মানবসভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিকাশের অনেক আগেই মানুষ বুঝতে শুরু করেছিল যে, সুস্থ থাকার সঙ্গে খাদ্যের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রাচীন গ্রিসের চিকিৎসাবিদ হিপোক্রেটিসের একটি বিখ্যাত উক্তি আজও বিশ্বজুড়ে আলোচিত ‘Let food be thy medicine and medicine be thy food’ তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এ ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করছে। আজকের ‘Food is Medicine’ আন্দোলনের অর্থ এই নয় যে খাদ্য ওষুধের বিকল্প, কিংবা শুধু ভালো খাবার খেলেই সব রোগ সেরে যাবে। বরং এর মূল দর্শন হলো সঠিক খাদ্যকে চিকিৎসার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ব্যবহার করা। অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং রোগীর দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য চিকিৎসক, পুষ্টিবিদ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা একসঙ্গে পরিকল্পিতভাবে খাদ্যকে ব্যবহার করবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এ ধারণা এখন আর শুধু গবেষণাগারের বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির অংশ হয়ে উঠছে।
গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে এক নতুন ধরনের স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে। সংক্রামক রোগের পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বেশি মানুষ ভুগছেন ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, হৃদ্রোগ, স্থূলতা, ফ্যাটি লিভার, কিডনি রোগ এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে। এসব রোগের একটি বড় অংশের সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে সৃষ্ট অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। শুধু ওষুধ দিয়ে এসব রোগ দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। কারণ একজন মানুষ যদি প্রতিদিন অতিরিক্ত চিনি, লবণ, ট্রান্স ফ্যাট এবং অতিপ্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণ করেন, তাহলে ওষুধ সাময়িকভাবে উপকার দিলেও রোগের মূল কারণ থেকে যায়। এ বাস্তবতা থেকেই ‘Food is Medicine’ ধারণার জন্ম হয়েছে।
অনেকেই মনে করেন এটি একটি নতুন ধারণা। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। তবে অতীতে খাদ্য এবং চিকিৎসা ছিল দুটি আলাদা ক্ষেত্র। একজন চিকিৎসক ওষুধ লিখে দিতেন, আর একজন পুষ্টিবিদ খাদ্যতালিকা তৈরি করতেন। বর্তমানে এ বিভাজন ধীরে ধীরে কমছে। এখন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে শুধু ওষুধ নয়, নির্দিষ্ট খাদ্য পরিকল্পনাও যুক্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশেষ ধরনের খাবার, শাকসবজি, ফল, সম্পূর্ণ শস্য, মাছ কিংবা চিকিৎসাগতভাবে পরিকল্পিত খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। অর্থাৎ খাদ্য আর শুধু পেট ভরানোর উপায় নয়; এটি চিকিৎসার একটি কার্যকর উপাদান।
বর্তমানে এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ, কৃষি বিভাগ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা কোম্পানিগুলো একসঙ্গে কাজ করছে। তাদের লক্ষ্য হলো রোগীকে এমন খাদ্য সরবরাহ করা, যা তার রোগের অবস্থা অনুযায়ী বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একজন ডায়াবেটিস রোগী। অতীতে তাকে শুধু ওষুধ এবং সাধারণ খাদ্য পরামর্শ দেওয়া হতো। এখন অনেক হাসপাতালে রোগীকে নির্দিষ্ট পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য, স্বাস্থ্যকর বাজার করার জন্য আর্থিক সহায়তা অথবা ফল ও শাকসবজি কেনার বিশেষ ভাউচার দেওয়া হচ্ছে। এসব কর্মসূচিকে বলা হয় ‘Produce Prescription’ বা ‘খাদ্য প্রেসক্রিপশন’। অর্থাৎ চিকিৎসক প্রেসক্রিপশনে ওষুধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্যও লিখে দিচ্ছেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো ‘Medically Tailored Meals’। এতে নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রোগীর জন্য এমন খাবার প্রস্তুত করা হয়, যা তার রোগ, বয়স, ওজন, কিডনির কার্যকারিতা, রক্তে শর্করার মাত্রা কিংবা হৃদরোগের ঝুঁকি