মৌলভীবাজারের পর্যটননগরী শ্রীমঙ্গলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ক্রীড়া ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শতবর্ষী ভিক্টোরিয়া স্কুল মাঠ। ১৯২৪ সালে শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গে যাত্রা শুরু করা এই মাঠ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে উপজেলার প্রধান ক্রীড়াঙ্গন হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। স্থানীয়দের কাছে এটি শুধু একটি স্কুল মাঠ নয়, বরং পুরো উপজেলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। তবে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও আধুনিকায়নের অভাবে মাঠটি এখন অবহেলার শিকার বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯২৪ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত হয় শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার সময় শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা, প্রাতঃসমাবেশ ও শারীরিক চর্চার জন্য ৪ দশমিক ০৬২ একর জায়গাজুড়ে মাঠটি নির্মাণ করা হয়। ব্রিটিশ আমলে মহারানী ভিক্টোরিয়ার নামানুসারে বিদ্যালয় ও মাঠের নামকরণ করা হয়। স্থানীয় জমিদার, চা-বাগান মালিক এবং শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের যৌথ উদ্যোগে মাঠটি গড়ে ওঠে।
দীর্ঘ একশ বছরের ইতিহাসে ভিক্টোরিয়া মাঠে অসংখ্য ফুটবল, ক্রিকেট ও অন্যান্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের খ্যাতিমান খেলোয়াড়রাও এই মাঠে খেলেছেন। পাশাপাশি বইমেলা, বৈশাখী মেলা, বাণিজ্য মেলা, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক জনসভা এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কর্মসূচিরও অন্যতম ভেন্যু এটি। চলতি বছরের ১৭ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এই মাঠে অনুষ্ঠিত এক রাষ্ট্রীয় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঠে এখনো খেলাধুলার উপযোগী মানসম্মত ঘাস নেই। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই মাঠ কাদায় পরিণত হয় এবং বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। দর্শকদের জন্য আধুনিক গ্যালারি, খেলোয়াড়দের ড্রেসিং রুম, বিশ্রামাগার, মানসম্মত শৌচাগার, অনুশীলনের জন্য নেট কিংবা ফ্লাডলাইটের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে সন্ধ্যার পর খেলাধুলা বন্ধ হয়ে যায় এবং বড় টুর্নামেন্ট আয়োজন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ক্রীড়াবিদ মীর মো. কালাম আহমেদ বলেন, শহরের একমাত্র মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। দ্রুত সংস্কার ও আধুনিকায়ন না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খেলাধুলা থেকে আরও দূরে সরে যাবে।
উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার অ্যাডহক কমিটির সদস্যসচিব মো. মোবারক হোসেন লুপ্পা জানান, মাঠে উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বাউন্ডারি, গ্যালারি এবং ঘাসের অভাব রয়েছে। তিনি সরকারের কাছে বড় অঙ্কের বরাদ্দের দাবি জানান।
শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অয়ন চৌধুরী বলেন, বিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে সীমিত পরিসরে সংস্কার করা হলেও বড় ধরনের উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। স্ট্রিট লাইট, ড্রেনেজ, গ্যালারি ও নান্দনিক মাঠ নির্মাণের জন্য প্রশাসনের কাছে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম জানান, ২০২৫ সালে পৌরসভার অর্থায়নে আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়দের জন্য বিশ্রামাগার ও শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে। মাঠ সংস্কারের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমান বলেন, ভিক্টোরিয়া মাঠ সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন পেলে সংস্কার কাজ শুরু করার আশা রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, নগরায়ণের ফলে খেলার মাঠ কমে যাওয়ায় শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই শতবর্ষী ভিক্টোরিয়া মাঠকে দ্রুত আধুনিকায়নের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়াকেন্দ্রে রূপান্তর করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কেকে/ এমএস