সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ওবায়দুল কাদেরসহ সাত নেতার বিরুদ্ধে মামলার রায় মঙ্গলবার      ইন্দোনেশিয়ায় জাহাজডুবিতে এখনও নিখোঁজ ১২৯, উদ্ধারে জোর তৎপরতা      আসিফ মাহমুদের নথি দুদকে, যাচাই হবে নিয়োগ-বদলি      আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর      ঢাকা উত্তরে আসিফ ও দক্ষিণে পাটওয়ারীকে এনসিপির মেয়র প্রার্থী ঘোষণা      ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৫৬১      আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অনুসন্ধানে দুদক      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ব্লুপ্রিন্ট: সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন সমীকরণ
মোছা. মিথিলা খাতুন
প্রকাশ: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:১৯ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে পর্দার পেছনের হিসাব-নিকাশ প্রায় সময়ই সাধারণ দৃশ্যপটের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও বহুমুখী। মার্কিন প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক যে ভূরাজনৈতিক কৌশল বা ব্লুপ্রিন্ট দেখা গেছে, তার মূলে রয়েছে এক ধরনের সূক্ষ্ম জবরদস্তি। বাহ্যিকভাবে পুরো বিষয়টি ইরানবিরোধী আক্রমণ ও মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই বলে মনে হলেও, এর বৃহত্তর ও সুদূরপ্রসারী ক্যানভাসে সৌদি আরব এবং ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা লুকিয়ে রয়েছে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে জোরালো বিতর্ক আছে।

এই বিষয় আলোচনায় শুরুতেই আসে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের কথা। অ্যাকর্ডস হলো যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২০ সালে শুরু হওয়া একগুচ্ছ চুক্তি, যার মাধ্যমে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ট্রাম্পের ক্ষমতায় থাকার প্রথম মেয়াদে, অর্থাৎ ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধিতে একমত হয়। এ পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান এই অ্যাকর্ডসে যোগ দিয়েছে।

তবে শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ হিসেবে সৌদি আরব এই চুক্তিতে যোগ দেয়নি। কারণ, এই চুক্তিতে যোগদানের ব্যাপারে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অবস্থান ছিল ফিলিস্তিনের পক্ষে। তারা বলেছিল, আগে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি গ্রহণযোগ্য রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। তাছাড়া, তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই চুক্তিতে যোগ দেবে না। মূলত, কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে বিষয়টি একপ্রকার এড়িয়েই চলেছিল এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও ভেবেছিলেন, সৌদি আরব ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রশ্নে অনড় থেকে এই প্রস্তাব এড়িয়ে যাবে। কিন্তু মার্কিন দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক নকশায় সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে একই কূটনৈতিক বলয়ে বা জোটে নিয়ে আসা ছিল অত্যন্ত জরুরি।

আমেরিকার মূল লক্ষ্যই হলো মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষা করা। তাই সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ট্রাম্প প্রশাসন সৌদির সঙ্গে একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি চূড়ান্ত করলেও, ট্রাম্প তার সোশ্যাল সাইট ট্রুথে সাফ জানিয়ে দেন যে, সৌদি আরব যদি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষর করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করে, তবে এই চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ, রিয়াদ যদি শর্ত অনুযায়ী ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে রাজি না হয়, তবে ওয়াশিংটন এই চুক্তি কার্যকর করবে না।

তবে কি এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যই লাগাতার ইরানবিরোধী নীতি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনার পারদ বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল? ঐতিহাসিক ও ভূরাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্কিন চাপে ইরানকে কোণঠাসা করে ফেলা হয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক উপস্থিতির কারণে ইরান একসময় বাধ্য হয়ে বিশ্ববাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিপক্ষদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে। এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে সৌদি তেল শোধনাগারে হামলার মতো ঘটনা ঘটে, যা পুরো অঞ্চলে এক গভীর আতঙ্কের সৃষ্টি করে।

এই গোটা ভূরাজনৈতিক ছকের সবচেয়ে বড় কৌশলগত পয়েন্ট লুকিয়ে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক ও সামুদ্রিক রুটের ওপর। বাব-আল-মান্দেব প্রণালী, লোহিত সাগর এবং এর সঙ্গে যুক্ত ভূমধ্যসাগরের জলপথটি কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং গোটা বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী বা লাইফলাইন। তাই সৌদির তেল বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য এই সমুদ্রপথগুলোর নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা অপরিহার্য।

যখন ইরান বা তার সমর্থিত শক্তির প্রভাবে এই রুটগুলো বা লোহিত সাগরীয় অঞ্চল হুমকির মুখে পড়ে, তখন তা সরাসরি সৌদি আরবের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র এবং তাদের উচ্চাভিলাষী ‘ভিশন ২০৩০’-কে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের আঘাতগুলো সৌদি আরবকে এক গভীর নিরাপত্তাহীনতার মুখে ঠেলে দেওয়ার সূক্ষ্ম কৌশল ছিল। যাতে করে নিজের তেল অবকাঠামো, বাব-আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরের বাণিজ্য রুট এবং সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রক্ষা করার তাগিদে সৌদি আরব আমেরিকার ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে বাধ্য হবে।

এই চুক্তি নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচনা চলছিল। এমনকি জো বাইডেন প্রশাসনের সময়ও এটি বৃহত্তর কূটনৈতিক প্যাকেজের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, যার মূল শর্ত ছিল সৌদি আরব ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর সেই সম্ভাবনা অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে যায়। এর পরেও মার্কিন কৌশলগত ও কূটনৈতিক চাপ থেমে থাকেনি।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট ও যুদ্ধের আবস্থা তৈরি করে সৌদি আরবকে একপ্রকার বাধ্য করা হয়, যাতে তারা ওয়াশিংটনের অভিপ্রায় অনুযায়ী ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ঐতিহাসিক চুক্তিটি স্বাক্ষর করে। অর্থাৎ, সরাসরি বলপ্রয়োগ না করে অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ব্ল্যাকমেইল বা ‘কোয়োর্সিভ ডিপ্লোম্যাসি’র মাধ্যমে কূটনৈতিক লক্ষ্য হাসিল করাটাই ছিল এই কৌশলের মূলমন্ত্র।

বর্তমান বহুমুখী কূটনীতির যুগে অবশ্য পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। সৌদি আরব কেবল মার্কিন সুরক্ষার ওপর অন্ধভাবে ভরসা না করে চীনের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং নিজস্ব কৌশলগত স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার নানা বহুমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, লোহিত সাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও জবরদস্তিমূলক কূটনীতির প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের জটিলতা বৃদ্ধিই পাচ্ছে।

ক্ষমতার এ খেলায় তেল সম্পদ, সামুদ্রিক রুট ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সৌদি আরব শেষ পর্যন্ত মার্কিন ব্লুপ্রিন্ট থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে স্বাধীন ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে, নাকি শেষ পর্যন্ত এই অদৃশ্য চাপ ও কূটনৈতিক প্যাকেজের কাছে নতি স্বীকার করতে হবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই সমীকরণটিই আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

লেখক: কলামিস্ট

কেকে/এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close