বিবেচনা করে তৈরি করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, কিডনি রোগীর খাবারে প্রোটিন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম এবং ফসফরাসের পরিমাণ নিয়ন্ত্রিত থাকে। আবার হৃদরোগীর খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম এবং আঁশ বেশি থাকে। ক্যানসার রোগীর জন্য উচ্চমানের প্রোটিন ও শক্তিসমৃদ্ধ বিশেষ খাবার প্রস্তুত করা হয়। এসব খাবার শুধু হাসপাতালেই নয়, অনেক ক্ষেত্রে রোগীর বাড়িতেও পৌঁছে দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের পরিকল্পিত খাদ্য কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার কমেছে, জরুরি বিভাগে যাওয়ার প্রয়োজন কমেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে উন্নতি হয়েছে, উচ্চরক্তচাপের রোগীদের রক্তচাপ কমেছে এবং হৃদরোগের ঝুঁকিও হ্রাস পেয়েছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর খাদ্যে বিনিয়োগ করলে শুধু মানুষের স্বাস্থ্যই উন্নত হয় না, বরং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার অর্থনৈতিক চাপও কমে।
শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, যুক্তরাজ্যেও খাদ্যকে চিকিৎসার অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (NHS) দীর্ঘদিন ধরেই খাদ্য ও পুষ্টিকে রোগ প্রতিরোধের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ডায়াবেটিস, স্থূলতা, হৃদরোগ, কিডনি রোগ এবং ক্যানসারের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে বিশেষজ্ঞ ডায়েটিশিয়ানরা চিকিৎসক দলের সঙ্গে কাজ করেন। রোগ নির্ণয়ের পর রোগীকে শুধু ওষুধ দেওয়া হয় না; তার খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন, শারীরিক কার্যকলাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্যেরও মূল্যায়ন করা হয়। অনেক এলাকায় ‘Social Prescribing’ কর্মসূচির মাধ্যমে চিকিৎসক রোগীকে কমিউনিটি গার্ডেন, স্বাস্থ্যকর রান্নার প্রশিক্ষণ, পুষ্টি শিক্ষা কিংবা খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করে দেন। উদ্দেশ্য একটাইÑমানুষ যেন সুস্থ জীবনযাপনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারে।
যুক্তরাজ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো খাদ্য শিল্প, বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্বাস্থ্যখাতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, কিংস কলেজ লন্ডন এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানে খাদ্য, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম, মানসিক স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন খাদ্য কোম্পানি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত উপাদান ব্যবহার করে ফাংশনাল ফুড, বিশেষ চিকিৎসাগত উদ্দেশ্যে তৈরি খাদ্য (Foods for Special Medical Purposes) এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুষ্টি (Personalised Nutrition) উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। এর ফলে চিকিৎসা ও খাদ্যবিজ্ঞানের মধ্যে যে দূরত্ব একসময় ছিল, তা দ্রুত কমে আসছে।
এখানে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অভিজ্ঞতার আলোকে দেখেছি, কীভাবে ‘Food is Medicine’ ধারণা ধীরে ধীরে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হচ্ছে। তবে এ পরিবর্তন শুধু এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশও এখন প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রবিন্দুতে খাদ্য ও পুষ্টিকে স্থান দিচ্ছে। কারণ নীতিনির্ধারকরা উপলব্ধি করেছেন, মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর ব্যয়বহুল চিকিৎসা দেওয়ার চেয়ে সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যের মাধ্যমে মানুষকে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখা অনেক বেশি কার্যকর, মানবিক এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। এ উপলব্ধি থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসাব্যবস্থা, পুষ্টিবিজ্ঞান, কৃষি এবং খাদ্যশিল্পকে সমন্বিত করে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
