আপিল বিভাগে একই বিষয়ে মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও সেই তথ্য গোপন করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এক মাসের মধ্যে ওই অর্থ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আদালত বলেছেন, জরিমানার এই অর্থ জুলাই গণ-আন্দোলনে আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও কল্যাণে ব্যয় করতে হবে।
বুধবার (২৯ জুলাই) বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি মাহমুদ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল।
আদেশের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, একই বিষয়ে জিপিএইচ ইস্পাত এর আগে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করে আদেশ পেয়েছিল। পরে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সেই আদেশ স্থগিত করেন। ফলে বিষয়টি আপিল বিভাগে বিচারাধীন ছিল।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সংশ্লিষ্ট কোম্পানি একই বিষয়ে আগে হাইকোর্টে রিট করে আদেশ পেলেও, সেই আদেশ আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত স্থগিত করেছিলেন। এরপরও তারা নিম্ন আদালতে নতুন মামলা করে এবং হাইকোর্টে নিষেধাজ্ঞা চাইতে গিয়ে আগের রিট, আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ ও চলমান কার্যক্রমের তথ্য গোপন করেন।
তিনি বলেন, আদালতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে আদেশ নেওয়ার চেষ্টা বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রতারণার শামিল। বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের নজরে আনে। পরে রিটকারী প্রতিষ্ঠানের আইনজীবীরা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাদের দাবি, আগের মামলার তথ্য তাদের জানানো হয়নি।
পরবর্তীতে রাষ্ট্রপক্ষ আদালতের কাছে এ ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক অর্থদণ্ড আরোপের আবেদন জানায়। সেই আবেদন গ্রহণ করে হাইকোর্ট জিপিএইচ ইস্পাতকে এক মাসের মধ্যে ৫ কোটি টাকা সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালত আরও নির্দেশ দেন, এই অর্থ জুলাই গণ-আন্দোলনে আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও কল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করতে হবে।
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আদালতের এই আদেশ বিচারব্যবস্থার প্রতি অসততা, তথ্য গোপন এবং আদালতকে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি শক্ত বার্তা। একই সঙ্গে এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আদালতের দৃঢ় অবস্থানের প্রতিফলন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করার হাইকোর্টের এই আদেশ কেবল একটি আইনি ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে একই বিষয়ে নতুন রিট আবেদন করার অভিযোগ। বিচারপতিরা এটিকে বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি অসততার উদাহরণ হিসেবে দেখেছেন। আর এই ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে জিপিএইচ ইস্পাতকে ঘিরে গত কয়েক বছরে ওঠা নানা অভিযোগ, বিতর্ক ও প্রশ্ন।
যদিও ব্যানারে চট্টগ্রামভিত্তিক এই শিল্পগোষ্ঠী দেশের শিল্পায়নের অন্যতম প্রতীক। আধুনিক প্রযুক্তি, শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহৃত রড উৎপাদনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে পরিবেশ, বন, পানি, ভূমি ব্যবহার, স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগ এবং করপোরেট জবাবদিহি নিয়ে একের পর এক অভিযোগও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে উঠেছে। আস্থা এবং বিশ্বাসের জায়গায় দেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক আদালতের জরিমানার ঘটনা সেই পুরোনো প্রশ্নগুলোকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে—একটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান কতটা স্বচ্ছ? জনস্বার্থের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা কতটুকু? আর ব্যবসায়িক স্বার্থের কাছে দেশের পরিবেশ ও আইন কতটা নিরাপদ?
যে কারণে ৫ কোটি টাকার জরিমানা
হাইকোর্টে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, একই বিষয়ে আগে জিপিএইচ ইস্পাত একটি রিট আবেদন করেছিল এবং সেখান থেকে আদেশও পেয়েছিল। পরবর্তীতে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত সেই আদেশ স্থগিত করেন। ফলে বিষয়টি আপিল বিভাগে বিচারাধীন ছিল। কিন্তু সেই বিচারাধীন অবস্থার তথ্য প্রকাশ না করে পুনরায় নতুন মামলা ও নতুন রিট আবেদন করা হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল স্পষ্ট—বিচারাধীন একটি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রেখে নতুন আদেশ নেওয়ার চেষ্টা বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি অসততার শামিল। পরে রিটকারী প্রতিষ্ঠানের আইনজীবীরা নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবুও আদালত ৫ কোটি টাকা জরিমানা করেন এবং সেই অর্থ জুলাই গণ-আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা ও কল্যাণে ব্যয়ের নির্দেশ দেন।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি দীর্ঘ বিতর্কের অংশ?
অনুসন্ধানে দেখা যায়, আদালতের এই ঘটনার অনেক আগ থেকেই জিপিএইচ ইস্পাত বিভিন্ন বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল। বিশেষ করে সীতাকুণ্ডের সংরক্ষিত বনাঞ্চল, পাহাড় কাটা, প্রাকৃতিক ছড়া পরিবর্তন এবং জলাবদ্ধতা নিয়ে একাধিক অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সরকারি তদন্ত ও সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, শিল্পায়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। আর সীতাকুণ্ডের ঘটনাগুলো সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কী ঘটেছিল?
