২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ সাত নেতার বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। যে কোনো দিন রায় ঘোষণা করবেন ট্রাইব্যুনাল।
আজ সোমবার (১৭ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২’-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ঠিক করেন।
প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই আন্দোলন ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে মানুষ মারার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়। এ মামলায় দাখিল করা বিভিন্ন অডিও-ভিডিওতে এসবের প্রমাণ উঠে এসেছে। এছাড়া আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ফলশ্রুতিতে ৫ আগস্ট পর্যন্ত নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়।’
আসামিপক্ষের আইনজীবী এম হাসান ইমাম দাবি করেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় শুট অ্যাট সাইটের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে আমার তিন মক্কেল কোনো কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন না। কমান্ড রেসপনসেবলিটিতে একজনকেই আমি দায়ী করি। অতএব আমার মক্কেলরা কাউকে মারেননি বা মারার নির্দেশও দেননি।
এরপর ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও যুবলীগ সভাপতি-সম্পাদকের পক্ষে যুক্তি খণ্ডন করেন আইনজীবী ইশরাত জাহান।
এ আইনজীবীর দাবি, চব্বিশের জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তার চার মক্কেল তথা সাদ্দাম, ইনান, পরশ ও নিখিলের নাম আসেনি। নেতৃত্ব দিয়েছেন অন্যরা।
এছাড়া অধীনস্ত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ব্যর্থ হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এ সময় কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চান ট্রাইব্যুনাল। জবাবে আইনজীবী ইশরাত জাহান বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা চলছিল। ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘বারবার নারীদের আহত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু এ মামলায় কোনো নারী সাক্ষী আনা হয়নি। সাক্ষ্যপ্রমাণেও এমন কিছু দেখাতে পারেনি। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে কিনা সন্দেহ রয়েছে।’
নিজের চার মক্কেলের খালাস চেয়ে ইশরাত বলেন, ‘শুধু রাজনীতি করার কারণে আন্দোলন ঘিরে কিছু কথা উচ্চারণ করেছেন আমার মক্কেলরা। একইসঙ্গে ব্যক্তিগত নিরাপত্তার স্বার্থে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। এছাড়া প্রসিকিউশনের দাখিলকৃত কোনো ভিডিওতেই তাদের হাতে লাঠিসোঁটা ছিল না। এককথায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রমাণ দেখাতে পারেনি প্রসিকিউশন। এ জন্য আমি চারজনেরই খালাস প্রার্থনা করছি।’
আসামিপক্ষের যুক্তি শেষে পাল্টা যুক্তি খণ্ডন করেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম। তিনি জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের ব্যাখ্যা দিয়ে এ মামলার আসামিদের অপরাধ তুলে ধরেন।
আন্দোলন দমনে নেমে একজন লোক মারা গেলেও আসামিরা অপরাধী বলে গণ্য হবেন বলে আইনি যুক্তি দেখান তিনি।
এর পূর্বে, ১২ আগস্ট সাত আসামিরই সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে যুক্তিতর্ক শেষ করে প্রসিকিউশন। গত ৪ আগস্ট এ মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক শুরু হয়।
মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান। সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক।
গেল ২ আগস্ট এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়। তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন মোট ২৯ জন সাক্ষী। গত ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া ফরমাল চার্জ বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন একই আদালত।
কেকে/এমএ