ইউরোপের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতালিতে বহু বছর ধরেই মেডিটেরেনিয়ান ডায়েটকে সুস্থ জীবনের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। জলপাই তেল, মাছ, শাকসবজি, ফল, ডাল, বাদাম এবং সম্পূর্ণ শস্যভিত্তিক এই খাদ্যাভ্যাস হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক বলে বহু গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। স্পেনেও হাসপাতাল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো রোগ প্রতিরোধে খাদ্যভিত্তিক জীবনযাত্রার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ডেনমার্ক এবং ফিনল্যান্ডে স্কুল পুষ্টি কর্মসূচি, বয়স্কদের পুষ্টি সেবা এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্য উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর খাদ্যকে জনস্বাস্থ্যের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
ইউরোপের অনেক হাসপাতালে রোগীকে ভর্তি করার পর শুধু ওষুধের তালিকা নয়, তার পুষ্টিগত অবস্থাও মূল্যায়ন করা হয়। যদি কোনো রোগী অপুষ্টিতে ভোগেন, অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুতি নেন অথবা ক্যানসারের চিকিৎসা গ্রহণ করেন, তাহলে তার জন্য বিশেষ পুষ্টি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ চিকিৎসাগত খাদ্য, উচ্চ-প্রোটিন পানীয় বা বিশেষ পুষ্টি সম্পূরক দেওয়া হয়, যাতে রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। অর্থাৎ চিকিৎসা শুধু অস্ত্রোপচার বা ওষুধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; সঠিক পুষ্টিও চিকিৎসার একটি অপরিহার্য অংশ।
এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি একটি সমন্বিত উদ্যোগ। এখানে শুধু চিকিৎসক নন; পুষ্টিবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী, খাদ্যবিজ্ঞানী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, কৃষক, খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, সুপারমার্কেট, কমিউনিটি সংগঠন এবং সরকার সবাই একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। একজন চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করেন, ডায়েটিশিয়ান রোগীর জন্য খাদ্য পরিকল্পনা তৈরি করেন, কৃষক সেই পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন করেন, খাদ্যশিল্প নিরাপদ ও মানসম্মত পণ্য তৈরি করে এবং সরকার নীতিগত সহায়তা প্রদান করে। এ সমন্বয়ই ‘Food is Medicine’ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
এ ধারণা সাধারণ মানুষের জন্য কী উপকার বয়ে আনে? প্রথমত, মানুষ দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্থূলতার মতো রোগের ঝুঁকি কমে। তৃতীয়ত, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন কমে যায়। চতুর্থত, চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। পঞ্চমত, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং জীবনের মান উন্নত হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষ নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও সচেতন হয়ে ওঠে এবং খাদ্যকে শুধু স্বাদের বিষয় হিসেবে নয়, সুস্থ জীবনের ভিত্তি হিসেবে দেখতে শেখে।
এর আরেকটি বড় অর্থনৈতিক সুবিধা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় সরকারকে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। যদি স্বাস্থ্যকর খাদ্যের মাধ্যমে এসব রোগের মাত্র ১০-২০ শতাংশও প্রতিরোধ করা যায়, তাহলে স্বাস্থ্যখাতে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। একইসঙ্গে কৃষক, খাদ্যশিল্প এবং স্থানীয় অর্থনীতিও উপকৃত হয়। ফলে ‘Food is Medicine’ আসলে একটি স্বাস্থ্যনীতি, কৃষিনীতি, শিল্পনীতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন নীতির সমন্বিত রূপ।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ধারণার গুরুত্ব আরও বেশি। দেশে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্থূলতা, কিডনি রোগ, ফ্যাটি লিভার এবং হৃদরোগের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে এখনো শিশু অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা এবং মাতৃপুষ্টির সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। অর্থাৎ বাংলাদেশ একদিকে অপুষ্টি, অন্যদিকে অতিপুষ্টিজনিত রোগ এ দুধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ পরিস্থিতিতে শুধু ওষুধের ওপর নির্ভর করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। খাদ্যকে অবশ্যই চিকিৎসার মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে।
