শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৪ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি, কার্যকর হবে যেভাবে      বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জঙ্গল থেকে কুবি শিক্ষিকার নিখোঁজ ছেলের লাশ উদ্ধার      ঢাকায় নিরাপত্তা জোরদার, ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫১৫      বাঘা সীমান্তে বিএসএফের হাতে আটক ৫ বাংলাদেশিকে ফেরত আনল বিজিবি      তিন সন্তানকে বিষপান করিয়ে বাবারও বিষপান, ৩ শিশুর মৃত্যু      বিএনপি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করছে : নাহিদ ইসলাম      এক দফায় পরিণত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে : ডা. শফিকুর রহমান      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
হাওর-বাঁওড়-বিল রক্ষায় চাই সমন্বিত ও বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৩০ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

শুধু মৌলভীবাজারের হাকালুকি নয়—দেশের প্রায় প্রতিটি হাওর, বাঁওড় ও বিল আজ একই ধরনের সংকটে জর্জরিত। দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ আর প্রশাসনিক উদাসীনতার যুগপৎ চাপে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলাভূমিগুলো একে একে হারাচ্ছে তাদের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, জীববৈচিত্র্য এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকার উৎস।

এই সংকট এখন একটি জাতীয় পরিবেশগত বিপর্যয়ের অংশ, যার মোকাবিলায় প্রয়োজন সুসংহত ও বাস্তবায়নযোগ্য একটি জাতীয় কর্ম পরিকল্পনা। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওরের কথাই ধরা যাক। এই হাওরের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) এবং আন্তর্জাতিক রামসার সাইটের স্বীকৃতি থাকা সত্ত্বেও, হাওর ব্যবস্থাপনার জন্য বিধিমালায় নির্ধারিত উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর, তার স্পষ্ট জবাব মিলছে না।

আইন ও বিধিমালা কাগজে-কলমে থাকলেও মাঠপর্যায়ে জবাবদিহির কাঠামোর এই ঘাটতি প্রায় প্রতিটি সংরক্ষিত জলাভূমির ক্ষেত্রেই লক্ষণীয়। উত্তরবঙ্গের চলনবিলের চিত্রও উদ্বেগজনক। নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলার সাতটি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত, আত্রাই-করতোয়াসহ ৪৭টি নদ-নদী সংযুক্ত এই জলরাশিকে একসময় দেশের অন্যতম শস্য ও মৎস্যভাণ্ডার বলা হতো।

অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং মানবসৃষ্ট দখলের কারণে এই বিলের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। যশোরের পদ্মবিলা বাঁওড়ের মতো ছোট জলাধারগুলোতেও মাটি কেটে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে—যা দেখিয়ে দেয়, সংকট কেবল বড় হাওরে সীমাবদ্ধ নয়, দেশের অসংখ্য ছোট-বড় জলাভূমিতেই এই ধরনের অনিয়ম চলছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে।

এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়, বৈশ্বিক প্রবণতারই একটি অংশ, তবে বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক ও জনবহুল দেশের জন্য এর তাৎপর্য অনেক বেশি গভীর। জলাভূমি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি রামসার কনভেনশনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ১৯৭০ সাল থেকে ইতোমধ্যে পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও বেশি প্রাকৃতিক জলাভূমি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, আর আগামী আড়াই দশকে আরও প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জলাভূমি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।

এই ক্ষতির আর্থিক মূল্য নিরূপণ করতে গিয়ে প্রতিবেদনটি জানিয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক অর্থনীতি এই খাতে বিপুল পরিমাণ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, যা প্রতিরোধে বছরে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন। এই বৈশ্বিক চিত্র স্মরণ করিয়ে দেয়, হাকালুকি বা চলনবিলের সংকট বিচ্ছিন্ন কোনো স্থানীয় সমস্যা নয়—বরং জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ন ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের চাপে বিশ্বজুড়েই স্বাদুপানির বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়ছে দ্রুতগতিতে।

আশার কথা, বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি এই বাস্তবতা কিছুটা হলেও আমলে নিয়েছে। ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করে হাওর বা জলাভূমি অবৈধভাবে দখল, ভরাট কিংবা পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টির জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দশ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়—তার বাস্তবায়নে জনবল, তদারকি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা জরুরি। ফলে দেশের সব হাওর, বাঁওড় ও বিলের প্রকৃত আয়তন, গভীরতা ও দখলের পরিমাণ নিরূপণে অবিলম্বে একটি জাতীয় জরিপ পরিচালনা করতে হবে, যাতে কাগজে-কলমে থাকা তথ্য ও বাস্তব চিত্রের ব্যবধান দূর হয়।

জলাভূমিতে প্লাস্টিক ও অন্যান্য অপচনশীল বর্জ্য ফেলা রোধে সংশ্লিষ্ট বাজার, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে বিকল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। দখলকৃত বিল ও জলাভূমি উদ্ধারে সময়সীমা বেঁধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে এবং উদ্ধারকৃত জমি পুনরায় দখল ঠেকাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে হবে।

শুধু তাই নয় হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করতে একটি কেন্দ্রীয় নজরদারি কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে প্রতিটি সংস্থা নিজ নিজ দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে না পারে।

জলাভূমিগুলো বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য সম্পদ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জীববৈচিত্র্যের ভিত্তি। এই ভিত্তি রক্ষায় আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তার নিরলস বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। সরকারের সদিচ্ছা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  হাওর রক্ষা   উদ্যোগ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close