হেপাটাইটিস বি একটি প্রতিরোধে টিকা নিলেই হবে না, অ্যান্টিবডি পরীক্ষাও জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. এবিএম খোরশেদ আলম ভূঞা।
সোমবার (২৭ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনের শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলন সভাকক্ষে ‘হেপাটাইটিস প্রতিরোধে প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, যথাসময়ে টিকা গ্রহণ, টিকার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ ও এর জটিলতা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তিনি জানান, সরকারি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের বিনামূল্যে হেপাটাইটিস বি টিকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রয়োজনে স্বল্প ব্যয়েও এ টিকা গ্রহণ করা সম্ভব। টিকার নির্ধারিত তিনটি ডোজ শূন্যতম মাস, এক মাস ও ছয় মাস। যা সম্পূর্ণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের দীর্ঘ চিকিৎসা-অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত হেপাটাইটিস বি বা সি আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিদেশি শান্তিরক্ষা মিশনে নিষেধ করা হয়। একইভাবে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রেও এসব ভাইরাসে আক্রান্ত প্রার্থীরা চাকরির জন্য অযোগ্য বিবেচিত হন। যা থেকে রোগটির ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, টিকা গ্রহণের পর নিজেকে পুরোপুরি নিরাপদ মনে করা উচিত নয়। কারণ, টিকা কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে অ্যান্টিবডির মাত্রা (টাইটার) পরীক্ষা করা জরুরি। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অতিরিক্ত ডোজ বা বুস্টার ডোজ গ্রহণ করতে হবে।
হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত বা বাহক ব্যক্তিদের প্রতি পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পরপর লিভারের কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে হবে। সামর্থ্য অনুযায়ী ফাইব্রোস্ক্যান করালে লিভারের ক্ষতির মাত্রা নির্ণয় করা সহজ হয় এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, শুধু ভাইরাসজনিত কারণেই লিভারের সিরোসিস বা ক্যানসার হয় না। অতিরিক্ত মদ্যপান, অটোইমিউন রোগসহ অন্যান্য কারণেও লিভারের গুরুতর ক্ষতি হতে পারে। তাই লিভারের সার্বিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে নৈতিক ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, অনিরাপদ যৌন আচরণ, মাদক গ্রহণে ব্যবহৃত সুচ বা সরঞ্জাম ভাগাভাগি এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ পরিহার করতে হবে।
মা থেকে নবজাতকের মধ্যে সংক্রমণ রোধে গর্ভাবস্থায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে হেপাটাইটিস বি পরীক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি। গর্ভবতী মায়ের সংক্রমণ শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রসব ব্যবস্থাপনা ও নবজাতকের সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রক্ত পরিসঞ্চালনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রক্ত গ্রহণের আগে অবশ্যই হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সিসহ রক্তবাহিত সংক্রমণের পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচালিত রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহ কার্যক্রমে কোনো ধরনের অবহেলা যেন না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী হেপাটাইটিস বিসংক্রান্ত অন্যান্য পরীক্ষার পাশাপাশি অ্যান্টি-এইচবিসি পরীক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তার অভিজ্ঞতায়, কিছু ক্ষেত্রে প্রচলিত পরীক্ষায় সংক্রমণ ধরা না পড়লেও এ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ শনাক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধে সেমিনার, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষকে রোগের সংক্রমণের পথ, প্রতিরোধের উপায় এবং আক্রান্ত হলে করণীয় সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানাতে হবে।
বক্তব্যের শেষে তিনি হেপাটাইটিস নিয়ে আরও বেশি আলোচনা, গবেষণা এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজনের আহ্বান জানান। একইসঙ্গে এ ধরনের আয়োজনের জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে সবার সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ কামনা করেন।
খোলা কাগজের সম্পাদক আহসাহ হাবীব লেলিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী, শ্যামলী টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার, সূর্যের হাসি নেটওয়ার্কের মো. আবদুল কাদের ভূঁইয়া, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. দীপক কুমার মিত্র, হেলথ কেয়ার ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ (মেডিকেল অ্যাফেয়ার্স) ডা. সাখি আজাদ, ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল, খোলা কাগজের নির্বাহী সম্পাদক মো. মনির হোসেন, প্রধান বার্তা সম্পাদক মো. সফিকুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক প্রণব আচার্য্য ও মো. রবিউল ইসলাম, প্রধান প্রতিবেদক আলতাফ হোসেনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।
কেকে/ এমএস