পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) বিজয়-২৪ হলে সিনিয়র কর্তৃক র্যাগিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। র্যাগিংয়ে শিকার এক নবীন শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছেন।
বুধবার (১২ আগস্ট) রাতে হলের কমনরুমে ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থীদের দ্বারা র্যাগিংয়ের একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অসুস্থ ওই শিক্ষার্থীর নাম হাবিবুর রহমান হাবিব। সে বিশ্বদ্যিালয়ের আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগের ২০২৫-২৬ সেশনের নবীন শিক্ষার্থী। তার বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়।
জানা যায়, বুধবার রাতে বিজয়-২৪ হলের কমনরুমে বিভিন্ন অনুষদের নবীন শিক্ষার্থীদের ডেকে নিয়ে যায় হলের ইমিডিয়েট সিনিয়ররা। তারা পরিচয়পর্বের নামে নবীন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাজে আচরণ করে। এ সময় তাদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ধমকানো ও বিভিন্নভাবে র্যাগিং করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে র্যাগিংয়ের শিকার শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের বাবা-মাকে নিয়ে অশালীন ভাষায় গালিগালাজ, মুখে সিগারেটের ধোঁয়া ছোঁড়া এবং কান ধরে উঠবস করানো হয়। ১০০ থেকে উল্টো দিকে গণনা করতে করতে কানধরে উঠবস করতে বলা হয় এবং গণনায় ভুল হলে আবার শুরু থেকে উঠবস করতে বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরিচয় দেওয়ার এক পর্যায়ে হাবিব কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তার শারীরিক অসুস্থতার কথা সিনিয়র শিক্ষার্থীদের জানান। এরপরও তাকে র্যাগিং করা হয় বলে জানা যায়। পরে সে সারি থেকে এক পা সামনে এগিয়ে গিয়ে অসুস্থতার কথা জানালে তাকে আবারও গালিগালাজ ও কান ধরে উঠবস করানো হয়।
র্যাগিং চলাকালীন রাত আনুমানিক ১১টায় হাবিব হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায় এবং পা অবশের মতো হয়ে আসে। পরে দুই শিক্ষার্থী তাকে গণরুমে নিয়ে যান। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে দুমকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতালে তার সঙ্গে থাকা আইন ও ভূমি প্রশাসন অনুষদের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাজওয়ার বলেন, ‘তার অবস্থা এখন স্থিতিশীল। তবে হাঁটতে কিছুটা অসুবিধা হচ্ছে এবং কথা বলতেও সামান্য অসুবিধা হচ্ছে। কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে এমআরআই পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে।’
এ ঘটনার তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিতে বিজয়-২৪ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. মাসুদুর রহমানকে আহ্বায়ক, প্রক্টর অধ্যাপক আবুল বাশার খান, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা বিভাগের পরিচালক মো. আব্দুর রহিম এবং সহযোগী অধ্যাপক মো. ফয়সালকে সদস্য এবং সহযোগী অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলামকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় বিষয়ে সুপারিশ ও সুস্পষ্ট মতামত দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিচ্ছিন্ন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে। গতকাল রাত আড়াইটা পর্যন্ত হলের সহকারী প্রভোস্টরা ঘটনাটি নিয়ে কাজ করেছেন এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘র্যাগিংয়ের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রশাসনের কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্তে ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অধ্যাপক আবুল বাশার খান বলেন, ‘আমরা বিষয়টি অবগত হয়েছি। র্যাগিংয়ের শিকার হওয়া ছেলেটির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এসএম হেমায়েত জাহান বলেন, ‘র্যাগিং একটি অপসংস্কৃতি। যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার যোগ্যতা হারায়। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। র্যাগিংয়ের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের অপসংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে।’
কেকে/এআই