২০১৯ সালে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ জিপিএইচ ইস্পাতের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগ ছিল, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল-বাঁশবাড়িয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে পাহাড় কেটে মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রাকৃতিক ছড়ার ওপর দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
বন বিভাগের তদন্ত প্রতিবেদনে প্রায় ১৫ হাজার ১৭৫ ঘনফুট পাহাড় কাটার এবং প্রায় ১২৫ ফুট দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। কর্মকর্তারা দাবি করেন, এর ফলে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তথা ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কৃষিকাজ ও চলাচলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
যদিও জিপিএইচ ইস্পাত শুরু থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি ছিল, এটি পরিবেশ ধ্বংস নয়; বরং জিপিএইচ কারখানার আভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের অংশ।
এক্ষেত্রে সচেতন মহল ও পরিবেশবিদদের প্রশ্ন—যদি প্রকল্পটি বৈধ ও পরিবেশবান্ধব হয়ে থাকে, তাহলে কেন বন বিভাগ মামলা করল? আর যদি বন বিভাগের অভিযোগ সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে পরিবেশগত ক্ষতির দায় কে নেবে?
পানির জন্য ছড়ার গতিপথ বদল?
বন বিভাগের আরেকটি অভিযোগ ছিল, শিল্পকারখানার পানির চাহিদা পূরণে সংরক্ষিত বনসংলগ্ন একটি ছড়ায় বাঁধ নির্মাণ এবং প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ খাল কেটে পানির স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন করা হয়েছে।
বন কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, এর ফলে বনাঞ্চলের একাধিক ছড়া শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাহাড়ি অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য মূলত প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। একটি ছড়ার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব শুধু পানির ওপর নয়, উদ্ভিদ, প্রাণী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ওপরও পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি ছড়া কেবল পানির উৎস নয়; এগুলো পুরো একটি ইকোসিস্টেমের প্রাণশক্তি।
জলাবদ্ধতার অভিযোগের সূত্র
জিপিএইচকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো সীতাকুণ্ডের কুমিরা ও বাঁশবাড়িয়া এলাকার জলাবদ্ধতা। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির কিছু অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে পাহাড়ি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সড়কের নিচে পাইপ বসানো, পানি নিষ্কাশনের পথ পরিবর্তন এবং একটি বড় সেতুর পরিবর্তে তুলনামূলক সংকীর্ণ কাঠামো নির্মাণের কারণে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তদন্তে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের ক্ষতির কথাও উল্লেখ করা হয়।
বর্ষা মৌসুমে কৃষিজমি ডুবে যাওয়া, বাড়িঘরে পানি প্রবেশ এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা স্থানীয়দের জীবনে বড় প্রভাব ফেলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে শুরু থেকেই জিপিএইচ এসব অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছে এবং তদন্তকে একপাক্ষিক বলেও উল্লেখ করেছে।
খাল ভরাটের অভিযোগ
বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, কারখানা সম্প্রসারণের সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশের একটি প্রাকৃতিক খাল আংশিক বা পুরোপুরি ভরাট করা হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় ড্রেনেজ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
যদিও এসব অভিযোগের সবগুলো এখনো আদালতের চূড়ান্ত রায়ে নিষ্পত্তি হয়নি, তবুও একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসা স্থানীয়দের উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে।
স্থানীয় মানুষের অভিযোগ
সীতাকুণ্ডের স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, শিল্পায়নের সুবিধার পাশাপাশি তাদের বহন করতে হচ্ছে পরিবেশগত ও সামাজিক খরচও। কৃষিজমিতে পানি জমে থাকা, প্রাকৃতিক ছড়ার প্রবাহ কমে যাওয়া এবং পানি নিষ্কাশনের সমস্যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার আগে যে প্রাকৃতিক পানি চলাচলের ব্যবস্থা ছিল, তা এখন আর আগের মতো নেই। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শোকে বন্ধ করে ‘স্মার্ট স্কুল বাস’
জিপিএইচ ইস্পাতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে একটি ভিন্ন ধরনের বিতর্কও রয়েছে। চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য চালু করা হয়েছিল দেশের প্রথম ‘স্মার্ট স্কুল বাস’ সেবা। জেলা প্রশাসন ও বিআরটিসির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই প্রকল্পের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিল জিপিএইচ ইস্পাত।
প্রতিষ্ঠানটি দুই বছরের জন্য ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং প্রথম কিস্তি পরিশোধও করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অর্থনৈতিক সংকটের কারণ দেখিয়ে বাকি অর্থায়ন থেকে সরে আসে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ফলে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে সেবা দেওয়া প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়।
এখানে প্রশ্ন উঠেছে—করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কি শুধুই প্রচারণার অংশ, নাকি দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার?
আদালতের জরিমানার তাৎপর্য
বাংলাদেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পরিবেশগত অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু আদালতের কাছে তথ্য গোপনের অভিযোগে একটি বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করা তুলনামূলক বিরল ঘটনা।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আদেশ ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হতে পারে। কারণ, এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে বড় প্রতিষ্ঠান হওয়া মানেই আইনের ঊর্ধ্বে থাকা নয়।
কেকে/এলএ