একটি নির্বাচন শেষ হলো। মিছিল থামল, পোস্টার নামল, স্লোগানের শব্দও ধীরে ধীরে কমে গেল। কিন্তু তারপর?
দেশের রাজনীতি নিয়ে আমাদের আলোচনার বড় অংশজুড়ে থাকে কে কত ভোট পেলেন, কার কতজন কর্মী, কোথায় কত বড় সমাবেশ হলো কিংবা কে কতটি আসন পেলেন। অথচ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—একটি রাজনৈতিক শক্তি আগামী বিশ বছর দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আজ কী প্রস্তুতি নিচ্ছে?
একটি দল নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা করতে শুধু রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন গবেষক, অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রযুক্তিবিদ, শিক্ষক, প্রশাসক, উদ্যোক্তা ও দক্ষ ব্যবস্থাপক। প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে আজকের সমস্যার সমাধান নিয়ে গবেষণা হবে এবং আগামী দিনের সমস্যার জন্য প্রস্তুতি তৈরি হবে।
রাজনীতির মাঠে আমরা সংগঠনের শক্তি দেখি; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার নেপথ্যে যে জ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামো প্রয়োজন, সেটি কতটা শক্তিশালী—এই প্রশ্নটি কি আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ভাবি?
একটি উদাহরণ কল্পনা করা যাক।
ধরা যাক, আগামীকাল সরকারকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দরকার হবে তথ্য, গবেষণা ও বিকল্প পরিকল্পনা। কৃষিতে বড় পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন কৃষিবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের সমন্বিত গবেষণা। তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে শুধু বক্তৃতা নয়, প্রয়োজন শিল্পের চাহিদা বিশ্লেষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণ। প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রয়োজন এআই, রোবোটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ।
অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রস্তুতি শুরু হয় ক্ষমতায় যাওয়ার পরে নয়; অনেক আগে থেকেই।
এখানেই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি বড় পরিবর্তন প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দলগুলো যদি শুধু নির্বাচনী সংগঠন হিসেবে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে তারা হয়তো ভোটের মাঠে শক্তিশালী হতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতার ভান্ডার তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক দর্শন ও জনকল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্ব উন্নয়ন কেন্দ্র, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণ একাডেমি, সামাজিক সেবা সংস্থা এবং নীতি গবেষণাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এগুলো সরাসরি দলীয় কাঠামোর অংশ না হয়েও একটি রাজনৈতিক দর্শনের চিন্তা, গবেষণা ও জনসম্পৃক্ততাকে এগিয়ে নিতে পারে।
বাংলাদেশেও এমন একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে।
একটি জাতীয় পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অর্থনীতি, জ্বালানি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে গবেষণা করতে পারে। একটি লিডারশিপ একাডেমি তৈরি করতে পারে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। একটি টেকনিক্যাল অ্যান্ড স্কিলস ইনস্টিটিউট তরুণদের আধুনিক দক্ষতা দিতে পারে। টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার কাজ করতে পারে এআই ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি নিয়ে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য, আইন, সামাজিক সেবা, প্রকাশনা ও গণমাধ্যম নিয়েও পেশাদার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত একটি—এসব প্রতিষ্ঠান যেন রাজনৈতিক কর্মী তৈরির কারখানায় পরিণত না হয়।
যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব হতে হবে প্রধান বিবেচনা। ভিন্নমত থাকা মানুষও গবেষণা, শিক্ষা বা পেশাগত কাজে অবদান রাখার সুযোগ পাবেন। কারণ জ্ঞান কোনো একক রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; জ্ঞান পুরো জাতির সম্পদ।
এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হয়তো এক বছরে বড় কোনো রাজনৈতিক ফল পাওয়া যাবে না। কিন্তু দশ বছর পরে যখন একজন দক্ষ গবেষক তৈরি হবে, একজন তরুণ উদ্যোক্তা সফল হবে, একজন প্রকৌশলী নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করবে কিংবা একজন গবেষকের নীতিপত্র রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে লাগবে—তখন সেই বিনিয়োগের প্রকৃত মূল্য বোঝা যাবে।
আমাদের রাজনীতিতে তাই একটি নতুন প্রশ্ন যুক্ত হওয়া দরকার—
আমরা শুধু কতজন মানুষকে রাজনীতিতে আনছি, তা নয়; কতজন দক্ষ মানুষকে দেশের জন্য প্রস্তুত করছি?
কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু সংসদ ভবনের ভেতরে তৈরি হয় না। তৈরি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে, প্রশিক্ষণকেন্দ্রে, হাসপাতালের সেবাকক্ষে, প্রকৌশলীর নকশার টেবিলে, উদ্যোক্তার কর্মক্ষেত্রে এবং জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এটি যদি সত্যিই একটি রাষ্ট্রদর্শন হয়, তবে তার পরের কথাটিও হতে পারে—‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।
আর সবার জন্য বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রয়োজন শুধু ক্ষমতার রাজনীতি নয়; প্রয়োজন মানুষের মধ্যে বিনিয়োগ, জ্ঞানের মধ্যে বিনিয়োগ এবং প্রতিষ্ঠান নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কৃতি।
আজকের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিনিয়োগ হয়তো আগামী নির্বাচনের ফল নয়।
হয়তো সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হলো—আগামী বাংলাদেশের জন্য আজই মানুষ ও প্রতিষ্ঠান তৈরি করা।
লেখক : সদস্য—এ্যাব
কেকে/এমএস