সরকার গঠনের আট মাসের মধ্যেই নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে চাঁদাবাজি-দখলবাজিতে বেপারোয় হয়ে উঠেছেন দলটির কিছু নেতাকর্মী। আইনগত ও দলীয়ভাবে বিভিন্ন সময় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েও এ দখলবাজদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এতে ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে সরকার।
সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে রাতের আঁধারে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে এ ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এক সংসদ সদস্য। প্রয়াত এক কাউন্সিলরের স্ত্রী এবং বিএনপির প্রয়াত একজন এমপির বোন তিনি। এ ছাড়া গতকাল শনিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকায় একটি প্লট দখলের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার গঠনের আট মাসও হয়নি। এরই মধ্যে নানা অনিয়ম ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বিএনপির অনেক নেতাকর্মী। অথচ জনগণের বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এ সরকারের প্রতি মানুষের অনেক প্রত্যাশা। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারও নানা সংকট সত্ত্বেও মানুষের প্রত্যাশা মতো কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু চাঁদাবাজ-দখলবাজদের কারণে সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড ম্লান হয়ে পড়ছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছে বিরোধী পক্ষ।
গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাজধানীর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট চালানোর পর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি দখল করার চেষ্টা করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে একটি পক্ষ ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে তা দখল করে নিয়েছে। স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এ পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন।
এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান জড়িতদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। জামায়াত আমির বলেছেন, ‘এবার ক্ষমতার গরমের আঁচ পড়ল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের ওপর। রাতের আঁধারে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে রহস্যজনক একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘কোথায় প্রশাসন, কোথায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী? এর পেছনে কারা রয়েছে, তা আর মোটেই অস্পষ্ট নয়। তাদের পেটের ক্ষুধা কোনোভাবেই নিবারণ হচ্ছে না। তারাই জনগণের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার এ সুযোগটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিল।’
শফিকুর রহমান আরও লিখেছেন, সরকার একদিকে জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার অঙ্গীকার করছে, অন্যদিকে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। তিনি জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
এদিকে একই ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও সেক্রেটারি মুহাম্মদ রেজাউল করিম। গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির একজন সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের এক বিএনপি নেতার পরিকল্পনা ও ইন্ধনে দুই শতাধিক ব্যক্তি ওই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা চালান। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে রাতের আঁধারে একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলা এবং চিকিৎসাসামগ্রী ও সরকারি টিকাদান কর্মসূচির সরঞ্জাম লুটের অভিযোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ঘটনায় আমার বাংলাদেশ পার্টিও (এবি পার্টি) একই ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে।
এদিকে এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে শাহ আলী থানা-পুলিশ। গতকাল দুপুরে শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. সোহেল (২২), মো. জুয়েল (২৩), জিহাদ হাসান (২১) ও মো. রাব্বি (২০)।
জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যমকে জানান, হামলায় জড়িত থাকায় শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তার অভিযান এখনো চলছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর গতকাল সকালে সেন্টারের মূল ফটকের বাইরে অস্থায়ীভাবে টেবিল-চেয়ার পেতে শুরু হয় হাম টিকাদান কর্মসূচি। এতে টিকা নিতে আসা শিশু ও তাদের মায়েদের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, সেন্টারটি ভেঙে দেওয়ায় ফাঁকা জায়গায় ত্রিপল টানিয়ে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আশপাশের লোকজনও সহযোগিতা করছেন।
এদিকে এ ঘটনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, ‘আমি নিজে পুলিশের ডিসির সঙ্গে কথা বলেছি। ডিসি সাহেব বলেছেন, মামলা রুজু করেছি, আমরা তদন্ত করছি এবং সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে যারা এটার সঙ্গে জড়িত, তাদের গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করছি।’
ডিএনসিসি প্রশাসক আরও বলেন, ‘আমি নির্দেশনা দিয়েছি সে যেই হোক না কেন, এ ধরনের ঘটনা রাতের অন্ধকারে দখলদারিত্বের মত এটা এ সরকার চায় না। আমরা নিজেরাও চাই না। তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে।’
মোহাম্মদপুরে ভাঙচুর-লুটপাট করে জমি দখলের চেষ্টা :
এদিকে গতকাল সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকার একটি প্লট দখলের অভিযোগ ওঠে। এ সময় কয়েকশ লোক প্লটটির অফিস ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। পরে টিন ও বাঁশ দিয়ে প্লটটির চারপাশ ঘিরে দেওয়া হয়। এ সময় আশপাশের কয়েকজন বাসিন্দাকেও মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই দখলের পেছনে মোস্তকের রহমান খোকন চৌধুরী নামে একজনের হাত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার বাসিন্দারারা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকালে হঠাৎ ২০০ থেকে ৩০০ লোক সেখানে এসে ভাঙচুর শুরু করে। এ সময় স্থানীয়দের ধাওয়া করে মারধর করা হয়। হামলাকারীরা অফিসে থাকা বিভিন্ন সামগ্রী ভাঙচুর ও লুটপাট করে নিয়ে যায়। এ ছাড়া ল্যাপটপ মোবাইল এসি মূল্যবান কাগজপত্র লুটপাট করে নিয়ে গেছে।
তাদের দাবি, হামলাকারীদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মীও ছিলেন। যারা এখানে এসেছে সবাই কেউ যুবদল আবার কেউ বিএনপির যুলদল করেন। যারা এসেছে সবাই স্থানীয় কিশোর গ্যাং ও বিএনপির অঙ্গসংগঠনের সদস্য বলে জানা গেছে।
কেকে/ এমএস