার বিল যথাসময়ে পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে পরিকল্পিত ক্যানসার হাসপাতালগুলোর নির্মাণকাজ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করে রোগীর চাপ বিকেন্দ্রীকরণ করার বিকল্প কিছু নেই।
দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে, বিশেষত ক্যানসারের মতো ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসায়, বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। রাষ্ট্র যদি ক্যানসারের মতো রোগ মোকাবিলায় সময়মতো দায়িত্ব পালন না করে, তবে এই মানুষগুলোর ভরসার শেষ জায়গাটুকুও হারিয়ে যাবে।
সরকারের কাছে আমাদের আহ্বান, জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালের এই দুরবস্থা নিরসনে অবিলম্বে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হোক।
কেকে/এমএস