বাংলাদেশে ‘Food is Medicine’ ধারণা বাস্তবায়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয়। বর্তমানে অনেক হাসপাতালেই ডায়েটিশিয়ান রয়েছেন, কিন্তু তাদের সম্পৃক্ততা আরও বাড়ানো দরকার। ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, হৃদরোগ, ক্যানসার কিংবা গর্ভাবস্থার রোগীদের জন্য ওষুধের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক খাদ্য পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে পুষ্টি পরামর্শ সেবা আরও শক্তিশালী করা গেলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীও এর সুফল পাবে।
এক্ষেত্রে বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের সামনেও একটি বিশাল সুযোগ রয়েছে। দেশের কৃষিজ পণ্য ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নত ফাংশনাল ফুড, উচ্চ-প্রোটিন খাদ্য, ডায়াবেটিসবান্ধব খাদ্য, প্রবীণদের জন্য বিশেষ খাদ্য, চিকিৎসাগত উদ্দেশ্যে তৈরি পুষ্টিকর খাদ্য এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুষ্টি পণ্য তৈরি করা সম্ভব। মসুর ডাল, ছোলা, মুগ ডাল, সয়াবিন, মাছ, দুধ, দই, কাঁঠাল, কলা, পেয়ারা, আম, মোরিঙ্গা, হলুদ, আদা এবং বিভিন্ন দেশীয় ফল ও শাকসবজির ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যকর খাদ্য তৈরি করা গেলে শুধু দেশের মানুষের স্বাস্থ্যই উন্নত হবে না, রপ্তানিরও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যবিজ্ঞান, পুষ্টিবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং কৃষিবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের যৌথ গবেষণা বাড়াতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং খাদ্যশিল্প একসঙ্গে কাজ করলে দেশীয় কাঁচামালের কার্যকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে নতুন শিল্প গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। একইসঙ্গে সরকারের নীতিগত সহায়তা, কর-সুবিধা, গবেষণা অনুদান এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি এ আন্দোলনকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।
আগামী দিনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শুধু রোগ নিরাময়ের ওপর নির্ভর করবে না; বরং রোগ প্রতিরোধের ওপর বেশি গুরুত্ব দেবে। সে কারণে ‘Food is Medicine’ কোনো সাময়িক প্রচারণা নয়, বরং এটি বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সূচনা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুষ্টি, জিনভিত্তিক খাদ্য পরিকল্পনা, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম গবেষণা এবং ফাংশনাল ফুড প্রযুক্তির সঙ্গে এই ধারণা আরও শক্তিশালী হবে। ভবিষ্যতে হয়তো চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে ওষুধের পাশাপাশি নির্দিষ্ট খাদ্য, নির্দিষ্ট পুষ্টি পরিকল্পনা এবং জীবনযাত্রার নির্দেশনাও সমান গুরুত্ব পাবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে। দেশটি খাদ্য উৎপাদনে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এখন সময় এসেছে শুধু মানুষের পেট ভরানোর খাদ্য নয়, মানুষের শরীর ও মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখার খাদ্য উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। যদি চিকিৎসাব্যবস্থা, কৃষি, খাদ্যশিল্প, বিশ্ববিদ্যালয় এবং নীতিনির্ধারকরা সমন্বিতভাবে কাজ করেন, তাহলে ‘Food is Medicine’ ধারণা বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। কারণ ভবিষ্যতের সবচেয়ে সফল স্বাস্থ্যনীতি হবে সেই নীতি, যেখানে হাসপাতালের শয্যা কমবে, মানুষের সুস্থ জীবন বাড়বে, আর চিকিৎসার প্রথম ধাপ শুরু হবে প্রতিদিনের খাবারের প্লেট থেকেই।
লেখক : খাদ্যবিজ্ঞানী, বার্মিংহাম, ইউকে
কেকে/ এমএস